ইতিহাস ঐতিহ্য রক্ষার লড়াইয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ

আপডেট: ডিসেম্বর ২, ২০২১, ৮:৪৬ পূর্বাহ্ণ

সামসুল ইসলাম টুকু:


নিজ নিজ অঞ্চল বা জেলার ভাষা সংস্কৃতি ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষার লড়াই আছে ছিল থাকবে। এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ও শুভ লক্ষণ। কারণ প্রত্যেক অঞ্চলে বা জেলায় রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য। এগুলো তাদের হৃদয়ের কথা বলে, প্রাণের কথা বলে এবং এজন্য তারা গর্বিতও বটে। যাকে লালন করা, মর্যাদা দেওয়া সেই অঞ্চলের মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। যারা নিজ অঞ্চলের ইতিহাস ঐতিহ্যকে ভালবাসতে পারবে, বুঝতে পারবে- তারাই দেশ ও জাতিকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারবে। ইতিহাস ঐতিহ্য হচ্ছে আত্ম পরিচয়ের বহমান রূপ আর সংস্কৃতি হচ্ছে এক একটি অঞ্চলের চলাফেরা আচার আচরণ পোষাক-পরিচ্ছদ ও ভাব চিন্তার ফসল। একটি অঞ্চলের ভুপ্রকৃতি, ভৌগলিক অবস্থ্না, ইতিহ্সা, সম্পদ- সেই এলাকার মানুষের সংস্কৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে। সেই অঞ্চলের অধিকাংশ নিরক্ষর ও স্বল্প শিক্ষিত মানুষের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকে তাদের সংস্কৃতি। সত্যিকার অর্থে তারাই সেই এলাকার সংস্কৃতির পরিচায়ক। তেমনিভাবে কোনো এলাকার কৃষিজাত পণ্য, লোক শিল্প, বিশেষ ভৌগলিক অবস্থান তাদের ঐতিহ্যগত পরিচায়ক ।

আম হচ্ছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষিজাত পণ্য এবং পাশাপাশি ভৌগলিক, ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যগত সম্পদ। সমগ্র দেশবাসী জানে আমের রাজধানী চাঁপাইনবাবগঞ্জ। আনারস বললে যেমন মধুপুরের নাম উঠে আসে, চা ও কমলার কথা হলে সিলেটকে চিহ্নিত করতে হয়, কাঁচা গোল্লার নাম শুনলে নাটোরকে চিনবে, চিরুনী বললে যশোহরকে চিহ্নিত করা হয়Ñ তেমনি আম বিশেষত খিরসাপাত, গোপালভ্গো, ল্যাংড়া, ফজলি, আশ্বিনা বললে একমাত্র চাঁপাইনবাবগঞ্জকে নির্দেশ করে। এছাড়া রেশম, লাক্ষা, কাঁশাপিতল, মাসকলাই, গম্ভীরা বললেও চাঁপাইনবাবগঞ্জকে স্মরণ করতে হয়।

আমের জন্য যে লাগসই ভুপ্রকৃতি, আবহাওয়া, তাপমাত্রা প্রয়োজন তা চাঁপাইনবাবগঞ্জ শতভাগ নিশ্চিত করে। যা দেশের অন্যান্য জেলায় সঠিক মাত্রায় পাওয়া যায় না বলেই স্বাদে গন্ধে মিষ্টতায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের সাথে অন্য কোনো জেলার আমের তুলনা হয়না। এটা বিজ্ঞান সম্মতভাবেই সত্য। শুধু তাই নয়, দিলস্দা, কুমাপাহাড়ী, কালিভোগ , খুদি খিরসা, মধুচুসকী এর মত বিরল জাতীয় আম দেশের অন্য কোনো জেলাতেই পাওয়া যায় না। গত এক দশকে আম্রপালিসহ বিভিন্ন জাতের আম উদ্ভাবনের ফলে এবং আম একটি লাভজনক কৃষিপণ্য বিবেচনায় সারা দেশে বর্তমানে হাজার হাজার একর জমিতে আমবাগান সম্প্রসারিত হয়েছে।

অন্যদিকে বিদেশে আম রপ্তানির উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখা দেওয়ায় বিভিন্ন জেলার আমচাষী ও ব্যাবসায়ীরা তাদের এলাকার আমকে ব্র্যান্ডিং পর্যায়ে নিয়ে যেতে তৎপর হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের খিরসাপাত আম জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে এবং বাণিজ্যিক সুবিধা পেয়েছে ও বিদেশে রপ্তানির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। আর এই সুবিধা পাওয়ার লক্ষ্যেই একেবারে অনাকাক্সিক্ষতভাবেই কিছু অতি উৎসাহী মানুষ রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রকে প্রভাবিত করে ফজলি আমকে ‘রাজশাহীর ফজলি” নামে জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য শিল্প মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগে আবেদন করে ২০১৭ সালের ৯ মার্চ।

কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে ‘রাজশাহীর ফজলি’ নামে আদৌ কোনো আমের জাতই নেই। বিষয়টি চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানুষ জানতে পারলে ক্ষুব্ধ হয় এবং তিন দফা মানববন্ধন পালন করেছে জেলার বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষ। তারা মনে করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের একান্ত প্রাপ্য ও ন্যায্য হককে ছিনতাই করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য হারুনুর রশিদ ও উপজেলা চেয়ারম্যান তসিকুল আলম তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি বিভাগ, আম গবেষণা কেন্দ্রের কর্মকর্তারাও এই জিআই স্বীকৃতির কথা শুনে আশ্চর্য হয়েছেন এবং বিরূপ মন্তব্য করেছেন। আমবাগান মালিক ও আম ব্যাবসায়ী সংগঠন এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করেছেন। এদিকে ‘রাজশাহীর ফজরি’ স্বীকৃতি বাতিল করে ফজলি আমের স্বীকৃতি দাবি করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসককে একটি স্মারকলিপি প্রদান করেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি অ্যাসোসিয়েশন ।

কোন কোন যুক্তিতে ফজলি আমের জিআই স্বীকৃতি চাঁপাইনবাবগঞ্জ পেতে পারে ।
১। দেশ বিভাগের প্রায় দেড়শত বছর আগে থেকেই ভারতের মালদহ তথা গৌড়ের ফজলি আমের সুখ্যাতি রয়েছে । গৌড়ের অংশ হিসেবে সেই সুখ্যাতির পরিপূর্ণ অধিকারী চাঁপাইনবাবগঞ্জ ।

২। ১৮০০ সালে ফজল বিবি নামে এক বৃদ্ধা ধ্বংসপ্রাপ্ত গৌড়নগরী তথা চাঁপাইনবাবঞ্জ সীমান্ত ঘেষা এক কুঠিতে বাস করতেন। তার বাড়ির উঠানেই একটি আম গাছ ছিল। তৎকালীন মালদহ জেলা কালেক্টর রাজভেনশ সরকারি কাজে ওই বৃদ্ধার বাড়ির কাছেই শিবির স্থাপন করেন। বৃদ্ধা তার আগমনের সংবাদ পেয়ে তার গাছের পাকা আমের উপঢৌকন নিয়ে কালেক্টরের সাথে দেখা করেন। কালেক্টর রাজভেনশ সেই আম খেয়ে খুব প্রীত হয়ে বৃদ্ধাকে ওই আমের নাম জিজ্ঞাসা করলে বৃদ্ধা বুঝতে না পেরে তার নিজের নাম বলেন। কালেক্টর তার নামানুসারে ওই আমের নাম দেন ‘ফজলি’। এছাড়া বৃটিশ লেখক ড. বুকানন হ্যামিল্টন তার এক গবেষণা গ্রন্থে ফজলি আমের প্রশংসা করে লেখেন পৃথিবীর সর্বোৎকৃষ্ট ফল মালদহ জেলার আম। স্বাভাবিকভাবেই ফজলি আমের ঐতিহাসিক দলিল আছে এবং যার দাবিদার চাঁপাইনবাবগঞ্জই হতে পারে।

৩। সারা দেশে উৎপাদিত মোট আমের এক চতুর্থাংশ চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাতেই উৎপাদিত হয়। এ জেলার ৩৭ হাজার হেক্টর জমিতে প্রায় ৩ লাখ ১২ হাজার মে. টন আম উৎপাদিত হয়। যার ২৩% বা প্রায় ৭১ হাজার মে. টন ফজলি আম উৎপাদিত হয় ।

৪। চাঁপাইনবাবগঞ্জে আজও একশ বছরের অধিক পুরনো ফজলি বাগান রয়েছে । যা ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে। শুধু তাই নয়, এক একটি ফজলি গাছে ১০০ থেকে ১৫০ মণ পর্যন্ত ফজলি আম উৎপাদিত হয় এমন গাছও আছে।

৫। চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্তবর্তী কানসাটে রয়েছে বিখ্যাত রাজার বাগান যেখানে রয়েছে প্রচুর ফজলি আমের গাছ। সেই রাজার বাগানকে কেন্দ্র করে বর্তমানে নির্মাণ করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু লাইভ ম্যাঙ্গো মিউজিয়াম। যা পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেও স্থান পাবে খুব শিগগিরই ।

৬। ষাটের দশকের আগ পর্যন্ত নদীপথে বড় বড় নৌকায় হাজার হাজার মণ ফজলি আম ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় নিয়ে যাওয়া হতো

ভৌগলিক ও ঐতিহাসিক বিচারে এবং আমের স্বাদ গন্ধ বিবেচনায় ফজলি আমের জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার হকদার একমাত্র চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা। শুধু তাই নয়, এ জেলার গোপালভোগ, ল্যাংড়া, আশ্বিনা আম এবং অন্যদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নিজস্ব ঐতিহ্যের দিক থেকে রেশম, লাক্ষা, কাঁশা পিতল, মাসকলাই, গম্ভীরা গান, নক্সিকাঁথা জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার অধিকার রাখে। এগুলো ছিনতাই করার অধিকার কারো নাই।
লেখক- সাংবাদিক