ঈদে চালের পরিবর্তে পোকা ধরা নিম্নমানের গম সরবরাহ ।। পুঠিয়ায় গম উত্তোলন করেন নি ছয় চেয়ারম্যান

আপডেট: জুন ২২, ২০১৭, ১:১৩ পূর্বাহ্ণ

পুঠিয়া, দুর্গাপুর ও শিবগঞ্জ প্রতিনিধি


দুর্গাপুরে ভিজিএফ কার্ডধারীদের মাঝে চালের পরিবর্তে গম বিতরণের লক্ষ্যে গুদাম থেকে নিম্ননমানের গম সরবরাহ করার সময় তা হাতেনাতে ধরে ফেলেন নওপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম-সোনার দেশ

আসন্ন ঈদ উল ফিতর উপলক্ষে রাজশাহী অঞ্চলে অতি দরিদ্র পরিবারকে ভিজিএফ চাল সহায়তা প্রদানের কথা থাকলেও নিম্নমানের পোকা ধরা গম দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। একারণে কারণে পুঠিয়া উপজেলার চেয়ারম্যানরা গম উত্তোলন করেন নি। একই অবস্থা দুর্গাপুর উপজেলাতেও। সেখানকার চেয়ারম্যানরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলায় ১০ কেজি চালের পরিবর্তে ১৪ কেজি নিম্নমানের গম সরবরাহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
পুঠিয়া প্রতিনিধি জানান, গতকাল বুধবার উপজেলার ছয় ইউনিয়নের চেয়ারম্যানরা গতকাল বুধবার পর্যন্ত গোডাউন থেকে গম উত্তোলন করেন নি বলে জানা গেছে। উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা অফিস সূত্রে জানা গেছে, সরকারি সিদ্ধান্ত মোতাবেক সারাদেশে ঈদ উল ফিতর উপলক্ষে দুস্থ অতিদরিদ্র পরিবারকে ভিজিএফ চাল সহায়তা প্রদানের পরিবর্তে গম বিতরণের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।
পুঠিয়া উপজেলায় এবার ঈদে ১টি পৌরসভা ও ৬টি ইউনিয়নে মোট একশ ৭০ মেট্রিকটন গম বরাদ্দ করেছে। এর মধ্যে পুঠিয়া পৌরসভায় ৪০.৮৮৭ মেট্রিকটন, পুঠিয়া ইউনিয়নে ১০.২১৯ মেট্রিকটন, বেলপুকুরিয়া ইউনিয়নে ২৫.২১৬ মেট্রিকটন, বানেশ্বর ইউনিয়নে ২৪.২৮৭ মেট্রিকটন, ভালুকগাছী ইউনিয়নে ২৩.১৫৯ মেট্রিক টন, শিলমাড়িয়া ইউনিয়নে ২৫.৪৮২ মেট্রিকটন এবং জিউপাড়া ইউনিয়নে ২০.৩০৬ মেট্রিকটন গম বরাদ্দ হয়েছে। আর দরিদ্র এক একটি পরিবারকে ১০ কেজি চালের পরিবর্তে ১৩ কেজি গম দেওয়া হবে।
পুঠিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আতাহার আলী শাহ্, বেলপুকুরিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বদিউজ্জামান বদি, বানেশ্বর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গাজী সুলতান, ভালুকগাছী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুুল করিম, শিলমাড়িয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাজ্জাদ হোসেন মুকুল এবং জিউপাড়া ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান ছায়েদুর রহমান জামাল বলেন, খাদ্য গুদাম থেকে যে গম সরবরাহ করা হচ্ছে তা নিন্নমানের পোকা ধরা গম। সেই গম নিয়ে এসে জনগণকে দিয়ে আমরা মার খাবো। যার কারণে আমরা গম না নিয়ে চলে এসেছি।
উপজেলা খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা রেজাউল করিম এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মাদ মোফাজ্জল হোসেন জানান, ওনারা চাল বরাদ্দ নেবেন। যার কারণে গম নিম্নমানের ও পোকা ধরার মিথ্যা অভিযোগ করছেন। এগুলো সব মিথ্যা কথা। আসল কথা তাদেরকে চাল দিতে হবে। যে গমগুলো দেয়া হচ্ছে, সেগুলো প্রায় দেড় বছর আগের গম।
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাজমা নাহার জানান, নিয়ম মোতাবেক আগের গম বিতরণের নিয়ম। ইতোমধ্যে পুঠিয়া পৌরসভা ভালো গম নিয়ে গিয়ে বিতরণ করেছে। আমি ইতোমধ্যে পৌরসভায় গিয়ে দেখেছি, সেগুলো ভালো গম। আর যেগুলো খারাপ আছে সেগুলো বাদ রেখে ভালো গম নিয়ে যাক তারা।
দুর্গাপুর প্রতিনিধি জানান, দুর্গাপুরে ভিজিএফ কার্ডধারীদের মাঝে গম বিতরণের উদ্দেশ্যে নিম্নমানের গম সরবরাহের অভিযোগ উঠেছে। এমনিতেই চালের পরিবর্তে গম তারপরেও সেগুলো নিম্নমানের হওয়ায় ইউনিয়ন চেয়ারম্যানরা ওই গম নিতে প্রথমে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। পরবর্তীতে উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসে পুনরায় সেগুলো গ্রহণ করা হয়েছে।
ইউপি চেয়ারম্যানদের অভিযোগ ছিলো, গমগুলো অত্যন্ত নি¤্নমানের। এ ধরনের ধূলা মেশানো ও পোকায় খাওয়া গম বিতরণ করতে গেলে জনগণের তোপের মুখে পড়তে হবে। গতকাল বুধবার দুপুরের দিকে উপজেলা খাদ্য গুদাম থেকে গমগুলো বিভিন্ন ইউনিয়নে পাঠানো হচ্ছিলো ভিজিএফ কার্ডধারী সুবিধাভোগীদের মাঝে বিতরণের জন্য। ট্রাক থেকে গমের বস্তাগুলো নামানোর সময় নিম্নমানের পরিলক্ষিত হওয়ায় তা নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে চেয়ারম্যানরা ট্রাক থেকে গম নামানো বন্ধ করে দেন।
এসময় স্থানীয় সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে গেলে নওপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম গমগুলো হাতে নিয়ে তা সাংবাদিকদের দেখান। এসময়ই ঘটনাস্থলে যান উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা শেখ মো. মোফাজ্জল হোসেন, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা বেলাল হোসাইন ও খাদ্য গুদাম ইনচার্জ বজলুর রহমান। পরবর্তীতে চেয়ারম্যানদের নিয়ে বৈঠকে বসেন উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা। বৈঠকে সমঝোতা হওয়ায় পুনরায় নিম্নমানের ওই গম গ্রহণ করেন ইউপি চেয়ারম্যানরা। আজ বৃহস্পতিবার থেকে সেগুলো বিতরণ করা হবে বলে জানা গেছে।
পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অফিস সূত্রে জানা গেছে, ঈদুল ফিতরের আগেই উপজেলার মোট ১১ হাজার ৪২৭ জন ভিজিএফ কার্ডধারী বা সুবিধাভোগীর মাঝে অনিবার্য কারণবশত চালের পরিবর্তে গম বিতরণ করা হবে। প্রত্যেকবার চাল বিতরণ করা হলেও সরকারি সিদ্ধান্ত মোতাবেক গম বিতরণ করা হবে বলে জানান উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা। এর মধ্যে নওপাড়া ইউনিয়নে এক হাজার ৬৯৬ জন, কিসমত গণকৈড় ইউনিয়নে এক হাজার ৩২৫ জন, পানানগর ইউনিয়নে এক হাজার ১৫১ জন, দেলুয়াবাড়ি ইউনিয়নে এক হাজার ৫৩২ জন, ঝালুকা ইউনিয়নে এক হাজার ৪০৬ জন, মাড়িয়া ইউনিয়নে ৯৫১ জন, জয়নগর ইউনিয়নে এক হাজার ৬৮৭ জন ও পৌরসভায় তিন হাজার ৮৫ জন ভিজিএফ কার্ডধারী বা সুবিধাভোগী রয়েছেন। এর আগে এসব সুবিধাভোগীদের মাঝে চাল বিতরণ করা হলেও এবার সরকারিভাবে গম বিতরণ করার উদ্যোগ নেয়া হয়।
গতকাল দুপুরের দিকে উপজেলা খাদ্য গুদাম থেকে বিভিন্ন ইউনিয়নের সুবিধাভোগীদের মাঝে বিতরণের জন্য গমগুলো ট্রলিতে করে পাঠানো হচ্ছিলো। কিন্তু গমগুলো অত্যন্ত নিম্নমানের হওয়ায় তা নিতে অস্বীকৃতি জানান চেয়ারম্যানরা।
নওপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম জানান, উপজেলা খাদ্যগুদাম থেকে যে গমগুলো সরবরাহ করা হচ্ছে- তা ধুলায় ভরা ও পোকায় খাওয়া। এ ধরনের গম কেবল গবাদি পশুর জন্য প্রযোজ্য, মানুষের জন্য নয়। এ ধরনের গম বিতরণ করতে গেলে সাধারণ মানুষের তোপের মুখে পড়তে হবে। তাই তিনি চাহিদাপত্র (ডিও) বাতিল করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরবর্তীতে ভালো গম সরবরাহ করা হবে উপজেলা প্রশাসনের এমন আশ্বাসে পুনরায় গম গ্রহণ করতে রাজি হয়েছেন।
কিসমত গণকৈড় ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আফসার আলী মোল্লা অভিযোগ করে বলেন, গমগুলো অত্যন্ত নিম্নমানের হওয়ায় পুঠিয়া উপজেলায় বিতরণ করতে না পেরে সেগুলো দুর্গাপুরে পাঠানো হয়েছে। পুঠিয়ার জনপ্রতিনিধিরা যে গম ফেরত পাঠিয়েছেন দুর্গাপুরে সেগুলো কিভাবে গ্রহণ করা হবে। এ ধরনের গম বিতরণ করতে গেলে সাধারণ মানুষের কাছে কি কৈফিয়ত দেব? ভালো গম সরবরাহ না করা হলে এ ধরনের নিম্নমানের গম নিতে অস্বীকৃতি জানান তিনি।
জয়নগর ইউনিয়নের চেয়াম্যান শমসের আলী ও পানানগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আজাহার আলী খানও এসময় উপস্থিত থেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তারা বলেন, এ ধরনের নি¤্নমানের গম বিতরণ করতে গেলে জনগণের তোপের মুখে পড়তে হবে। সুতরাং নি¤্নমানের এ গম নেয়ার প্রশ্নই আসে না। উপজেলা প্রশাসন যদি ভালো মানের গম সরবরাহ করতে পারেন তবেই গম গ্রহণ করা হবে।
গতকাল দুপুরেই ইউনিয়ন চেয়ারম্যানরা এ গমের বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। বৈঠকে ভালো গম সরবরাহ করা হবে এমন আশ্বাস দেয়া হলে পুনরায় গম নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন ইউপি চেয়ারম্যানরা।
ইউপি চেয়ারম্যান শমসের আলী জানান, উপজেলা প্রশাসনের কর্তাদের দুঃখ-দুর্দশা দেখে গম নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছি। তারা অনেক কাকুতি-মিনতি করছিল। তিনি আরো জানান, খারাপ বস্তাগুলো বাদ দিয়ে ভালো বস্তা দেয়া হবে এমন আশ্বাস দেয়া হয়েছে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে।
নি¤্নমানের গমের বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা শেখ মো. মোফাজ্জল হোসেন ব্যস্ত আছেন দাবি করে পরে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু পরবর্তীতে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাকে পাওয়া যায় নি।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আনোয়ার সাদাত জানান, নি¤্নমানের গম সরবরাহের বিষয়টি শুনেছি। এ ব্যাপারে উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তাকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। গম নি¤্নমানের হলে সেগুলো চেয়ারম্যানরা নিতে বাধ্য নন। চেয়ারম্যানদের পছন্দ হলে নিবেন না হলে নিবেন না বলে জানান তিনি।
শিবগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে ৪১ হাজার ২৫৫ পরিবারের মাঝে ভিজিএফ কার্ডের মাধ্যমে ত্রান বিতরণ শুরু হয়েছে। অনিবার্য কারণবশত কার্ড প্রতি ১০ কেজি চালের পরিবর্তে ১৩ কেজি ৭শ ২০ গ্রাম গম দেয়া হবে। তবে খাদ্য গুদাম থেকে নিম্নমানের গম সরবরাহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
শিবগঞ্জ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ বছর ঈদুল ফিতরের জন্য ৪১ হাজার ২৫৫ পরিবারের জন্য ভিজিএফ কার্ডের মাধ্যমে কার্ড প্রতি ১০ কেজি চালের পরিবর্তে অনিবার্য কারণবশত ১৩ কেজি ৭শ ২০ গ্রাম গম দেয়া হবে। বরাদ্দকৃত কার্ড ও গমের মধ্যে শাহাবাজাপুর ইউনিয়নে চার হাজার ৫৪টি কার্ডের জন্য ৫৫ হাজার ৬২০ কেজি গম, দাইপুখুরিয়া ইউনিয়নে তিন হাজার ৪৬টি কার্ডের জন্য ৪১ হাজার ৭৯১ কেজি গম, মোবারকপুর ইউনিয়নে দুই হাজার ৩০৭টি কার্ডের জন্য ৩১ হাজার ৬৪২ কেজি গম, চককীর্তি ইউনিয়নে দুই হাজার ৮২২টি কার্ডের জন্য ৪৮ হাজার ৫৩৮ কেজি গম, কানসাট ইউনিয়নে তিন হাজার ৪৮টি কার্ডের জন্য ৪১ হাজার ৮১৮ কেজি গম, শ্যামপুর ইউনিয়নে তিন হাজার ১১১টি কার্ডের জন্য ৪২ হাজার ৬৮৩ কেজি গম, মনাকষা ইউনিয়নে চার হাজার ৫১টি কার্ডের জন্য ৫৫ হাজার ৫৮০ কেজি গম, দুর্লভপুর ইউনিয়নে চার হাজার ২১৩ কার্ডের জন্য ৫৭ হাজার ৮০২ কেজি গম, উজিরপুর ইউনিয়নে ৭৩৫টি কার্ডের জন্য ১০ হাজার চার কেজি গম, পাঁকা ইউনিয়নে এক হাজার ৬৬২টি কার্ডের জন্য ২২ হাজার ৮০২ কেজি গম, ঘোড়াপািখয় ইউনিয়নে এক হাজার ২৮৮টি কার্ডের জন্য ১৭ হাজার ৬৭১ কেজি গম, ধাইনগর ইউনিয়নে দুই হাজার ৯৮৬টি কার্ডের জন্য ৪০ হাজার ৯৬৮ কেজি গম, নয়ালাভাঙ্গা ইউনিয়নে তিন হাজার ২১২টি কার্ডের জন্য ৪৪ হাজার ৮২ কেজি গম ও ছত্রাজিতপুর ইউনিয়নে এক হাজার ২৫৫টি কার্ডের জন্য ২১ হাজার ৩৬২ কেজি গম বরাদ্দ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিবগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম জানান, ঈদুল ফিতর উপলক্ষে শিবগঞ্জ উপজেলার ৪১ হাজার ২৫৫টি দুস্থ পরিবারকে আজ বৃহস্পতিবার, শুক্রবার ও শনিবার এ তিনদিনে কার্ড প্রতি ১৩ কেজি ৭২০ গ্রাম করে গম বিতরণ করা হবে। যদি সংশ্লিষ্টরা কেউ কোন অনিয়ন করে বা কার্ড আত্মসাত করে তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ