ইহার চেয়ে নাম যে মধুর

আপডেট: জুন ১৮, ২০২১, ১২:১০ পূর্বাহ্ণ

স্মৃতি রুমানা:


হাকিম চত্বরের এদিকটায় আজ কোলাহল নেই। সড়কবাতির আলোও খুব ম্লান। রেইনট্রির অঘন পাতার ফাঁক দিয়ে চাঁদটা দেখা যায় বটে, আলো এসে পৌঁছায় না। ঘষা কাঁচের মতো চাঁদটা আকাশের গায়ে লেগে থাকে। সড়কবাতির ঝাপসা আলোর আবছায়ায় ফাঁকা জায়গা দেখে বসে পড়ি। আগে হলে এটুকু বসবার জায়গাও পাওয়া
যেত না। বইমেলার সময় তো নয়ই। করোনা প্যান্ডেমিক সবকিছু এলোমেলো করে দিয়েছে। বইমেলাও এবার
ফেব্রুয়ারিতে হতে পারেনি। পরেও হবে কিনা সন্দেহ ছিল। শেষপর্যন্ত মার্চে এসে শুরু হয়েছে। কিন্তু ভিড় তেমন নেই। ক্রেতাশূন্য শূন্য স্টলে প্রকাশকদের মন ভার করে রাখা মুখ দেখে আমার মনও খারাপ হলো। বিক্রিবাট্টা না হলে কী হবে এই মেলা দিয়ে! মেলার মাঠটা এবার আরও বড়। সবগুলো স্টলে যাওয়া হলো না। খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। মার্চ মাসের মাঝামাঝি গরমটা হঠাৎই বাড়তে শুরু করে। তাপমাত্রা হয়তো তত বাড়ে না। কিন্তু সবে শীতকাল কাটিয়ে আসা শরীরে সামান্য গরমই প্রচ- অনুভূত হয়। খুব বেশি যে ঘুরেছি তা নয়। পা দুটো তবু অবসন্ন হয়ে পড়েছিল। হাঁটার অনভ্যস্ততার জন্য একটু হেঁটেই পা টনটন করছে। অবশ্য বেরিয়েছি সেই দুপুরে। বন্ধু ইতি ফোন করে সাবধান করেছিল, অফিস ছুটির আগে পৌঁছাতে না পারলে নিশ্চিত জ্যামে পড়ব। আগারগাঁও থেকে পথ বেশি নয়। সব মিলিয়ে হয়তো তিরিশ মিনিটের পথ। কিন্তু কে না জানে, ঢাকায় তিরিশ মিনিট মানে তিন ঘণ্টা। আজ ভাগ্যিস, তিন ঘণ্টা লাগেনি। ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যেই চলে এসেছিলাম। এই এক মেলার জন্য সারাবছর অপেক্ষা করি তো। যারা ঢাকায় থাকে, তারা এই অপেক্ষার আকুলতা ঠিক বুঝবে না। আমার তো আবার বইয়ের ঘ্রাণে নেশা হয়। নতুন বইয়ের ঘ্রাণে আরও। তাই, এসেই হামলে পড়েছি স্টল থেকে স্টলে। ততক্ষণে ইতিও চলে এসেছে। সঙ্গে আরও কজন। সবাই মিলে মজা করে ঘুরছি। বই কিনছি। স্টলের বিক্রেতারা আরও কিনতে প্রলুব্ধ করছে। কিন্তু কাঁধের ব্যাগে আর জায়গা নাই। ভরে গেছে বইয়ে। ইতি সঙ্গে আসা ছেলে দুটোর ঘাড়ে বইয়ের ব্যাগ চাপিয়ে দিয়েছে। একটা ছেলে, যার নাম ইমরান আমার ব্যাগের দিকে তাকিয়ে বলল, দেন আপা আমার কাছে। আমি নিয়ে নিচ্ছি। আমি বললাম, পারবে! ইমরান আমার কাছ থেকে বইয়ের ব্যাগটা নিয়ে নিলো। কিন্তু ওকে বোঝা চাপিয়ে আমা মনটা কেমন খচখচ করতে লাগলো। বললাম, চলো, এবার বেরোই। ততক্ষণে সন্ধ্যে হয়ে গেছে। আমরা মেলার গেইট পেরিয়ে হাকিম চত্বরের খোলা জায়গাটায় এসে বসলাম। সড়কবাতির ম্লান আলোর ভেতর আরও অনুজ্জ্বল চাঁদ তখন কোনোই প্রভাব বিস্তার করতে পারছে না। ইমরানের সঙ্গী আরেকটা ছেলের নাম মাহফুজ। ওরা ঢাকার কোনো এক কলেজে পড়ে। প্যান্ডেমিকে কলেজ বন্ধ। বন্ধ তো সেই গতবছর মার্চ মাস থেকে। ওরা দুজনেই এতদিন বাড়িতে ছিল। এই কদিন হলো আবার ঢাকায় ফিরেছে। ওরা থাকায় ইতির তো সুবিধে হলোই, সঙ্গে আমারও। আমার পায়ের অবস্থা যা হয়েছিল, ইমরান বইয়ের ব্যাগটা আগ বাড়িয়ে না নিলে আর দেখতে হত না। ইতির সঙ্গেও আমার খুব বেশিদিনের পরিচয় নয়। তবে অল্পদিনেই ওকে খুব ভালো লেগে গেছে আমার। ঘোরাঘুরির সুত্রে ওর সঙ্গে পরিচয়। মেয়েদের একটা গ্রুপে সাজেক পাহাড়ে ঘুরতে গিয়েছিলাম গতবছর। ইতিও গিয়েছিল। সেই প্রথম দেখা। পাহাড়ে ট্রেকিংয়ের সময় প্রথম আলাপ। প্রথম আলাপেই মনে হয়েছিল, এই টিঙটিঙে মেয়েটি তো বেশ। আস্তে আস্তে ওকে আরও কিছুটা জেনেছি। সে যেন জংলিকন্যা একটা। মোগলির মতো ঘুরে বেড়ায় এ জঙ্গল থেকে ও পাহাড়ে। ইতির সঙ্গে দেখা করার জন্য এসেছে ওর খালাত না মামাত
এক বোন। অফিস থেকে সোজা মেলায় এসে হাজির। প্রথম আলাপে আমি ঠিক কারো সঙ্গে সহজ হতে পারি
না। মেলার ভেতরে এতক্ষণ কথা বলার সুযোগ পাইনি। ইহার চেয়ে নাম যে মধুর অবশ্য। হাকিম চত্বরে বসে ঊর্মি আপা নিজেই আমাকে সহজ করে নিলো। সবারই ততক্ষণে পিপাসা পেয়েছে। ইমরান আর মাহফুজকে বলা হলো ঠা-া পানি নিয়ে আসতে। ওরা পানির সঙ্গে টানিও নিয়ে ফিরলো। টানি মানে চিকেন বার্গার আর আইস ললিপপ। আমরা গোগ্রাসে গিললাম। মেলাময় ঘুরে যে এত খিদে পেয়েছে বুঝতে পারিনি। চিকেন বার্গারটাকে মনে হলো পৃথিবীর সবচেয়ে টেস্টি খাবার। ইমরানকে বললাম, ভাই, একটা কাজের কাজ করেছ বার্গারগুলো এনে। তোমাদের আমার বাসায় দাওয়াত। আমি তোমাদের বিরিয়ানি রেঁধে খাওয়াবো। ঊর্মি আপা বলল, কেবল ওদের বললেই হবে! আমরা যাবো না! আমি বললাম, চলেন বরং একটা ভ্রমণের প্ল্যান করা যাক। আমার বাসায় থেকে সবাই মিলে পুরো বরেন্দ্র এলাকা ঘুরে দেখব। সোনা মসজিদ, আলতাদিঘি, পাহাড়পুর আরও কত জায়গা। আপনারা
হয়তো কখনো যাননি ও অঞ্চলে। বরেন্দ্র এমনিতে খুব সাধারণ। কিন্তু লাল মাটির অসমতল ভূমিতে হাঁটতে হাঁটতে আপনি পৌঁছে যাবেন, ইতিহাসের পাতায়। আলাউদ্দিন হুসেন শাহ আপনাকে দেখা দিয়ে যাবেন। সোনা মসজিদে আপনি দেখতে পাবেন শাহ সুজার বিশ্রামাগার লোকে বলে তোহাখানা। আমরা ইলা মিত্রের নাচোলে গিয়ে দেখে আসব সেই বাথান, পুকুর, মঠ। অবশ্য বিপ্লবী নেত্রী ইলা মিত্র চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলের যেসব গ্রামের সাঁওতাল
আদিবাসীদের নিয়ে তেভাগা আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, সেই গ্রামগুলোতে এখন সাঁওতালদের খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে একটি পুকুর ও একটি মন্দির এখনও আছে। তেভাগা আন্দোলনের ঘাঁটি নাচোলের কেন্দুয়া, ঘাসুরা, রাওতারা, চ-ীপুর প্রভৃতি সাঁওতাল গ্রামগুলো। রাওতারা গ্রামের পাশে সেই মন্দিরকে লোকে এখন ‘ইলা মিত্র মঠ’ নামে চেনে। আন্দোলনের স্মৃতি ধরে রেখেছে রাওতারা গ্রামের আরও একটি পুকুর। আন্দোলনকারীরা পুলিশের এক দারোগা ও তিন কনস্টেবলকে হত্যার পর এই পুকুরপাড়ে পুঁতে রাখেন। পুকুরটির নাম ‘দারোগাপোঁতা পুকুর’। আমি যেদিন প্রথম এই পুকুরটার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম, এক অদ্ভুত অনুভূতি হয়েছিল আমার। পুকুরের পানিতে মুখ ধুতে ধুতে আমি ভাবছিলাম সেইসব মানুষদের কথা যারা পুলিশ হত্যার দাম মিটিয়েছিল জীবন দিয়ে। পুলিশ আদিবাসীদের গ্রামকে গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়, নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে। ধর্ষিত হন সাঁওতাল নারীরা। প্রাণভয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান আদিবাসীরা। ছত্রভঙ্গ হয়ে যান আন্দোলনের কর্মীরা। পালাতে গিয়ে রহনপুর রেলস্টেশনে ধরা পড়েন ইলা মিত্র। ইলা মিত্রকে নাচোল থানায় নিয়ে নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ইলা মিত্রর দেওয়া নির্যাতনের জবানবন্দি ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। জবানবন্দি প্রকাশিত হওয়ার পর পাকিস্তানের
শাসকগোষ্ঠীর নিষ্ঠুর চেহারা উন্মোচিত হয়। ফেরার পথে আমরা যেতে পারি পাশের টিকইল আল্পনাগ্রামেও। যে
গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে নানান আল্পনা আঁকা। খুব খারাপ হবে না কিন্তু আপা। এতক্ষণ আমার প্রগলভ ইহার চেয়ে নাম যে মধুর বক্তৃতা শুনে ঊর্মি আপার মুখ দেখলাম উজ্জ্বল হতে হতে মলিন হয়ে গেল। বললাম, কী হলো আপা? ঊর্মি আপা বলল, রাজশাহী গেলে তো কয়েকদিন থাকতে হবে। কিন্তু ততদিন আমার বাচ্চাদের কে দেখবে! দুজন তো খুবই ছোট, ওদের নিয়ে যাওয়াও সম্ভব না। ওরা বড় হোক, তারপর ঠিক একদিন গিয়ে হাজির হব তোমার
রাজশাহীর বাসায়। কথায় কথায় রাত বাড়ছে। এবার ফিরে যেতে হবে। ঊর্মি আপা যাবেন শ্যামলীতে। আমার পথেই। ইতি যাবে মুগদায়, ইমরান আর মাহফুজ ফিরে যাবে যে যার জায়গায়। রাত বাড়ায় চাঁদের ঘষাভাব দূর হয়েছে। রেইনট্রির পাতার ফাঁক গলে মায়াবী হাতছানি দিচ্ছে যেন। ঊর্মি আপা বলল, আমার বাচ্চাগুলো সারাদিন মা ছাড়া আছে রে। গিয়ে একটু খাওয়াতে হবে। চল্ যাই। ইতিরা চলে গেল একটা সিএনজি অটোরিকশায়। আমি
আর ঊর্মি আপা হেঁটে হেঁটে চলে এলাম রোকেয়া হলের গেইট ছাড়িয়ে। রাস্তায় যানবাহন কম। রাত বাড়ায় আরও কমে গেছে। অবেশেষে পাওয়া গেল একটা সিএনজি। সিএনজিতে বসে খুব ভালো লাগতে লাগলো। দিনের গরমটা এখন আর নেই। শীতল হাওয়া এসে লাগছে চোখেমুখে। রাস্তাতেও কোনো জ্যাম নেই। আজকের দিনটাই ভালো। ঢাকায় বাধাহীনভাবে গন্তব্যে পৌঁছানো তো অসম্ভব একটা ব্যাপার। সেটাই ঘটছে। ততক্ষণে আসাদ গেইট ছাড়িয়ে শ্যামলির কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। আপাকে জিজ্ঞেস করলাম বাচ্চা কয়টা আপনার? আপা বললেন, ৪টা। আমি বেশ অবাক হলাম। আপাকে দেখে তো মনে হয় না এতগুলো সন্তানের মা উনি। বলতে বলতে শ্যামলিতে এসে পড়ায় আপা নেমে গেলেন। আমার ইচ্ছে করছিল বাচ্চাদের জন্য কয়েকটা চকলেট কিনে দেই। কিন্তু আপার আরও দেরি হয়ে যাবে, তাই আর দেওয়া হলো না। ঘুমাতে যাবার আগে ঊর্মি আপার কথা মনে হলো। আমার বিস্ময়ভাবটা এখনও যায়নি। ৪টা বাচ্চা ঊর্মিআপার, অবিশ্বাস্য! ভাবলাম ঊর্মিকে আপাকে একবার ফোন দিই। ফোনসেটটা হাতে নিতেই দেখি ফেসবুকে ঊর্মি আপারই ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট। রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করেই নক করলাম মেসেঞ্জারে। বাচ্চারা কেমন আছে, রাতে খেয়েছে কি না ঠিকমতো, ঘুমালো কিনা ইত্যাদি। আপা বললেন, দাঁড়াও তোমারে আমার বাচ্চাদের ছবি দেখাই। আমিও বেশ আগ্রহ নিয়ে মেসেঞ্জার ইনবক্সে তাকিয়ে আছি। ছবি এলো কয়েকটা বিড়াল ছানার। রিপ্লাই করলাম, বাহ্। কিউট বিড়ালছানা। তারপর অপেক্ষায় আছি আপা কখন বাচ্চাদের ছবি দিবেন। কিন্তু ছবি আর আসে না। আমি অপেক্ষা করছি তো করছিই। একটু পরে, ছবির বদলে আপার আরেকটি মেসেজ এলো, আজকাল আমার এই বাচ্চাগুলো খুব দুষ্টু হয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে ঘোরে যতক্ষণ বাসায় থাকি। ইহার চেয়ে নাম যে মধুর অন্যরা খেতে দিলেও খায় না ঠিকমতো। আমাকেই খোঁজে সারাক্ষণ। তাই তো অফিস থেকে আর কোথাও যাওয়া হয় না তেমন। এদের জন্য বাসায় ফিরে আসি। আমার জন্য তোমারও আরেকটু বেশি সময় থাকা হলো না ক্যাম্পাসে। কিন্তু এই বাচ্চাগুলোর জন্য মন কেমন করতে থাকে। সরি রে।
আমি বিমূঢ় হয়ে বসে আছি। চোখে ভাসছে, ঊর্মি আপার বাচ্চাদের জন্য অস্থিরতার মুহূর্তগুলো। দীর্ঘশ্বাস
হয়ে একটা শব্দই বেরিয়ে এলো আমার মুখ দিয়ে,‘মা!