ইন্টার্নি চিকিৎসক বনাম অনুশীলন ও জনসেবা

আপডেট: নভেম্বর ২৬, ২০১৬, ১২:১২ পূর্বাহ্ণ

সালীমা সারোয়ার
মহসিন আলী। বয়স ৬০ বছর। ১৮ নভেম্বর দুপুরের দিকে বাইসাইকেল ও পাওয়ারটিলার সংঘর্ষে গুরুতর আহত হয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত রোববার দুপুরে জ্ঞান হারালে স্বজনরা ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ডাকে। কিন্তু তারা আসে নি বরং বসে বসে মোবাইল টিপছিল। কিছুক্ষণ পরে রোগি মারা গেলে স্বজনরা ক্ষুদ্ধ হয়ে চিকিৎসকদের কাছে প্রতিবাদ জানাতে গেলে কথা কাটাকাটি বাধে। এর জেরে কয়েকজন ইন্টার্ন চিকিৎসক মিলে তাদের মারপিট করে এবং নিহতের স্ত্রী ও দুই ছেলেকে মারপিট করে এক ছেলের মাথা ফাটায়। পরে তাদের পুলিশে দেয়। চলতি মাসে তিনটিসহ গত সাত মাসে রামেক হাসপাতালে এরূপ ১২টি মারামারির ঘটনা ঘটে। এভাবেই রামেকসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ইন্টার্ন চিকিৎকরা অরাজকতা তৈরি করছে। অসহায় রোগি ও তার স্বজনরা তাদের নির্মমতার শিকার হচ্ছে। এরূপ ঘটনা অব্যাহতভাবে ঘটার প্রবণতা অব্যাহত থাকায় জনমনে নানা প্রশ্ন ও আশংকার দেখা দিয়েছে। অনেকে বলছেন যে, এরূপ কার্যক্রমে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের থাকা মানবিক মুল্যবোধ কী অসম্মানে জর্জরিত হয় না? এর মাধ্যমে মানুষের মানবিকতাকে কী অপমান করা হয় না?
দ্রুতগতিতে দেশের আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির জন্য সরকার নানা প্রকার উন্নয়নমূলক পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে। এসব কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জন্য জনগণের ওপর করারোপ করে। সেই করের টাকা তথা জনগণের প্রদত্ত অর্থের সিংহভাগ চিকিৎসকদের পিছনে খরচ হয়। অথচ তারাই জনগণকে স্বল্পমুল্যে সেবা দেয় না। আবার ইন্টার্ন চিকিৎসকদের আচরণ প্রায়ই মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। তাদের আচরণ ও কর্মকা- পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায় যে, প্রায়ই তাদের মধ্যে সেবার মানসিকতা ও সেবা প্রদানের অবস্থা থাকে না। প্রায়ই তাদের ভুল চিকিৎসার প্রভাবে রোগির মৃত্যু হয়। এর প্রতিবাদ করলে স্বজনদের ওপর হামলা ও মারপিট করে। অনেক সময় দেখা যায় যে, ডাক্তাররা অন্য জায়গায় টাকার  বিনিময়ে সেবা দেয়। যেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশযোগ্যতা খুবই সীমিত। সেখানেও প্রয়োজনীয় সেবা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও অপ্রতুল।
মৃত্যু সবার জন্য অবধারিত হলেও স্বাভাবিক মৃত্যু সবার কাম্য। বাঁচানোর তাগিদে স্বজনরা অসুস্থ মানুষকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করে। কিন্তু অনেক সময় তারা পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও সেবা পায় না। এরই ফলশ্রুতিতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সেবার অভাব কিংবা অবহেলায় অনেক রোগির মৃত্যু হয়। এতে মৃতের স্বজনরা ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। এসময় তারা দায়িত্বে থাকা চিকিৎসকের কাছে প্রতিবাদ জানাতে গেলে অভিযুক্তরাই তাদের ওপর হামলা, গালাগাল ও মারপিট করে; এমনকি পুলিশে দেয়। তারা এতটাই সেবা ও দায়িত্ব বিমুখ যে, মৃতের স্বজনদের মানসিকতা বোঝার সক্ষমতা থাকে না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে যে, বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে রোগির তুলনায় চিকিৎসক, নার্সসহ প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রাদির সংকট আছে। এ জন্য রোগিরা পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও সেবা পায় না। এছাড়া অধিকাংশ প্রফেসর, কনসালটেন্ট বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা প্রাইভেট প্র্যাকটিসে ব্যস্ত থাকায় সরকারি হাসপাতালে বেশি সময় দেয় না। এতে জনগণের চিকিৎসা ব্যয় বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। আর, সকালে রাউন্ড দিলেও তারা সন্ধ্যাকালীন ও ছুটির দিনে রাউন্ডে আসেন না। এর সাথে সংশ্লিষ্টদেরও পাওয়া যায় না। ফলে রাতে বা ছুটির দিনে উন্নত চিকিৎসার আশায় সরকারি হাসপাতালে আসা রোগিরা শিক্ষানবিশ বা ইন্টার্ন চিকিৎসকদের হাতে পড়তে হয়। যাদের অধিকাংশের মধ্যেই সেবার মানসিকতা না থাকার কারণে রোগিরা কাক্সিক্ষত সেবা পায় না। এতে ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেই রোগির স্বজনদের সাথে এরা বাক-বিত-ায় জড়িয়ে পড়ে। সহনশীলতার পরিচয় না দিয়ে প্রতিপক্ষ হয়ে ভুক্তভোগিদের ওপর হামলা ও মারপিট করে। আর, তুচ্ছ ঘটনায় ধর্মঘটের মত ক্ষতিকর কর্মসূচি দিয়ে রোগি, স্বজন ও প্রশাসনকে জিম্মি করে এসব ইন্টার্নিরা। এসব কার্যক্রম জনসেবার ব্রত নিয়ে পড়াশোনা করা চিকিৎসকদের মানসিক ও পেশাগত মূল্যবোধের পরিপন্থী এবং মানবতার পথে বিরাট প্রতিবন্ধক। আর, প্রশাসন পরিস্থিতি সামাল দেয়ার নামে রোগির স্বজনদের আটক করে এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলা করে। এ যেন মরার ওপর খারার ঘাঁ। সম্প্রতি রামেক হাসপাতালে এরূপ অবস্থার শিকার হওয়া এক রোগির স্বজনের মতে, ‘কিছুই বুঝতে পারলাম না। ডাক্তাদের অবহেলা মরলো রোগি আর প্রতিবাদ করায় ছেলেদের ধরে নিয়ে গেলো পুলিশ। এটা কেমন দুনিয়া, আর এটা কী করে সম্ভব? এমনিতেই তাদের পরিবারের উপরে আকাশ ভেঙ্গে পড়েছে। বাবা হাসপাতালের মর্গে আর দুই ছেলেকে আটক করে হাতকড়া পরিয়ে থানায় নিয়ে গেছে পুলিশ। আর মা আহত অবস্থায় পড়ে আছে।’
স্বল্পমূল্যে সাধারণ মানুষের সেবা প্রদানের জন্য শৈশব থেকেই একজন মানুষ চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন লালন করে। পরে সে সুযোগ এলে অত্যন্ত পরিশ্রম ও নিষ্ঠার সাথে সে কাজ করবে এরূপ ধারণা থেকেই সরকার জনগণের করের টাকা তাদের পড়াশোনার জন্য খরচ করে। জনগণও স্বল্পমুল্যে চিকিৎসা ও সেবা পাওয়ার আশায় অপেক্ষা করে। কিন্তু অধিকাংশই জনগণের এরূপ প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে না। পড়াশোনা শেষ করে কর্মজীবন শুরুর আগে অনুশীলন করার সময়ই তাদের অমানুষিক প্রবণতার বহিঃপ্রকাশ করে। এমনকি রাজনীতিতে জড়িত হয়ে প্রভাব ও ক্ষমতার চর্চা করে। অনুশীলন কিংবা ইন্টার্নির নামে প্রায়ই সন্ত্রাসী কর্মকা-ে জড়িত হয়। সমাজ ব্যবস্থার নানা ক্রটি, আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব, জনগণের অসচেতনতা ইত্যাদি নানা কারণের সুযোগ নেয়া এরূপ ইন্টার্নিদের নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও বিপদে থাকে। তাই আমরা মনে করি যে, সার্বিক অবস্থা এতটাই খারাপ যে, এটি ইতোমধ্যে জনউদ্বেগের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
ক্ষমতার অপব্যবহার করে সহনশীলতা ও সেবার মানসিকতাহীন এসব হবু চিকিৎসকদের এরূপ জনবিরোধী কর্মকা-ে সুশীল সমাজ, মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সাথে জনগণও বেশ চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন। ইতোমধ্যে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উদ্বেগ প্রকাশ করে এসবের প্রতিবাদ জানিয়েছে। আমরা মনে করি যে, দেশের সামগ্রিক ইতিবাচক অগ্রগতি অব্যাহত রাখার জন্য এরূপ নেতিবাচক কর্ম অবিলম্বে বন্ধ হওয়া দরকার। সেই সাথে জড়িতদের প্রচলিত আইনে বিচার হওয়া উচিত। আমরা বিশ্বাস করি যে, দায়িত্বরতরা সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব বজায় রেখে কাজ করলে জনগণের কষ্ট অনেকাংশে লাঘব হবে এবং একই সাথে চিকিৎসার মতো মহৎ পেশার সব সংকট কেটে যাবে। সম্প্রতি রাজশাহীতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন যে, ‘অ্যাপ্রোন পরার পর আগে সেবা, এর পর রাজনীতি। মনে রাখতে হবে, চিকিৎসকদের দায়িত্বটাই সবার আগে। মানুষের সেবা করার মানসিকতা না থাকলে চিকিৎসা পেশায় আসার দরকার নেই। কারণ মানুষের সেবা করার মধ্যে দিয়েই মানুষের মহত্ব ফুটে ওঠে। রাজনৈতিক আন্দোলনের নামে চিকিৎসা সেবা বন্ধ করে দেয়াটাও কোনভাবেই কাম্য নয়।’ আমরা এ বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করি এবং আমরা মনে করি যে, এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সবাইকে একসাথে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা দরকার।
* লেখক: মানবাধিকার কর্মী।