ঈদের খুশি ঢেউয়ের তালে

আপডেট: জুন ২৪, ২০১৭, ১:১৬ পূর্বাহ্ণ

রুনা তাসমিনা


সেলোয়ারের কোঁচড় থেকে বের করে টাকাগুলো বিছানার উপর রাখে সুমি। তিনটা দশ টাকা, কিছু পাঁচ টাকা, বেশ কিছু দুই টাকার সাথে বেশ কিছু খুচরো পয়সা! গোনা শেষ করে মাকে ডেকে বলে, আইজ একশো ছিয়াত্তর ট্যাহা হইছে মা! সব মিলাইয়া কত অইল কও তো?
চুলার জ্বাল একটু ঠেলে উনুনটা বাড়িয়ে দিয়ে, উঠে চালার ঘরের ভেতরে এসে ভাঙা চৌকিটার একপাশে বসে সুমির মা। টাকাগুলো হাতের মুঠোয় তুলে নিয়ে বলে, সব মিলাইয়া পাঁচশ ষোল হইল। আইজ শুক্কুরবার তাই একটু বেশি পাইলি। অন্যদিন তো তিরিশ-চল্লিশ ট্যাহার বেশি অয় না!
তুমি ভাইবো না মা! দেইখো আর দশ-পনর দিনের মইধ্যে বাকী ট্যাহা জোগার হয়া যাইব!
বিছানায় শুয়ে পড়ে সুমি। চোখ দুটো বন্ধ করে ভাবে, ঈদের সময় মায়ের জইন্য শাড়ির চিন্তা নাই, ওই বাড়ি থিক্যা দিয়া দিবো। সেদিন বাজারে গিয়া দেইখ্যা আসছে ছোড ভাই-বইনসহ নিজের জইন্য জামা-কাপড় কিনতে হাজার ট্যাহা লাগবো। হাতে আছে মাত্র সাতদিন! পারুম তো এই কয়দিনে! ক্লান্ত, অবসন্ন শরীর, ঘুম নেমে আসে চোখে।
শহরের শেষ প্রান্তে পারকি চরে তাদের একচালা ঘরটি। ওদের নিজের বাড়ি কোথায় জানে না সুমি। মায়ের মুখে শুনেছে তার এক খালার সাথে চট্টগ্রাম আসা। সকালে মা একটা বাড়িতে হাঁড়ি-পাতিল, থালা-বাসন, কাপড়-চোপড় ধোয়াসহ টুকটাক কাজ করে যা পায় তা দিয়ে তাদের চলতে অনেক কষ্ট হয়। বিকেলে ঝাউবনের ভেতরে সাজিয়ে রাখা টেবিলে বসে  যারা খেতো, গল্প করতো তাদের কাছে গেলে কেউ টাকা দিত, কেউ খেতে না পারা খাবার! এদিক দিয়ে ঘুরে চলে যেত সাগরের পারে! সুমি তখন মায়ের সাথেই এখানে আসতো।  মা ভিক্ষা চাইত, সুমি অবাক চোখে ওদের দেখতো! পরনে কি সুন্দর পোষাক ওদের! কি সুন্দর কইরা কথা কয়! মা-র কাছে শুনেছে ওরা নাকি শহরের বড় দালানে থাকে। ওদের নাকি অনেক টাকা পয়সা। সুমি ভাবে, ছোড ছোড পোলাপাইনগুলানরে ওদের বাপ মায়ে কত্তো আদর করে! সুমি বাপজানরে কুনদিন দেহে নাই! বুদ্ধি হওয়ার পর থেইক্যা মায়েরেই কেবল দেখছে তিন ভাই-বইন লইয়া! এক দুইবার মেয়েরে জিগাইচিল বাপজান কই? মা বিরক্ত অইয়া কইত, মইরা গেছে কইলে পাপ অইব! আছে কুনহানে হের সুন্দরি বউরে লইয়া! আমাগোরে হের পচন্দ নয় বুঝলি? পচন্দ নয়!
মায়ের কথা শুনে সেদিন তার ছোট মনে অনেক প্রশ্ন ভিড় করলেও কোন এক অজানা কারনে মা-র কাছে একটি আর প্রশ্নও করার সাহস হয়নি। ধীরে ধীরে সময় গড়িয়েছে অনেক, পা ভাঙার পর থেকে মা আগের মতো হাঁটতে পারেনা তাইশ সে একাই যায় সাগর পারে। বিকেল বেলায় এদিকে অনেক মানুষ বেড়াতে আসে। তাদের কাছে হাত পাততে লজ্জা লাগে সুমির। টাকা চাওয়ার একটি ভিন্ন উপায় বের করে সে। আবদুল কাকুর দোকানে টেপ রেকর্ডারে বিকেল বেলা গান ছাড়ে! ঘুরে ফিরে কিছু গানই বারবার বাজে!শুনে শুনে মুখস্থ হয়ে গেছে তার। সকালবেলা সাগরপারে কেউ তেমন একটা থাকেনা। পাড়ার কিছু ছেলে-মেয়ে খেলতে আসে। তারা যখন খেলা করে সুমি সে সময় আপনমনে গানগুলো গুনগুনায়! বিকেলে ঝাউবনে টেবিলঘিরে বসে থাকা এদিকে বেড়াতে আসা লোকজনকে গান শোনায়। কেউ কেউ খুশি হয়ে বকশিস দেয়, কেউ গানের তারিফ করেই শেষ, কেউবা টিটকারি মারে বাঁকা চোখে। তের বছর বয়স হলেও প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা সুমির তাদের চোখের এই ভাষা বোঝে। সরে আসে সেই দৃষ্টির সমুখ থেকে। সাগরের দিকে যায় শেষ বিকেলের দিকে। সূর্যটা তখন সোনালি হয়ে সোনা রঙ ঢেলে দেয় সাগরের বুকে। ঢেউয়ের সাথে নেচে নেচে সেই রঙ কুলে আসতে আসতে হারিয়ে যায়। সুমি প্রতিদিন এই দৃশ্য দেখে! প্রতিদিনই সে মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন হয়ে নিজের অজান্তেই গান ধরে মন খুলে। শুক্রবার হলে তার গান শোনার জন্যে অনেকেই তার পাশে দাঁড়ায়, কেউবা সুর মিলিয়ে গান ধরে তার সাথে। অন্যদিন পাঁচ-সাত কিংবা তার বেশি! গান শুনে যার যেমন খুশি বকশিস দেয়। কিন্তু রোজার সময়ের সাগরের তীর কেমন খালি খালি লাগে! অন্য সময়ের মতো লোকজন থাকে না। তখন সুমির রোজগার তেমন একটা হয়না, মায়ের একার রোজগারে সংসার চালাইতে অনেক কষ্ট হয়। মা কাজ সেরে ওই বাড়ি থেকে কিছু খাবার সাথে নিয়ে আসে, সবাই ভাগাভাগি করে তা খায়।
পরদিন দুপুরে ঝাউবনের দিকে যেতেই অবাক হয়ে যায়! লোকজনে ভর্তি! কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই সোহেলি ডেকে বলে, তুই এতক্ষণে আইছস? এইহানে নাকি আইজ নাটক অইব!
তাই? সুমির খুব খুশি লাগে। রোজার আগে ভালো একখান সুযোগ আইল! অনেক লোক আইছে, আইজ বেশ কিচু ট্যাহা পাওন যইবো! মনে আশা জাগে। অনেক লোক জড়ো হয়েছে স্যুটিং দেখার জন্য। কাউকেই কাছে ঘেঁষতে দিচ্ছে না নাটকের
লোকজন। কিছুক্ষণ পর কয়েকটা ক্যামেরা ফিট করা হয় দুই তিন দিক থেকে। একটা গাড়ির ভেতর থেকে নেমে আসে বেশ কিছু লোকজন। মা-র কাছে সুমি ছোটবেলায় রাজা-রাণী, রাজকুমার-রাজকুমারি, দৈত্য-দানোর গল্প অনেক শুনেছে। এখানে দৈত্য-দানো নেই, সবাই যেন রাজা-রাণী, রাজকুমার-রাজকুমারি! সুমি অবাক হয়ে দেখে আর ভাবে, রুপ য্যান ফাইট্যা পড়তাছে সবতে! আরে! গোঁফঅলা যেই লোক সব্বার শেষে নাইমলো হেরে তো আবদুল কাকু গো টেলিভিশনে বহুতবার দ্যাখচি! কি সুন্দর কইরা কতা কয়! কৌতুকগুলান দ্যাখলে তো হাঁসতে হাঁসতে পেটে খিল ধইরা যায়!
সবাইকে কড়া করে নিষেধ করা হয়েছে, যদি নাটক দেখতে চায় একদম কথা বলা যাবে না। সুমিরা সবাই মুগ্ধ হয়ে দেখছিল সুন্দর সুন্দর সব নাচ-গান! দুপুরে খাওয়ার জন্য কিছুক্ষণ বিরতি, সুমিদের বয়সী ছেলে-মেয়েদের ডেকে টুকটাক কাজ করিয়ে নেয় কেউ কেউ। বেচে যাওয়া খাবারের ভাগ পায় সুমিও। এসব খাবার সুমিদের জোটে না। ভাগ্য ভালো হলে কখনো কখনো এদিকে যারা বেড়াতে আসে তাদের ফেলে দেয়া উচ্ছিষ্টের সাথে আধা খাওয়া অংশ কাড়াকাড়ি করে যদি পায়! এদের কাছ থেকে খাবারের পাশাপাশি টুকটাক কাজ করে দেয়ার জন্যে মিলছে বকশিসও। সুমি মনে মনে ভাবে, এরা না যাওন তক এইহানেই থাহন লাগবো।
বিকেলের দিকে আবার যখন স্যুটিং শুরু হয়, গান-বাজনার সুরে সুরে ঢেউগুলোও যেন তালে তালে কখনো কূলে আসছে, আবার ফিরে যাচ্ছে সাগরে! সবাই খুব উপভোগ করছে এমন সময় হঠাত সেই গোফওয়ালা মানুষটি হাতের ছোট মাইকটি হাতে তাদের দিকে এগিয়ে এসে জানতে চায়, এবার আপনাদের কাছ থেকে শুনবো কিছু গান, যারা ভালো গাইতে পারবেন তাদের জন্য আছে পুরস্কার!
পুরস্কারের কথা শুনেই উৎসাহী হয়ে উঠে অনেকেই, সুমিকে ঠেলতে থাকে সোহেলী! ভয়, সংকোচ দুটোই আঁকড়ে ধরে সুমিকে! আচানক সোহেলী ওর একটি হাত উঁচুতে তুলে ধরে বলে, সুমিও অনেক সুন্দর কইরা গান গাইবার পারে!