ইতিহাসের সর্ববৃহৎ আত্মহত্যার ঘটনা

আপডেট: ডিসেম্বর ২৭, ২০১৬, ১২:০৩ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক



বিশ্বের ইতিহাসে জিম জোনস এক কালো অধ্যায়ের নাম। কথিত এই কাল্ট গুরুর আহ্বানে ১৯৭৮ সালে ১৮ নভেম্বর একসঙ্গে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় ৯ শতাধিক মানুষ। তবে তার কথায় কীভাবে এত মানুষ জীবন উৎসর্গ করল তা আজও রহস্য। বিজ্ঞানীদের মতে, এই ব্যক্তি এমনভাবে সবার ব্রেন ওয়াশ করেছিল যে অগ্রপশ্চাত বিবেচনা না করেই একযোগে সবাই বিষপানে দ্বিধা করে নি।
সেদিন মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছিল গায়ানার জোনস টাউনে। জিম জোনসের ডাকে সেদিন মোট ৯১৮ জন মার্কিন শিষ্য বিষপান করে একইসঙ্গে আত্মহত্যা করে। এদের মধ্যে ছিল ৩শ’ শিশুও। যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মের নামে সংগঠন খোলেন জিম। বর্ণবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে কৃষ্ণাঙ্গদের হাত করেন তিনি। পসারও ঘটছিল ভালোই। দেশটির ক্ষমতাবানদের সঙ্গেও যোগাযোগ তার ভালোই ছিল। কিন্তু শ্বেতাঙ্গদের রোষানলে পড়ে একসময় যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগে বাধ্য হন জিম। গায়ানায় পাড়ি জমিয়ে গড়ে তোলেন নিজস্ব এলাকা। নাম দেন জোনস টাউন। যেখানে জোনসের সঙ্গে বাস করতে শুরু করেন প্রায় হাজার মানুষ।
সেখানে জোনস ও তার অনুসারীরা কেমন ছিল সে সম্পর্কে খুব কমই জানতে পারছিল বিশ্বের মানুষ। তবে ১৯৭৭ সালের দিকে জোনসের ‘গণমন্দির’-এর বেশ কিছু সদস্য পালিয়ে আমেরিকায় চলে আসে। কারণ হিসেবে জানায়, জোনসের দুর্ব্যবহার, তাঁর কঠোর মনোভাব, চার্চ ধর্মশালার পরিবর্তে বন্দিশালার মতো চব্বিশ ঘণ্টা পাহারা দুর্বিসহ করে তুলেছিল তাদের জীবন। তার ওপর জোনসের নারীঘটিত নানা কেলেঙ্কারি অন্ধ বিশ্বাসে আঘাত হানে সেসব শিষ্যের।
সবশেষ এক নারী এসে কর্তৃপক্ষের কাছে নালিশ করেন যে, তার ছেলেকে জোনস টাউনে আটকে রাখা হয়েছে। ফলে তদন্তের সিদ্ধান্ত নেয় মার্কিন সরকার। কংগ্রেসম্যান লিও রায়ানের নেতৃত্বে একটি তদন্তকারি দল জোনস টাউনে যায়। কিন্তু সেখানে যেতেই বাঁধে বিপত্তি। অভ্যর্থনা দূরে থাক তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে জোনসের লেলিয়ে দেওয়া রক্ষীরা। দৌড়ে বিমানে ওঠার আগেই তাদের ওপর গুলিবর্ষণ শুরু হয়। কংগ্রেসম্যান রায়ান ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। এ সময় নিহত হন আরও ৫ জন।
কংগ্রেসম্যানকে হত্যার ফল যে ভালো হবে না তা আগেই টের পেয়েছিলেন চতুর জোনস। তাই ভক্তদের বোঝান, আক্রমণে পড়ার চেয়ে সম্মানের সঙ্গে মৃত্যুবরণ করা ঢের ভালো। আরও বোঝান, এই জগত ত্যাগ করলেও সব ফুরিয়ে যাবে না। বরং দ্বিতীয় জগতে মিলবে শান্তি ও সমৃদ্ধি। আর তার সেই আহ্বানেই একে একে জীবন দেয় ৯১৮ জন অনুসারী। তিনি নিজেও একই পথ বেছে নেন।
এভাবেই এতগুলো নিরপরাধ মানুষের জীবনের করুণ সমাপ্তি ঘটে। কাল্ট (ঈঁষঃ) হচ্ছে ধর্মভিত্তিক ছোট গোষ্ঠী বা সংগঠন, যাদের রয়েছে নিজস্ব কিছু বিশেষ আচার, নিয়মকানুন, আধ্যাত্মিকতার নামে একজন গুরু তার ভক্তদের নিয়ে যা গড়ে তোলে। হালের কথিত আইএস গোষ্ঠীর মধ্যেও এর মিল পাওয়া যায়।
দুনিয়ায় চোর, ডাকাত কিংবা সন্ত্রাসীরা যতখানি ক্ষতি করেছে বলা হয়, তার চেয়েও অনেক বেশি ক্ষতি করেছে এসব আধা পূর্ণতাপ্রাপ্ত দাবি করা আধ্যাত্মিক গুরুরা। তথাকথিত ভালো কাজের নামে তারা মানুষকে ব্রেনওয়াশ করে বিপথে চালিত করেছে। আর এই ব্রেনওয়াশ শুরু হয় তথাকথিত কল্যাণের নামেই। বিশ্বে দলবদ্ধ আত্মহত্যার নজির অবশ্য নতুন নয়। ২০০০ সালের ১৭ মার্চ উগান্ডাতে ‘মুভমেন্ট ফর দ্য রেস্টোরেশন অব দ্য টেন কমান্ডমেন্টস্ অব গড’এর ১ হাজার সদস্যের ৭৮০ জনই আত্মহত্যা করে। এছাড়া ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত ‘দ্য অর্ডার অব দ্য সোলার টেম্পলস’ সংগঠনের সদস্যরা দলবদ্ধভাবে আত্মহত্যা শুরু করে। একে একে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় ৭৪ জন। ১৯৯৭ সালের ২৬ মার্চ ‘হ্যাভেনস সেইট’ এর ৩৯ জন অনুসারী ক্যালিফোর্ণিয়ার সান দিয়েগোর কাছে একসঙ্গে আত্মহত্যা করে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ