ইসি গঠনে আইন করার তাগিদ সাবেক সিইসি হুদার

আপডেট: জানুয়ারি ১২, ২০১৭, ১১:৪৫ অপরাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


সংবিধানের বিধি অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন গঠনে এখনই আইন করার পক্ষে মত দিয়েছেন সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এটিএম শামসুল হুদা।
বৃহস্পতিবার রাজধানীতে এক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি বলেন, “এখন একটা পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। ডায়ালগ (গোলটেবিল আলোচনা) করার সময় নেই। একটা (আইন) করতে হবে, পরে দেখা যাবে সেখানে কী নেই। আগে একটা আসুক। তার পর সময় হবে… দেখা যাবে।”
বুধবার রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে ইসি গঠন নিয়ে সংলাপে আওয়ামী লীগ জানিয়েছে তারা এখনই এ বিষয়ে আইন করতে রাজি। ক্ষমতাসীন দলটির প্রস্তাবে বলা হয়, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের লক্ষ্যে সম্ভব হলে এখনই একটি উপযুক্ত আইন প্রণয়ন অথবা অধ্যাদেশ জারি করা যেতে পারে।
“সময় স্বল্পতার কারণে আগামী নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে তা সম্ভব না হলে পরবর্তী নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের সময় যাতে এর বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের নির্দেশনার আলোকে এখন থেকেই সে উদ্যোগ গ্রহণ করা যায়।”
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, পাঁচ বছর মেয়াদী নির্বাচন কমিশন গঠনের এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির।
সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে বলা আছে: প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চারজন নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোন আইনের বিধানাবলী-সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন। কিন্তু সংবিধানের আলোকে ওই আইন সাড়ে চার দশকেও না হওয়ায় প্রতিবারই নির্বাচন কমিশন গঠনে জটিলতা দেখা দেয়। গতবার নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সার্চ কমিটি গঠনের একটি পদ্ধতি গ্রহণ করেছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান।
সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে প্রধান করে গঠিত সার্চ কমিটি ১০ জনের নাম প্রস্তাব করে এবং তার মধ্য থেকে দুজনের নাম সিইসি হিসেবে প্রস্তাব করে।
ওই সুপারিশের মধ্য থেকে সাবেক সচিব কাজী রকিবউদ্দীন আহমদকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং আরও চারজনকে কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেন জিল্লুর রহমান। ওই কমিশনের মেয়াদের শেষ পর্যায়ে এসে এবারও একইভাবে সংলাপের আয়োজন করে ইসি গঠন করতে যাচ্ছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।
এর আগে বিএনপি আমলে নিয়োগ পাওয়া বিচারপতি এম এ আজিজ নেতৃত্বাধীন ইসি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে ২০০৭ সালে নবম সংসদ নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। পরে ওই নির্বাচন আর হয়নি; রাজনৈতিক সংঘাতের মুখে দেশে আসে জরুরি অবস্থা; সেনা নিয়ন্ত্রণে দুই বছর দায়িত্ব পালন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার।
ওই সময় গঠিত হন এ টি এম শামসুল হুদা নেতৃত্বাধীন তিন সদস্েযর ইসি, যাকে বাংলাদেশের সফলতম কমিশন হিসেবে বিবেচনা করেন অনেকে।
২০০৭ সালে বিদায়ের আগে ‘ইসি নিয়োগ সংক্রান্ত আইনের আলাদা খসড়া’সহ নির্বাচনী আইন সংস্কারে বিভিন্ন সুপারিশ করেছিল শামসুল হুদার কমিশন। তার মধ্েয থেকে কিছু সুপারিশের বাস্তবায়ন হলেও আইন আর হয়নি।
শামসুল হুদার ইসির করা সেই খসড়া নিয়েই জাতীয় প্রেসক্লাবে বৃহস্পতিবারের গোল টেবিল আলোচনার আয়োজন করে বেসরকারি সংগঠন সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন।
‘নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে প্রস্তাবিত আইনের খসড়া ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা’ শীর্ষক এই আলোচনায় নির্বাচন কমিশনারদের নিয়েগের আগে তাদের যোগ্যতা নির্ধারণের ওপর জোর দেন সাবেক সিইসি হুদা।
“কমিশনারদের ব্যাকগ্রাউন্ড খুব ইমেপর্টেন্ট। তারা দলের কিনা? অফিস বেয়ারার ছিলেন কিনা? কোনো সময় নির্বাচন করেছেন কিনা? এগুলো দেখতে হবে। অতীতে এমন হয়েছিল- একটি দলের হয়ে কনটেস্ট করতে চেয়েছিল তাকে কমিশনার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।”
একটি ইংরেজি দৈনিকে প্রকাশিত খবরের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, “সরকারি দল প্রস্তাব দিয়েছে, নির্বাচনকালীন নির্বাচন কমিশনকে সরকারি এজেন্সির সুপারভাইজরি অথরিটি দিতে চাচ্ছে। এটাতো… কমিশনাররা ঠিক না থাকলে অপাত্রে দান… নিজেরাই ঠিক নেই, কী সুপারভিশন করবে!” সিইসিসহ পাঁচজন নির্বাচন কমিশনারের সংখ্যা নিয়েও আপত্তি করেন সাবেক সচিব শামসুল হুদা।
“কমিশনার এতগুলা… তখন বলেছিলাম, এটা ভালো হবে না। ভারত এতবড় দেশ, মাত্র তিনজন কমিশনার। আগেতো একজন ছিল।”
রাষ্ট্রপতির সংলাপের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, “মহামান্য রাষ্ট্রপতি খুবই ভালো কাজ করছেন। অত্যন্ত বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন। জাতি কৃতজ্ঞ থাকবে যদি উনি ভালো কমিশন দিতে পারেন।” কমিশনের বদলে কমিশন গঠনের সার্চ কমিটির আকার বড় করার ওপর জোর দেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন।
আলোচনায় তিনি বলেন, “সার্চ কমিটি এনলার্জ করা উচিত, ৩-৪ জন নয়। তাহলে এটা আরও ট্রাসপারেন্ট হবে।”
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, “যেহেতু সংবিধানে বলা আছে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দেবেন, নির্বাচন কমিশন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এই পরামর্শ দেওয়াটা রহিত করা দরকার। এটা ব্যতিক্রম হতে পারে। প্রধান বিচারপতি নিয়োগে উনি যেমন পরামর্শ দেন না, তেমন। এজন্য সংবিধান সংশোধন করতে হবে।”
সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “যেহেতু প্রধানমন্ত্রী প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন চান না, সেহেতু তিনি এবার নাম প্রস্তাব না করুন। রাষ্ট্রপতি তার মতো কাজ করুক।”
হাফিজ উদ্দিন খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বদিউল আলম মজুমদার মূল প্রবন্ধ পড়েন। অন্যদের মধ্যে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইনাম আহমেদ চৌধুরী, সিপিবির কেন্দ্রীয় নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স, কলামনিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আসিফ নজরুল বক্তব্য দেন।- বিডিনিউজ