ঈদ অর্থ ফিরে আসা

আপডেট: জুন ২৫, ২০১৭, ১:১০ পূর্বাহ্ণ

মো. আশরাফ আলী


ঈদ অর্থ ফিরে আসা। যেহেতু ঈদ প্রতি বছরই মুসলিম উম্মাহ্র কাছে আনন্দ, উৎসব, সাজ-সজ্জা, পানাহার ইত্যাদি নিয়ে ফিরে আসে সেহেতু ঈদের অর্থ বর্ণনায় বিভিন্ন তফসির ও অভিধান গ্রন্থে বলা হয়েছে – আনন্দ, খুশি, উৎসব, পর্ব, সমারোহ, জাকজমজপূর্ণ অনুষ্ঠান ইত্যাদি।
আল্লাহ্র প্রিয় হাবিব তথা রাসুলুল্লাহ্ (স.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার পরই ঈদের প্রবর্তন হয়। আল্লাহ্র রাসুল (স.) মদিনায় পৌঁছে মদিনাবাসীর মধ্যে শরতের পূর্ণিমায় ‘নওরোজ’ এবং বসন্তের পূর্ণিমায় ‘মহেরজান’ উৎসব পালনের ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করলেন। এ ধরনের উৎসবে তারা নানা আয়োজন, আচার – অনুষ্ঠান, খেলাধুলা এবং আনন্দ মেলা করতো।
রাসুলুল্লাহ্ (স.) মুসলমানদের এ দু’টো উৎসব পালন থেকে বিরত থাকতে বললেন। তিনি বললেন- আল্লাহ্তালা তোমাদেরকে এ ধরনের উৎসবের পরিবর্তে ‘ঈদুল ফেতর’ এবং ‘ঈদুল আযহার’ এর মত পবিত্র দুটি দিবস দান করেছেন। এতে তোমরা পবিত্রতার সাথে পালন কর।
তন্মধ্যে ঈদুল ফেতর হলো এক মাস সিয়াম সাধনার মধ্য দিয়ে নিজেকে পাপমুক্ত এবং হিংসা- বিদ্বেষ ও সমস্ত গ্লানি থেকে অবমুক্ত করে পুত-পবিত্র মনে ঈদুল ফেতর উদ্যাপন করা। ঈদ হলো ফকির- বাদশা, ধনী- গরীব সবাই মনের পঙ্কিলতা দূরীভুত করে এক কাতারে সামিল হওয়া তথা এক শক্তিশালী প্লাটফরম রচনা করা। সময়ের পরিক্রমায় সিয়াম ও ঈদুল ফেতর আমাদের সমাজ সংস্কৃতির বিকাশের ক্ষেত্রে এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে এক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। আজ সমাজের সর্বস্তরে এর চরম গুরুত্ব ও প্রভাব থাকা সত্ত্বেও ‘ভাগ্যবান ও হতভাগ্য’ এবং ‘ব্যক্তি ও পরিবারে’ ঈদে সত্যিকার অর্থে ধর্মীয় মর্যদায় তাৎপর্যপূর্ণ এবং আপন মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠতে পারে নি। বলা বাহুল্য- জাতীয় শক্তিকে পুনরুজ্জীবিত ও শাণিত করার জন্যই হলো ঈদ। কোনো জাতিকে প্রকৃত শক্তিমান হতে হলে ঈদ উৎসবের মত উৎসব পালনের মধ্য দিয়েই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং মহাশক্তিধর জাতিতে পরিণত হতে হবে। যে কোনো ধরনের হিংসা-বিদ্বেষ কোনো জাতিকেই দুর্বল করে না, ব্যক্তিকেও দুর্বল তথা নিঃশেষ করে দেয়। অভিমান ও অহমিকা তথা অহংকার যে ব্যক্তিত্বকে সমাজ থেকে দূরে রাখে সে তার আত্মশক্তিকেই শেষ পর্যন্ত দুর্বল করে ফেলে। ঈদ এমন একটা উৎসব যা সবার অহংকার ও অভিমানকে দূর করে এক মহামিলনের আবেদন নিয়ে আসে। প্রকৃতপক্ষে সমাজকে শক্তিশালী ও কল্যাণকর করা জন্য ঈদ হলো এক জাতির জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার ‘ঈদ মোবারক’ কবিতায় এক অমীয় স্বর্গীয় বাণী তুলে ধরেছেন- আমরা কথায় কথায় যে আর্তমানবতার কথা বলি সে মানবতা কখনোই আসবে না যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা হিংসা-বিদ্বেষ, ঈর্ষা, পরশ্রীকাতরতা এবং অহংকার ও অভিমানের উর্ধ্বে থেকে পরস্পর পরস্পরকে স্বর্গীয় প্রেমের মেলবন্ধনে আবদ্ধ করতে না পারব। যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং সহমর্মিতার হাত না বাড়াব। সঞ্চয়ের মোহ ত্যাগ করে সামাজিক বা জাতীয় অর্থনীতির উন্নতির দিকে মনোযোগ না দেব, নিজে ভোগ করার সময় অপরকে ভোগ করার সুযোগ না দেব, সহযোগিতা না করব ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের মাঝে ঈদের পরিপূর্ণতা ও মাধুর্যতা আসবে না। সত্যিকার অর্থে ঈদ প্রতি বছরই আমাদেরকে এক ধরনের মহামানবতার শিক্ষাই দিয়ে থাকে।
ঈদ উদযাপনের তাৎপর্য বিশ্লেষণ করলে আমাদের কাছে সুস্পষ্টভাবে মনে হবে যে, আল্লাহ্তালার পক্ষ থেকে এ দু’টি দিবসকে এবাদতের জন্য অতিগুরুত্ব এবং তাৎপর্যপূর্ণ দিবস হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। বালেক প্রত্যেক মুসলিম নর এবং নারীর জন্য পবিত্র রমজান মাসে রোযা পালন অপরিহার্য যার পুরস্কার স্বয়ং আল্লাহ তাঁর বান্দাদের হাতে তোলে দিবেন। রমযান সমাপনান্তে পরের দিন ঈদুল ফেতর উদযাপিত হয়। অপরদিকে পবিত্র যিলহজ্ব মাসে পবিত্র হজ্ব সমাপন্তে মহান আল্লাহ্ রাব্বুল ইজ্জতের সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে পশু কোরবানি করা হয়। এখানে মহান আল্লাহ্তালার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন, তাঁর কাছে তাঁর প্রিয় বান্দাদেরকে কবুল করার প্রার্থনা এবং ভুল-ত্রুটির জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার বিষয়টা দুই ঈদেই প্রাধান্য এবং গুরুত্ব পেয়েছে।
তাইতো রাসুল (স.) দুই ঈদের রাত্রে (মুসলমানদেরকে) বেশি করে এবাদত বন্দেগি এবং আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করার মাধ্যমে অতিবাহিত করার জন্য মুসলমানদের বেশি করে উৎসাহিত করেছেন।
এ প্রসঙ্গে হযরত আবু উমামা রা. থেকে বর্ণিত- নবী (স.) বলেন যে, ‘ব্যক্তি দুই ঈদের রাত্রে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি এবং সাওয়াবের লক্ষ্যে এবাদত করলো, তাঁর অন্তর সেদিন মরবে না যেদিন অন্যদের অন্তর মরে যাবে।’ অর্থাৎ আল্লাহ্তালা তার এবাদত কবুল ও ক্ষমা করে তারে অমর করে রাখবেন।
দুই ঈদেরই প্রতিদান প্রাপ্তি আনন্দ এবং খুশির মূহুর্তেই হয়ে থাকে। কাজেই ঈদের আনন্দ ও খুশি অত্যন্ত যৌক্তিক এবং অর্থবহ। এখানে উল্লেখ্য যে, এবাদতের প্রতিদান লাভের আনন্দ ও খুশির বহিঃপ্রকাশ আল্লাহ্র প্রতি কৃতজ্ঞতা ও শুকরিয়া জ্ঞাপনের মাধ্যমেই হতে হবে। কারণ এবাদতের প্রতিদান প্রাপ্তির আনন্দ ও খুশি অনাচারের মাধ্যমে প্রকাশ পেলে তা হবে নিঃসন্দেহে ক্ষতিকর, অযৌক্তিক এবং অন্তরের (কলব) মৃত্যুবরণ।
হযরত আনাস ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন- ‘রাসুলুল্লাহ্ (স.) বলেছেন, ‘যখন ঈদের দিন আসে তখন আল্লাহ্তালা তাঁর বান্দাদের বিষয়ে ফেরেশতাদের সামনে গর্ব করেন। অতঃপর বলেন, হে আমার ফেরেশতারা! যে শ্রমিক তার দায়িত্ব যথাযথ পালন করেছে, তার বিনিময়ে সে কী পেতে পারে ? তারা আরজ করেন, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা চাই তারা যেন যথাযথ মজুরি পায়। আল্লাহ্তালা আরো বলেন- হে আমার ফেরেশতারা! আমার দাস ও দাসি যারা আমার পক্ষ থেকে তাদের উপর আরোপিত অপরিহার্য দায়িত্ব  (রোযা) পালন করেছে, অতঃপর আমার কাছে প্রার্থনা করতে ঈদগাহের দিকে রওয়ানা দিয়েছে, আমার সম্মান, মর্যাদা, দয়া, বড় ও শ্রেষ্ঠত্বের শপথ! অবশ্যই আমি তাদের আবেদন কবুল করবো। আল্লাহ বলেন, তোমারা ফিরে যাও আমি তোমাদের ক্ষমা করে দিয়েছি; তোমাদের পাপরাশিকে নেকিতে পরিণত করেছি। অতঃপর তারা ক্ষমা প্রাপ্ত হয়ে ফিরে আসে। ঈদের নামাজের উদ্দেশ্য কী? ঈদের নামাজের উদ্দেশ্য হলো শাসক-শোষক, জ্ঞানী-মূর্খ, ধনী-গরিব সবাই সর্বপ্রকার ভেদাভেদের উর্ধ্বে থেকে এক কাতারে দাঁড়িয়ে আল্লাহ্র কাছে জাগতিক তথা পার্থিব বৈষম্যের কোন মূল্য নেই। আল্লাহ মহান এবং তিনিই একমাত্র ¯্রষ্ঠা এবং মানুষ তাঁর শ্রেষ্ঠ মাখলুকাত।
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, আজকে ঈদের দিনে ঈদ উৎসবের নামে চলছে বিভিন্ন ধরনের গান-বাজনা, অশ্লীল ছবি, সিনেমা এবং সাংস্কৃতিক আয়োজন। অথচ মুসলিম উম্মাহ্র জন্য আল্লাহ্তালার পক্ষ থেকে জাহিলিয়াতের যুগে পালিত ‘নওরোয’ ও ‘মেহেরজান’ নামক দু’টি জাহিলি ধারায় পালিত উৎসবের পরিবর্তে ‘ঈদুল ফেতর’ ও ‘ঈদুল আযহা’ প্রবর্তন করা হয়েছে। এখানে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান- এই দুই ঈদে জাহিলি ধারায় উৎসব পালনের কোনো সুযোগ নেই। বরং এত্দসংক্রান্ত আল্লাহ্র রাসুল (স.) খুব কড়াভাবেই উল্লেখ করেছেন- ‘শোন, জাহিলিয়াতের সকল কর্মকা- আমার পায়ের নীচে পদদলিত হয়েছে।’
অতএব, কোনো ধর্ম, বর্ণ, গোত্র বা সম্প্রদায়ের অনুসরণ ও অনুকরণ নয়। ঈদ উৎসব পালিত হবে নিজস্ব স্বকীয়তায়, স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদায় এবং ভাবগাম্ভির্যেÑ এটাই মুসলিম উম্মাহর একমাত্র কাম্য। সর্বোপরি আমরা যেন আল্লাহ্ভীতি তথা খোদাভীতি, নীতি-নৈতিকতা, সামাজিক ভারসাম্যতা ও আইন শৃংখলার মাধ্যমে জ্যেষ্ঠদের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালবাসা ও ভক্তি, ছোটদের প্রতি অকৃত্রিম ¯েœহ ও মায়ামমতা এবং এতিম অসহায়দের প্রতি সহমর্মিতা জ্ঞাপনের মাধ্যমে ঈদ উৎসবকে সফল সার্থক ও সমৃদ্ধ করে তুলি যাতে করে সমাজের সকল শ্রেণি বা পেশার মানুষ নির্বিঘেœ ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারে।
ঈদের সকল আনুষ্ঠানিকতা হবে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মাধ্যমে আল্লাহ্কে চূড়ান্ত স্মরণের লক্ষ্যে। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে এ দিনগুলো শুধু পানাহারের দিন নয়। এ দিনগুলো মহামহিম আল্লাহ্র যিকিরের দিন।
কাজেই ঈদের আনন্দ-অপচয়, সীমালঙ্ঘন, অবিচার এবং অনাচারের কোন সুযোগ নেই। পরিশেষে আমরা যেন ঈদের তাৎপযর্, মাধুর্য এবং গুরুত্ব উপলব্ধি করে সমস্ত হিংসা-বিদ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা, অন্যায়-অবিচার, জুলুম, নির্যাতন এবং শোষণমূলক কর্মকা-ের  উর্ধ্বে থেকে দল মত নির্বিশেষে একটা শক্তিশালী ঐক্যের প্লাটফরম রচনার মাধ্যমে একটা শক্তিশালী জাতি হিসেবে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি এই প্রত্যাশাই রইলো।
লেখক : অধ্যক্ষ, মো. আশরাফ আলী আড়ানী ডিগ্রি কলেজ