ইফতারের মাহাত্ম্য

আপডেট: মার্চ ৩১, ২০২৩, ১২:০৮ পূর্বাহ্ণ

ড. মাওলানা ইমতিয়াজ আহমদ:


পবিত্র মাহে রমজান ইবাদতের মাস। এ মাসে রোজা ও তারাবীহ নামাজ ছাড়া আরও অনেক আমল আছে যার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর নৈকট্য হাসিল করতে পারে এবং আল্লাহর কাছ থেকে পেতে পারে অনাবিল রহমত ও আনন্দ। যেহেতু রোজা আল্লাহর জন্যই রাখা হয়, তাই এর পুরস্কারও আল্লাহ তায়ালাই দেন। রোজাদারের জন্য অনেক পুরস্কার রাখা হয়েছে। তন্মধ্যে কিছু পুরস্কার পরকালে দেওয়া হবে, আর কিছু পুরস্কার দেওয়া হবে ইহকালে। সারাদিন রোজা রাখার পর বান্দা সন্ধ্যার সময় যে ইফতার করে সেটাও আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশাল এক পুরস্কার ও আনন্দ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, রোজাদার ব্যক্তির জন্য দুটি আনন্দ রয়েছে। একটি আনন্দ ইফতারের সময়, অপরটি আল্লাহর সাথে মোলাকাতের সময়। এখানে ইফতারের সময়কে আনন্দ বলতে বান্দা যখন ইফতার করে তা বোঝানো হয়েছে। কেননা সারাদিন রোজা রেখে ক্ষুধার্ত শরীর আর তৃষ্ণার্ত বুক নিয়ে যখন খাবার সামনে নিয়ে বসে থাকার পর নির্ধারিত সময়ে এক চুমুক পানি পান করা হয়, তখন সত্যিই বান্দা অপার এক আনন্দ উপভোগ করেন।

সময় হওয়ার সাথে সাথে তাড়াতাড়ি ইফতার করতে হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মানুষ ততদিন কল্যাণের ওপর থাকবে, যতদিন পর্যন্ত তারা তাড়াতাড়ি ইফতার করবে। (বুখারী, মুসলিম)

হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, নিশ্চয়ই আমার বান্দাদের মধ্যে তারাই আমার কাছে বেশি প্রিয়, যারা তাড়াতাড়ি ইফতার করে। (তিরমিজী)

হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত অপর এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ইসলাম ততদিন পর্যন্ত বিজয়ী থাকবে যতদিন মুসলমানগণ তাড়াতাড়ি ইফতার করবে। কেননা ইহুদী ও নাসারাগণ ইফতার পিছিয়ে দেয়। (আবু দাউদ)

ইফতারের জন্য মাগরিবের নামাজ বিলম্বে পড়তে হয়। এক্ষেত্রে ইফতারের গুরুত্ব অপরিসীম। হযরত আনাস ইবনে মালেক রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ইফতার না করে মাগরিবের নামাজ আদায় করতে দেখিনি। সামান্য পানি দিয়ে হলেও তিনি আগে ইফতার করে নিতেন।

ইফতারের জন্য আহামরি আয়োজনের কোনো প্রয়োজন নেই। খেজুর বা পানি পরিমাণে অল্প হলেও ইফতার হিসেবে তা অত্যন্ত বরকতের বস্তু। হযরত সালমান ইবনে আমের দাব্বী রা.-এর সূত্রে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তোমাদের কেউ যখন ইফতার করে, তখন যেন খেজুর দিয়ে ইফতার করে। কেননা এটি বরকতের বস্তু। আর যদি খেজুর না পায়, তবে যেন পানি দিয়ে ইফতার করে নেয়। কেননা এটি পবিত্রকারী। (আবু দাউদ) মনে রাখতে হবে, ইফতার শুধু খাদ্য গ্রহণের নাম নয়, বরং এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত।

রোজাদার ব্যক্তিকে ইফতার করানোতেও ফজীলত রয়েছে। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি রমজান মাসে কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে তার যাবতীয় গুনাহ মাফ হয়ে যাবে এবং দোজখের আগুন থেকে সে নাজাত পাবে। আর সে ঐ রোজাদারের সমান সওয়াব পাবে। অথচ এতে ঐ রোজাদারের সওয়াব মোটেও কমবে না। সাহাবারা আরজ করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাদের মধ্যে সকলের তো রোজাদারকে ইফতার করাবার সামর্থ্য নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জবাবে বললেন, যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে এক ঢোক দুধ কিংবা একটি খেজুর অথবা একটু পানিও পান করাবে আল্লাহ তায়ালা তাকে উক্ত রূপ সওয়াব দান করবেন। আর যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে তৃপ্তির সাথে আহার করাবে আল্লাহ তায়ালা তাকে আমার হাউজে কাওসারের এমন পানি পান করাবেন যে, বেহেশতে প্রবেশ পর্যন্ত সে আর পিপাসা অনুভব করবে না।

অন্যকে ইফতার করানোর রীতি এবং ইফতার মাহফিল এ হাদীসকে কেন্দ্র করেই চালু হয়েছে। তবে দুঃখের বিষয় অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইফতার মাহফিল আজ নিছক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। সেখানে ইবাদত অর্থাৎ একজন রোজাদারকে খাওয়ানো হচ্ছে এমন ভাবের লেশমাত্র থাকে না। এটা মোটেই কাম্য নয়।

ইফতার সংক্রান্ত কিছু মাসয়ালা
* ইফতারের কিছুক্ষণ আগেই ইফতারি সামনে নিয়ে অপেক্ষা করা এবং যথাসময়ে ইফতার করা সুন্নাত।

* খেজুর দ্বারা ইফতার করা মুস্তাহাব।

* ইফতারের সময় দোয়া কবুল হয়। হাদীসে এসেছে, ইফতারের সময় রোজাদারের দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। (ইবনে মাজা) অপর এক হাদীসে এসেছে, প্রতিদিন ইফতারের সময় অসংখ্য জাহান্নামীকে মুক্তি দেওয়া হয়। (ইবনে মাজা) তাই এ সময় দোয়ায় মশগুল হওয়া উচিত।

* মেঘলা দিনে কিছু দেরি করে ইফতার করা উত্তম।

* সূর্যাস্তের পূর্বে সূর্য ডুবে গেছে মনে করে ইফতারী করলে রোযা ভেঙ্গে যাবে। এক্ষেত্রে একটি রোজা কাজা করে নিতে হবে।

আল্লাহ আমাদের সকলকে সুমতি দান করুন।
লেখক: পেশ ইমাম, বাংলাদেশ রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট জামে মসজিদ, রাজশাহী