ঈদের আনন্দমাখা আলোকময় দিনগুলো

আপডেট: জুন ২৫, ২০১৭, ১:১০ পূর্বাহ্ণ

মো. আবদুল কুদ্দুস


পৃথিবীতে যা শ্রেষ্ঠতর তা সবাই অধির আগ্রহে পেতে চায়। এই যেমন- শাওয়াল মসের এক তারিখে পশ্চিম আকাশে উদিত বাঁকানো চাঁদ। এটি কার কাছে না প্রিয়! আমার মনে হয় এটাা সবার কাছেই প্রিয়। কেননা এই চাঁদ প্রতিটি মানুষের ঘরে খুশির বার্তা বয়ে নিয়ে আসে। পৃথিবীর সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে একটি সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করে। পশ্চিম আকাশে উঁকি দেয়া এই চাঁদটি শুরু করে নতুন একটি ঈদের যাত্রা। কারো কাছে এ মুহুর্তটি ‘চাঁদ ঈদ’ বা ‘চাঁন্দা ঈদ’ নামে পরিচিত। ছোট বেলায় বাবা-চাচার কাঁধে উঠে পশ্চিম আকাশে একপলক এই বিশেষ চাঁদটিকে দেখবার জন্য তাকিয়ে থাকতাম। এমন সময় মেঘপুঞ্জ ভীষণ ঝামেলা করতো। একটু পরপর মেঘপুঞ্জের দল আমাদের প্রখর দৃষ্টির সামনে এসে আকাশে ঘনকালো আবহ তৈরি করতো। এতে কখনো কখনো বিরক্ত হতাম। আবার কখনো এই বিরক্তির সাথে আমাদের চাঁদ দেখার আকাক্সক্ষা আরো বেড়ে যেত। বাড়ির উঠান থেকে চাঁদ দেখেতে না পেলে সবাই মিলে হই-হই-রই-রই করে অবারিত বিল-পাঁতারে দৌড়ে যেতাম। আমাদের দলের মধ্যে থেকে অনেকে দুষ্টামি করে বলতাম ‘ওই যে চাঁদ! ওই গাছের ওপর দিয়ে দেখ! আমি সবার আগে দেখেছি!’ কিন্তু আসলে তা নয়! কখনো যদি সত্যিই কেউ একবার দেখতে পেতাম তবে আনন্দের সীমা থাকতো না। আতশবাজি করে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে উদ্যাপন করতাম। অনেক চেষ্টার পর চাঁদ দেখতে না পেলে সঙ্গে রাখা বেতার-টেলিভিশনে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ঘোষণা মোতাবেক নজরুলের সেই বিখ্যাত গান ‘রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ…’ শুনে নাচতে নাচতে ঘরে ফিরে যেতাম। ছোটবেলায় গ্রামে বসে গ্রামের আকাশে চাঁদ দেখতাম। এখন শহরে বাস করি। বিশাল বিশাল অট্টালিকা ঘেরা বাড়ির ছাদে বসে চাঁদ দেখি। এও তো কম আনন্দের নয়! তখন বাবা-চাচার কাঁধে উঠে চাঁদ দেখতাম। এখন ভাস্তে-ভাতিজি, ভাগ্নে-ভাগিনীদের কাঁধে তুলে নিয়ে চাঁদ দেখি। চাঁদ দেখাই। প্রতিটি মহুর্তে শৈশবের স্মৃতি মনে পড়ে যায়। সবাই মিলে আনন্দের জোয়ারে ভেসে যায়।
জীবনের প্রতিটি বছরই ভিন্ন স্বাদে, ভিন্ন রঙে দেখেছি সব ঈদ। দিন যত বাড়ছে ঈদের আনন্দ উপকরণের বেশ পরিবর্তনও হচ্ছে। ঈদকে সামনে রেখে মানুষ কর্মমুখি হয়। বন্ধ কারখানা নতুন রূপে চালু করা হয়। কাজের মাধ্যমে আয় উপার্জনের জন্য মানুষ শহরমুখি হয়। অর্থনীতি সচল হয়। বাজারে পণ্য ক্রয়-বিক্রয় বেড়ে যায়। সরকার আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় অধিক তৎপর হয়। প্রিয়জনের সাথে ভালোবাসা ভাগাভাগি করতে পৃথিবীর নানা প্রান্ত হতে মানুষ নিজ জন্মভূমিতে ছুটে আসে। নতুন পোষাক কিনে পরিধান করে সারা বছরের গ্লানি ভুলে যায়। ঈদের দিনে পোলাও-কোরমা পাতে ধনী-গরীব সবাই আনন্দে মেতে উঠে। পৃথিবী সাজ সাজ রূপে ‘মানব সুখের পরম শান্তির গহনা’ পরে নেচে উঠে। রাষ্ট্রপ্রধানরা দেশের নানা স্তরের মানুষের সাথে সাক্ষাৎ করেন। টিভি চ্যানেলে দেশজ সংস্কৃতির নানামাত্রিক অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হয়। ঈদকে সমানে রেখে পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য হাজারো রকমের অফারের সমাহার ঘটে। পরিচিত জনেরা একে অপরের কাছে ‘শুভ কামনা’ জ্ঞাপক বার্তা পাঠায়। এদিন পরিবারের সকল সদস্য খুব সকালে ঘুম থেকে জেগে উঠে। নিজেদের গোসল সেরে নতুন কাপড় পরে। ছোটরা বড়দের কাছে ‘আশির্বাদ ও সেলামি’ গ্রহণ করে। বড়রা ছোটদের মিষ্টি মধুর ভালোবাসায় অভিভুত হয়। সামর্থ্যবানরা বাড়িতে আলোকসজ্জা করে আনন্দের বাড়তি খোরাক জোগায়। বাড়িঘর নতুন সাজে সজ্জিত হয়। ঈদকে অনুষঙ্গ করে কবিরা কবিতা লিখেন। কথা সাহিত্যিকরা সাহিত্য রচনা করেন। একজন মানুষ। একজন সৃষ্টিশীল কর্মমুখি পরিশ্রমী মানুষের জীবনে ঈদের গুরত্বের শেষ নেই। ঈদ বয়ে আনুক পৃথিবীর বুকে ও মানুষের হৃদয়ে অনাবিল সুখ ও শান্তি। সবাইকে ঈদ মোবারক।
লেখক: শিক্ষক, বিজনেস স্টাডিজ বিভাগ ও সহকারী প্রক্টর, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী,