ইরানে ছড়িয়ে পড়েছে নারীদের বিক্ষোভ গণআকাঙ্ক্ষা দমিয়ে রাখা যায় না

আপডেট: সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২২, ১২:২৮ পূর্বাহ্ণ

ইরানের তথাকথিত নৈতিকতা রক্ষার দায়িত্বে থাকা পুলিশ বাহিনীর হেফাজতে ২২ বছর বয়সী মাশা আমিনির মৃত্যুর পর বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছেন ইরানের নারীরা। ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির কঠোর পোশাক বিধি এবং তা বলবৎ করার দায়িত্বে যারা আছে তাদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফুঁসে ওঠা নারীরা প্রতিবাদস্বরূপ তাদের হিজাব পুড়িয়ে ফেলছেন। ইতোমধ্যেই পুলিশি জুলুমে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ৩১ জন প্রতিবাদীর।
সংবাদ মাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী হিজাব কান্ডে প্রতিবাদকে থমকে দিতে দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছে ইরান সরকার। ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে সরকারের তরফ থেকে। দেশটির সেনাবাহিনিও প্রতিবাদকারীদেও বিরুদ্ধে হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছে।
ইরানে প্রচলিত শরিয়া আইন অনুযায়ী নারীদের হিজাব পরা বা চাদর দিয়ে মাথা ঢাকা বাধ্যতামূলক। এছাড়াও নারীদের শরীর সম্পূর্ণ ঢেকে রাখতে পা পর্যন্ত লম্বা ও ঢিলা পোশাক পরার বিধান দেশটিতে রয়েছে। এই নিষ্ঠুর আ্ইনি ব্যবস্থার অবসান চইেছে ইরানের নারীরা। তারা বলছেন পোশাক পরিধান একান্তই ব্যক্তির ইচ্ছাধীন। এর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি মানবাধিকার লঙ্ঘন। পশ্চাদপদ একটি ধারণাকে স্বাধীন মানুষের ওপর চাপিয়ে দেয়াটা অসভ্যতা।
ইরানের নারীদের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ইসলামিক বিপ্লবের গোড়া থেকেই ক্ষোভ পুঞ্জিভুত হয়েছে। যারা হিজাব ঠিকমত পরে না বা ইসলামি রীতি মেনে সাজপোশাক করে না, ইরানি কর্তৃপক্ষ তাদের ‘হিজাব ঠিকমত না পরার’’ বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পরপরই। ওই বিপ্লবের একটা বড় লক্ষ্য ছিল নারীদের খোলামেলা সাজপোশাক বন্ধ করা।
বিপ্লবের নেতা, আয়াতুল্লাহ রুহুল্লা খোমেইনি ১৯৭৯ সালের ৭ মার্চ ডিক্রি বা নির্দেশনামা জারি করেন যে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নারীকে তাদের কর্মক্ষেত্রে বাধ্যতামূলকভাবে হিজাব পরতে হবে এবং নারীরা মাথা না ঢাকলে তার বিচারে সেইসব নারী ”নগ্ন” বলে গণ্য হবেন।
এই নির্দেশের পর নারীদের প্রতিক্রিয়া ছিল তাৎক্ষণিক। আয়াতুল্লাহ খোমেইনির ভাষণের পরদিনই বিক্ষোভ জানাতে তেহরানের রাস্তায় জড়ো হন এক লাখের ওপর মানুষ, যাদের বেশিরভাগই ছিল নারী। সেদিন ছিল আন্তর্জাতিক নারী দিবস।
ইসলামী বিপ্লবের পর ইরানী কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত থেকে এটা ধারণা করার সঙ্গত কারণ ছিল যে, দেশটির সরকারের কাছে নারীরাই ছিল প্রধান প্রতিপক্ষ। ধাপে ধাপে নেয়া আইনি প্রক্রিয়াগুলো ছিল- নারীকে গৃহেবন্দি করা এবং তাদেন সৃজনশীল মনোজগতকে ধ্বংস করা। সেই পথ ধরেই ১৯৮১ সালে নারী ও কিশোরীদের ইসলামি রীতি অনুযায়ী আব্রু রক্ষা করার উপযোগী পোশাক পরা আইনত বাধ্যতামূলক করা হয়। পার্লামেন্ট ১৯৮৩ সালে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যেসব নারী প্রকাশ্যে মাথা ঢাকবে না, তাদের শাস্তি হিসাবে ৭৪ বার বেত্রাঘাত করা হবে। আরও সম্প্রতি এই সাজার সঙ্গে আরও যোগ হয়েছে ৬০ দিন পর্যন্ত কারাবাস। নারীরা কী ধরনের পোশাক পরে প্রকাশ্যে বেরুচ্ছে তা পর্যবেক্ষণের জন্য ক্যামেরা বসানো হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে। নারীকে সামলাতেই দেশটির সরকারকে একের পর এক সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে; তার মানে এই যে, নারীরা তাদের স্বাধিকারের প্রশ্নে নিজেদের ব্যাপারে সোচ্চার হচ্ছে।
ইরানে নতুন বিধিনিষেধের কারণে নারীদের গ্রেপ্তারের ঘটনা বেড়ে গেছে। কিন্তু পাশপাশি সামাজিক মাধ্যমে নারীদের হেডস্কার্ফ না পরা ছবি ও ভিডিও পোস্ট করার সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য রকম বেড়ে গেছে। আর আমিনির মৃত্যুর পর সেই সংখ্যা আরও তীব্র হয়েছে।
ইরানের পরিস্থিতি ক্রমশই গণরোষ রূপ পরিগ্রহ করছে। এর স্ফূলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়াটা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। কেননা এটা মানবাধিকারের লড়াই। এ লড়াইয়ের দায়টা শুধুই নারীর নয়। পুরুষরাও এ লড়াইয়ে শরিক হয়েছে। শেষ পর্যন্ত মানুষের আকাক্সক্ষারই জয় হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ