ইসির সংলাপ, মতবিনিময় ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন বিষয়ক কিছু কথা

আপডেট: আগস্ট ২১, ২০১৭, ১২:৪১ পূর্বাহ্ণ

মো. আবদুল কুদ্দুস


আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কে.এম নূরুল হুদা কমিশন বেশ কিছু প্রশংসনীয় কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। অবাধ সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ সংসদ নির্বাচনের লক্ষ্যে এ কমিশন ইতোমধ্যে দেশের সুশীল সমাজ/নাগরিক সমাজের সাথে এবং গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও সিনিয়র সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেছেন। নির্বাচন কমিশন তাদের এই আলাপনকে কখনো ‘সংলাপ’ আবার কখনো ‘মতবিনিময়’ বলেছেন। আমার মতে ‘সংলাপ’ শব্দটি থেকে ‘মতবিনিময়’ শব্দ বেশি অর্থপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য। কেননা সংলাপ শব্দটি শুধু যেকোনো দুটি পক্ষের মধ্যে কথোপকথন বুঝানোর অর্থে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু ‘মতবিনিময়’ শব্দ দ্বারা এর চেয়ে অধিক অর্থ প্রকাশ করে। যেমন মতবিনিময় শব্দ দ্বারা ‘যুক্তি, প্রমাণ ইত্যাদি দিয়ে গৃহীত দার্শনিক বৈজ্ঞানিক বা নীতি বিষয়ক ধারণা বা সিদ্ধান্ত’,‘বিজ্ঞ পরামর্শ আদান-প্রদান’, ‘সমর্থন’, ‘অনুসমর্থন’ ইত্যাদি বুঝাতে ব্যবহার করা হয়। ‘সংলাপ’ শব্দটি নাটক উপন্যাসের বা অন্য কোন কাজে বেশি উপযোগী হলেও ‘মতবিনিময়’ শব্দটি বেশি ব্যবহৃত হয় কোন সমস্যা নিরসনের জন্য। ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক বোদ্ধাদের সংশয় থেকে এবার নির্বাচন প্রক্রিয়া নতুনভাবে সাজানোর চেষ্টা চলছে। এর অংশ হিসেবে গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সাথে দুই দিনের মতবিনিময়ে জন্য মোট ৭১ জনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। আমন্ত্রণপ্রাপ্ত অতিথিদের মধ্যে থেকে অনুষ্ঠানে প্রথম দিন অর্থাৎ ১৬ আগস্ট সাংবাদিক ও সম্পাদক প্রতিনিধি অংশ নিয়েছেন ২৬ জন এবং দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ ১৭ আগস্ট অনলাইন ও ইলেক্ট্রনিক সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধিবৃন্দ অংশ নিয়েছেন ২৬ জন। অংশগ্রহণকারী প্রতিনিধিদের সংখ্যা যোগ বিয়োগ করে শতকারায় প্রকাশ করলে দেখা যাবে অংশগ্রহণ না করার হার শতকরা পঁচিশ শতাংশেরও বেশি। এর আগে প্রথম দফায় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদেরও অনেকেই বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে কমিশনের মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণ করেন নি। এটি তলিয়ে দেখা উচিত আমন্ত্রিত হয়েও কেন তাঁরা এই মতবিনিময় সভায় অশগ্রহণ করেন নি? ভবিষ্যতে এদের মধ্য থেকে কেউ সুযোগ বুঝে আবার এই কমিশন নিয়ে প্রশ্ন তুলবে না তো? অথবা তাদের দেখানো কারণ যৌক্তিক হলে তা বিবেচনায় নিয়ে সমাধানের পথে অগ্রসর হওয়া উচিত।
শিক্ষক বুদ্ধিজীবী, দেশি-বিদেশি রাজনৈতিক বোদ্ধা, কূটনৈতিক মিশনের সদস্যবৃন্দ, বিদেশি রাষ্ট্র সবাই দাবি করেছেন অতীতের কাজী রকিব উদ্দিন কমিশন নির্বাচন সংক্রান্ত কাজে জনগণের আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। জনগণের সেই হারানো আস্থা পুনরায় ফিরে আনতে পরামর্শও দিয়েছেন তাঁরা। জনগণের আস্থা প্রতিষ্ঠার দায়িত্বে যেমন নির্বাচন কমিশন রয়েছে তেমনি জনগণ ও রাজনৈতিক দলসমূহকেও কমিশনের প্রতি আস্থা রাখতে হবে। কারণ আস্থার মাঠে সংশয় হলো ইতোমধ্যে দেশের একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি প্রচার করতে শুরু করেছে যে, এই কমিশন ব্যর্থ, এটি শেখ হাসিনা সরকারের আজ্ঞাবহ কমিশন ইত্যাদি। তাহলে আস্থা নামক পরশ পাথরের সন্ধান মিলবে কেমন করে? বিগত ১৬ ও ১৭ আগস্ট দুইদিনব্যাপি গণমাধ্যম কর্মীদের সাথে আলোচনায় এবং প্রথম দফায় সুশীল সমাজের সাথে আলোচনায় কেউই কমিশনের বিরুদ্ধে অসহযোগিতা বা অন্য কোন কারণে দোষারোপ করতে পারে নি। আগামী ২৪ আগস্ট হতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া রাজনৈতিক দলসমূহের সাথে মতবিনিময় নিয়েও কেউ বিরূপ প্রশ্ন তুলতে পারবে না এটিই আমাদের প্রত্যাশা। এভাবেই কেবল জনমনে ‘আস্থা’ শব্দটি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
একটি বিষয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক ও সম্পাদকবৃন্দ যাঁদেরকে কমিশন থেকে আমন্ত্রণ করা হয়েছিলো তাঁরা সবাই ঢাকায় বাস করেন। ধরে নিলাম তাঁরা ঢাকায় বসে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত হতে বিভিন্ন ধর্ম গোষ্ঠি ও শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছেন। তবে কি মনে করা উচিত যে, রাজধানী ঢাকা বাদে দেশের অন্য কোন এলাকায় নির্বাচন কমিশনকে মতামত দেয়ার মতো কোনো বিশেষজ্ঞ নেই? এর মানে এই নয় যে, মতামত প্রদানকারী প্রতিনিধিদের প্রতি জনগণের আস্থা নেই।
এখন পর্যন্ত দুই দফায় দেশের বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন মতবিনিময় সভায় মিলিত হয়েছেন। নির্বাচনী রোডম্যাপ অনুযায়ী আগামী ২৪ আগস্ট থেকে শুরু হচ্ছে রাজনৈতিক সংগঠনের সাথে মতবিনিময় সভা। তবে দেশের সাধারণ মানুষ কি তাহলে নির্বাচন কমিশনের নির্বাচন অনুষ্ঠান পক্রিয়া সম্পর্কে কোনো মতামত দিতে পারবে না?  আমি মনে করি এক্ষেত্রে দেশের সাধারণ জনগণেরও মতামত নেয়া উচিত। একটি সহজ পন্থায় এই সুযোগ দেশের সাধারণ মানুষের জন্য তৈরি করা যেতে পারে। যেমন- তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি ওয়েবসাইট নির্মাণ করে অথবা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে একটি নির্বাচন মতামত প্রদান গ্রুপ অ্যাকাউন্ট খুলে সুবিধাজনক যেকোনো সময় নির্ধারণ পূর্বক জনগণের জন্য মতামত প্রদানের জন্য সাইটি/গ্রুপটি উন্মুক্ত রেখে পরামর্শ গ্রহণ করা যেতে পারে। সেজন্য নির্বাচন কমিশনে একটি বিশেষজ্ঞ দল গঠন করে কন্ট্রোল রুম থেকে অফিস চলাকালীন মতামত গ্রহণ করা যেতে পারে। প্রতিদিনের মতামত থেকে প্রতিদিন কিছু গুরুত্বপূর্ণ মতামত বাছাই করে নথিবদ্ধ করে তা থেকে নির্বাচন সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে। তাই আসুন শুধু নির্বাচন কমিশন, শুধু প্রশাসন, শুধু ক্ষমতাসীন দলের উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকা নয়! একে অপরকে দোষারোপ করা আর নয়! প্রশাসন, জনগণ, সরকার সকলের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় একটি অবাধ সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে এগিয়ে আসি।
লেখক:  শিক্ষক, বিজনেস স্টাডিজ বিভাগ ও সহকারী প্রক্টর
নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী
ংযুধসড়ষঁরঃং@মসধরষ.পড়স