ইসরায়েলে মার্কিন সামরিক ও অর্থ সহায়তার নেপথ্যে

আপডেট: মে ২৫, ২০২১, ৭:২২ অপরাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক:


জেরুজালেমে পাশাপাশি উড়ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পতাকা

যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইসরায়েলের জন্য কত সাহায্য যায় তা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন নিজ দলের ভেতর থেকেই বেশ কিছু কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়েছেন। গাজায় দখলদার বাহিনীর সাম্প্রতিক আগ্রসান শুরুর এই চাপ বেড়েছে।
ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মধ্যে বাম ঘরানার সবচেয়ে সুপরিচিত রাজনীতিক সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স বলেছেন, ইসরায়েলকে পাঠানো টাকা কোথায়, কিভাবে খরচ করা হচ্ছে সেদিকে গভীর মনোযোগ দিতে হবে।
ইসরায়েল কী পায় এবং তা কোন কাজে লাগায়?
২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে ৩৮০ কোটি ডলার সাহায্য দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ওবামার শাসনামলে ইসরায়েলকে দীর্ঘমেয়াদী যে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার অধীনেই এই সহায়তা গেছে। এর প্রায় পুরোটাই ছিল সামরিক সাহায্য।
২০১৬ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা ইসরায়েলের সঙ্গে একটি চুক্তি করেন। ওই চুক্তির অধীনে ২০১৭-১৮ সাল থেকে তার পরবর্তী ১০ বছর ইসরায়েল ৩৮ বিলিয়ন ডলার বা ৩৮০০ কোটি ডলার সামরিক সাহায্য পাবে। এর আগের ১০ বছরের তুলনায় ওই সাহায্য বেড়েছে প্রায় ছয় শতাংশ।
এর বাইরে ২০২০ সালে ইসরায়েলে নতুন অভিবাসীদের পুনর্বাসনে যুক্তরাষ্ট্র ৫০ লাখ ডলার সাহায্য দিয়েছে। বিশ্বের যে কোনও দেশ থেকে ইহুদিরা ইসরায়েলে গিয়ে বসতি গড়তে চাইলে তাকে স্বাগত জানানো হয়।
কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের টাকা খরচ করে ইসরায়েল?
ইসরায়েলকে অত্যাধুনিক একটি সামরিক শক্তিধর দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে যুক্তরাষ্ট্র বছরের পর বছর ধরে সাহায্য করছে। ওয়াশিংটন থেকে অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র কেনার জন্য তহবিল যোগানো হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ইসরায়েল আমেরিকা থেকে ৫০টি অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কিনেছে যা দিয়ে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো যায়।
প্রতিটি বিমানের দাম প্রায় ১০ কোটি ডলার। ২৭টি বিমান এরইমধ্যে ইসরায়েল পেয়ে গেছে। বাকিগুলোও পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। ২০২০ সালে ইসরায়েল আমেরিকার কাছ থেকে ২৪০ কোটি ডলার ব্যয়ে আটটি কেসি-৪৬এ বোয়িং পেগাসাস বিমান কিনেছে। এই বিমান থেকে আকাশে এফ-৩৫ বিমানে জ্বালানি তেল ভরা যায়।
২০২০ সালে ইসরায়েলকে আমেরিকা যে ৩৮০ কোটি ডলার দিয়েছে, তার মধ্যে ৫০ কোটি ডলার খরচ হয়েছে ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র নিরাপত্তা ব্যবস্থায়। এর মধ্যে রয়েছে আয়রন ডোম ক্ষেপণাস্ত্র নিরাপত্তা যা দিয়ে ইসরায়েল রকেট হামলা প্রতিহত করে।
২০১১ সাল থেকে আমেরিকা ইসরায়েলের আয়রন ডোম নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য ১৬০ কোটি ডলার দিয়েছে। এছাড়াও গাজায় গোপন সুড়ঙ্গ শনাক্ত করাসহ বেশ কিছু সামরিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনে ইসরায়েলকে তহবিল ছাড়াও বিভিন্নভাবে সাহায্য করছে যুক্তরাষ্ট্র। ইসরায়েলের সরকার সমরাস্ত্র কেনা এবং সামরিক প্রশিক্ষণে বহু তহবিল খরচ করে যার একটা উল্লেখযোগ্য অংশই আসে মার্কিন সহায়তা থেকে।
অন্যান্য দেশকে দেওয়া সাহায্যর সঙ্গে তুলনা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আমেরিকার কাছ থেকে একক দেশ হিসাবে সবচেয়ে বেশি সাহায্য পেয়েছে ইসরায়েল। ইউএসএআইডি-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৯ সালে আফগানিস্তানের পর আমেরিকা থেকে সবচেয়ে বেশি সাহায্য গেছে ইসরায়েলে।
আফগানিস্তানকে দেওয়া সাহায্যের সিংহভাগই খরচ হয়েছে দেশটিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য মার্কিন সেনাদের বিভিন্ন চেষ্টার পেছনে। কিন্তু এখন যখন আমেরিকান সেনারা আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যাচ্ছে, ২০২১ সালে দেশটির জন্য মাত্র ৩৭ কোটি ডলার সাহায্যের প্রস্তাব করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বেশি সাহায্য পেয়েছে ইসরায়েল। ইসরায়েল ছাড়া মিসর ও জর্ডান মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকান সাহায্যের অন্যতম প্রধান দুই গ্রহীতা। এই দুই দেশের সঙ্গেই অতীতে ইসরায়েলের যুদ্ধ হয়েছে। কিন্তু দুই দেশই পরে ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি চুক্তি করেছে।
২০১৯ সালে মিসর আমেরিকার কাছ থেকে ১১০ কোটি ডলার সাহায্য পেয়েছে। জর্ডানও একই পরিমাণ তহবিল পেয়েছে। জো বাইডেন ক্ষমতায় এসে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য বন্ধ করে দেওয়া মানবিক সাহায্যের কিছুটা (২৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার) ছাড় করেছেন। ২০১৮ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সাহায্য বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে কেন এতো সাহায্য দেয়?
যুক্তরাষ্ট্র কেন ইসরায়েলকে এতো সাহায্য দেয় তার কয়েকটি কারণ রয়েছে। তার মধ্যে একটি ঐতিহাসিক। ১৯৪৮ সালে ইহুদিদের জন্য ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে তার প্রতি অব্যাহত সমর্থনের প্রতিশ্রুতি ছিল আমেরিকার। তাছাড়া, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে বিবেচনা করে যুক্তরাষ্ট্র। বলা হয়ে থাকে, দুই দেশের লক্ষ্য অভিন্ন এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি তাদের পারস্পরিক প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
মার্কিন কংগ্রেসের রিসার্চ সার্ভিস বলছে, ‘ওই সম্পর্ক অব্যাহত রাখতে এবং জোরদার করতে আমেরিকার সাহায্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মার্কিন প্রশাসন এবং দেশের অনেক রাজনীতিক বহুদিন ধরেই ইসরায়েলকে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করেন।’
যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সাহায্য বিষয়ক সংস্থা ইউএসএআইডি বলছে, ‘মার্কিন সাহায্যের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন সম্ভাব্য ঝুঁকির মোকাবিলায় সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ পাচ্ছে ইসরায়েল।’ আমেরিকার সরকারি এই সংস্থাটি আরও বলছে, ‘আমেরিকান সাহায্যের উদ্দেশ্য ইসরায়েল যেন যথেষ্ট নিরাপদ থাকতে পারে। যাতে করে তারা ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে এবং বৃহত্তর একটি আঞ্চলিক শান্তি স্থাপনে আস্থা এবং উৎসাহ পেতে পারে।’
ইসরায়েল যাতে মধ্যপ্রাচ্যে হুমকি মোকাবিলা করতে পারে তা নিশ্চিত করা বহুদিন ধরেই মার্কিন পররাষ্ট্র নীতির মুখ্য একটি উদ্দেশ্য। রিপাবলিকান এবং ডেমোক্র্যাটিক পার্টি দুই দলই দশকের পর দশক ধরে কোনও বিতর্ক ছাড়াই এই নীতি অনুসরণ করে আসছে।
২০২০ সালেও ডেমোক্র্যাটিক পার্টি তাদের নির্বাচনি প্রচারণায় ইসরায়েলের প্রতি লৌহ-বর্ম সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলে। কিন্তু সম্প্রতি দলের বাম এবং প্রগতিশীল একটি অংশ ইসরায়েলের প্রতি এতো দিনের প্রশ্নাতীত এই সমর্থন নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। ইসরায়েলের কাছে ৭৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার মূল্যের অত্যাধুনিক অস্ত্র বিক্রির যে প্রস্তাব বাইডেন সম্প্রতি অনুমোদন করেছেন তা স্থগিতের দাবি তুলেছেন সিনেটর স্যান্ডার্সসহ কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বেশ কয়েকজন সদস্য।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ