ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশুদের বিপথগামিতা থেকে ফিরিয়ে আনতে কাউন্সিলিং

আপডেট: আগস্ট ২৮, ২০১৭, ১২:৫৬ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক


তথ্য প্রবাহের অবাধ বিচরণের ফলে আমাদের শিশুরা দ্রুত জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি রপ্ত করছে। স্মার্ট ফোন আর আই প্যাড আজ শিশুদের হাতে হাতে। মোবাইল ফোনে ফেসবুক, ইমো আর ইউটিউব’র ব্যবহার বেশ জনপ্রিয়। দেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা সর্বাধিক। প্রশাসন যন্ত্র থেকে সাধারণ মানুষ সর্বক্ষেত্রেই ফেসবুকের ব্যবহার। এর যেমন তথ্য প্রবাহের অবাধ স্বাধীনতার সুফল রয়েছে তেমনি আবার বিপথে পরিচালিত হবার আশংকাও রয়েছে, বিশেষত শিশুদের। ফেসবুকিং আর ইউটিউবের মাধ্যমে শিশুরা অপরাধ প্রবণতায় জড়িয়ে যাচ্ছে, এ সংখ্যাও কম নয়। আর তাই এইসব প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য ব্যবহার বিধিমালা বা ইউজার গাইডলাইন করার দাবি উঠেছে।
স্থানীয় মানবাধিকার সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন ফর কম্যুনিটি ডেভেলপমেন্ট-এসিডি ইন্টারনেট অপব্যবহার ও টুরিজমের মাধ্যমে শিশুদের যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ প্রকল্পের অধিনে নগরীরর শেখেরচক বিহারী বাগান এলাকার অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া শিশুদের নিয়ে কাজ করছে। সমাজের ঝুঁকিপূর্ণ শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের নিরাপদ ইন্টারনেটের ব্যবহার সম্পর্কে জেনে নিজেকে বিপদমুক্ত রাখা এবং পাশাপাশি সমবয়সী অন্যদেরকেও সঠিক ইন্টারনেট ব্যবহারে উদ্যোগী করা এবং তাদের শারীরিক ও যৌন নির্যাতন প্রতিরোধের লক্ষ্যে তারা নানমূখি কর্মকা- পরিচালনা করে আসছে। এসিডি পরিচালিত সোসালাইজেশন সেন্টারের মাধ্যমে ২০১৬ সাল থেকে মোট ২৫০ শিশুর সাথে কাজ করছে। প্রকল্পটি ১৪ থেকে ১৮ বছরের শিশুদের নিয়ে বিভিন্ন ওয়ার্কশপ ও গ্রুপ কাউন্সিলিং এর মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুফল এবং কুফলের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে। এসব শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের একটা বড় অংশই মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে দেখা যায়।
স্থানীয় কিশোর রফিক এর সাথে কথা বলে জানা যায়, সে গত ২ বছর থেকে মোবাইল ও মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহার করে। সে ফেসবুক, হোয়াটসআপ ছাড়াও ভিডিও চ্যাটিং করে। রাতে ইউটিইবে গান ও ছবি দেখে। এর ভয়াবহতা সম্পর্কে ধারণা নাই, বন্ধুরা ব্যবহার করে তাই তাদের দেখে উৎসাহিত হয়েছে। তারা দিনের বেলায় বন্ধুদের সাথে এসব শেয়ার করে।
এসিডি’র কাউন্সিলর পুস্প রানী বিশ্বাস বলেন, ১৪-১৮ এই বয়সের ছেলে মেয়েরা অধিকাংশই ইন্টারনেট ব্যবহার করে। ইন্টারনেট এর ভাল দিক জেনে বাবা মাযেরা তাদের ইন্টারনেট ব্যবহারের অনুমতি দেয়। কিন্তু এর পাশাপাশি এর ক্ষতিকারক দিক সম্পর্কে তাদের ধারণা খুবই কম। আমরা সেন্টারের মাধ্যমে ইন্টারনেট এর ক্ষতিকারক দিক নিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা করি এবং এর একর্পযায়ে জানতে পারি যে, এইসব উঠতি বয়সের শিশুরা অনেকেই সারারাত ধরে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ফেসবুক, ইমো, গুগল, ইউটিউবসহ বিভিন্ন অ্যাপস ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের ছবি দেখে এবং তা থেকে তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে উত্তেজিত হয়। তারা কয়েকজন একসাথে বা কখনও কখনও একা এইসব ছবি দেখে। আমরা এদের মধ্যে থেকে কয়েক জনকে আলাদাভাবে নিয়ে বসি এবং একক কাউন্সিলিং এর আওতায় এনে মানসিক সেবা দিয়ে থাকি। গ্রুপ কাউন্সিলিং এর মাধ্যমে শিশুদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করা হচ্ছে এবং তারা এইসব বিপদজনক অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসছে।
অভিভাবকদের নিয়ে গ্রুপ কনসালটেশনে আলোচনার প্রেক্ষিতে জানা যায়, রাত জেগে ইন্টারনেট ব্যবহারের কারণে সন্তানরা স্বাভাবিক জীবনযাপনে অনীহা, স্কুলে যেতে চায় না, ঘুম থেকে উঠতে চায় না এবং বেশি  সময় মোবাইল নিয়ে বসে থাকে ফলে তাদের নিয়ে অভিভাবকরা হতাশার মধ্যে আছে। স্থানীয় শেখেরচক বিহারীবাগান এলাকার কিশোর মুন্না (১৫) এসিডি’র সোসালাইজেশন সেন্টারে কাউন্সিলিং সেবার মাধ্যমে ইন্টারনেটের অপব্যবহার থেকে ফিরে এসেছে। ৩-৪ বছর ধরে সে মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহার করতো। শুরুতে সখের বশে ব্যবহার করলেও পরবর্তীতে আসক্তিতে পরিণত হয়। প্রায় সারা রাত জেগে ইন্টারনেট ব্যবহার করে, ফলে বেলা ১১টার পর ঘুম থেকে উঠা, লেখাপড়া না করা, স্কুলেও অনিয়মিত হয়ে পড়ে।  মা-বাবা নিষেধ করলে তাদের সাথে খারাপ আচরণ করা, এলাকার বখাটে ছেলেদের সাথে মেলামেশা করে বিপদগামী হয়ে পড়ে। পরবর্তীতেতে তার মা এলাকায় অবস্থিত এসিডি’র সোসালাইজেশন সেন্টারে যোগাযোগ করলে তাকে সেন্টারে নিয়মিত কাউন্সিলিং সেবা প্রদান করে সেখান থেকে ফিরিয়ে আনা হয়। এখন তার ভেতর ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। সে ইন্টারনেট অপব্যবহারের কুফল বুঝতে পেরেছে এবং পড়ালেখায় মনোযোগী হয়েছে। এই এলাকায় এমন আরো অনেক উদাহরণ রয়েছে। কাউন্সিলিং এর মতো একটি মনস্তাত্বিক বিষয়’র মাধ্যমে ছেলেমেয়েদের মানসিক পরির্বতন আসবে এবং ইন্টারনেট ব্যবহারেরর ভাল দিক ও ক্ষতি কারক দিক বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে বলে অভিভাবকরাও এ কাজে সন্তোষ প্রকাশ করেন।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ