ঈদের প্রস্তুতিতেও রমজান

আপডেট: জুন ২১, ২০১৭, ১২:৪২ পূর্বাহ্ণ

ড. মাওলানা ইমতিয়াজ আহমদ


রমজানের একমাস সিয়াম সাধনার শেষে আসে খুশির ঈদ। তাই তার প্রস্তুতিও নিতে হয় এই রমজানেই। প্রস্তুতি বলতে ঈদের জন্য নতুন পোশাক ও ভালো খাবারের কেনাকাটা এবং নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা। এই কাজগুলো এখন আমাদের জীবনের অনুষঙ্গ হয়ে গেছে। এগুলোকে বাদ দেয়ার কোন সুযোগ নেই। আবার এই প্রস্তুতিগুলো যখন নেয়া হয়, তখন রমজানুল মুবারকের পবিত্র সময় বিদ্যমান। তাই উভয়টির মাঝে সমন্বয় হওয়া খুবই প্রয়োজন। যাতে করে ঈদের প্রস্তুতিও নেয়া যায় এবং রমজানের পবিত্রতা বজায় রেখে পবিত্র সময়টুকুও কাজে লাগানো যায়।
ঈদের প্রস্তুতির প্রথম অংশের জন্য যেতে হয় বাজারে। বেশ সময় ব্যয় হয় এ কাজে। খেয়াল করতে এ বাজার করতে গিয়ে রোজার যেন কোন ত্রুটি বিচ্যুতি না হয়। অর্থাৎ মিথ্যা কথা বলা যাবে না, চুরি করা যাবে না, প্রতারণা করা যাবে না, ঝগড়া করা যাবে না। এ বিষয়গুলো মাথায় রাখতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে বাজারের পেছনে সময় ব্যয় করতে গিয়ে নামাজ যেন ছুটে না যায়। ইফতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। বাজার করতে গিয়ে ইফতার যেন অবহেলার শিকার না হয়। সাতাশে রমজানের পর আমাদের অনেকেই ঈদের প্রস্তুতিতে এমনভাবে নিমগ্ন হয়ে যায় যে, তার আচরণ দেখে মনে হয় রমজান চলে গেছে। কুরআন তেলাওয়াত করে না, নামাজ ঠিকমত পড়ে না, তারাবিহ পড়ে না। এটা মোটেও কাম্য নয়।
রমজানকে বলা হয়েছে সহমর্মিতার মাস। এ মাস এখনো বাকি। তাই সেই সহমর্মিতাও এখনো বাকি আছে। সহমর্মিতার অর্থ হলো একে অন্যের পাশে দাঁড়ানো। একে অন্যের সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নেয়া। সামনে ঈদ আসছে। ঈদের আনন্দ সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে সহমর্মিতার কোন বিকল্প নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘সকল জাতির ঈদ (আনন্দ-উৎসব) আছে। আর এটা (ঈদুল ফিতর) আমাদের ঈদ।’ আমাদের ঈদ মানে ঈদ সার্বজনীন। ধনী-গরীব নির্বিশেষে সকলের ঈদ। কিন্তু যারা ধনী তারা না হয় তাদের সামর্থ্য দিয়ে নতুন পোশাক, ভাল খাবারের আয়োজন করে ঈদের আনন্দ লাভ করবে। কিন্তু যারা গরীব, যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায়, তারা কী করবে? তারা কীভাবে আনন্দ উদযাপন করবে? ঈদতো তাদেরও। এখানেই রমজানের সহমর্মিতার শিক্ষা বাস্তবায়ন করতে হবে। ধনী বা সামর্থ্যবানদের এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে। আল্লাহর রাসূলের ঘোষণা- ঈদ সবার- এ কথাকে বাস্তবায়ন করার জন্য গরীব শ্রেণি- যাদের নতুন কাপড় কেনার সামর্থ্য নেই, যাদের পোলাও-গোশত, সেমাই ইত্যাদি ভাল খাবার যোগাড় করার সামর্থ্য নেই- তাদের কথা ভাবতে হবে। তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। ঈদের প্রস্তুতিতে তাদের জন্যও কেনাকাটা করতে হবে। নিজের আত্মীয়-স্বজন, নিজের প্রতিবেশী, নিজের পরিচিতজনসহ সম্ভাব্য অন্যদের জন্য নতুন জামা-কাপড় ও ভাল খাবারের ব্যবস্থা করে ঈদের আনন্দ সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। সার্বজনীন ঈদে সবাই যেন নতুন কাপড় পরে এবং ভালো খাবার খায়- এ চিন্তার মাধ্যমে পবিত্র রমজানের বাকি এ কয়দিনে সহমর্মিতার শিক্ষা কাজে লাগাতে পারি।
নাড়ির টানে বাড়ি যেতেই হবে। এর কোন বিকল্প নেই। রমজান মাস দানের মাস। যারা শহরে থাকেন, তাদের আর্থিক অবস্থা কতটুকু ভালো একমাত্র তিনিই জানেন। কিন্তু গ্রামের মানুষরা জানে আমাদের ছেলে শহরে চাকরি করে, ব্যবসা করে। গ্রামের গরীব আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীসহ অন্যরা মুখ ফুটে না বললেও মনে মনে আশা করে আমাদের ছেলে শহর থেকে ঈদ করতে আসছে। বোধহয় আমাদের জন্য কিছু আনছে। তাদের অনেক প্রয়োজন। সামাজিকতার অনেক দায়বদ্ধতা থাকে শহুরে বসবাসকারীদের। তারা যখন শহুরে ছেলেটা ঈদ করতে আসে তখন অনেক আবদারও নিয়ে আসে। মোটকথা ঈদে বাড়িতে যাওয়ার সময় যার যতটুকু সামর্থ্য আছে গ্রামের আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীসহ এলাকার জন্য সামাজিকতার দায়বদ্ধতা থেকে কিছু করার, কিছু দেয়ার মানসিকতা নিয়ে প্রস্তুতি নিয়ে যাওয়া। যাতে তারা বলতে পারে আমাদের ছেলে শহরে গিয়েও আমাদের ভুলেনি।
রমজান শেষে ঈদ আসে। রমজানের পুরস্কারের লাভেই রয়েছে সেই আনন্দের সার্থকতা। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে রমজানের উদ্দেশ্য হাসিল করে প্রকৃত আনন্দ লাভের তাওফিক দিন।
লেখক: পেশ ইমাম ও খতীব, বাংলাদেশ রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট জামে মসজিদ, রাজশাহী