ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ২০২তম জন্মবার্ষিকী আজ

আপডেট: সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২২, ১২:৩৮ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক:


সংস্কৃত পন্ডিত, লেখক, শিক্ষাবিদ, সমাজসংস্কারক, জনহিতৈষী ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-১৮৯১) এর ২০২তম জন্মবার্ষিকী আজ। তিনি ১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। পাঁচ বছর বয়সে ঈশ্বরচন্দ্রকে গ্রামের পাঠশালায় পাঠানো হয়। ১৮২৮ সালের ডিসেম্বর মাসে তাঁকে কলকাতার একটি পাঠশালায় এবং ১৮২৯ সালের জুন মাসে সংস্কৃত কলেজে ভর্তি করানো হয়। তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রতিভাবান ছাত্র এবং ১৮৩৯ সালের মধ্যেই বিদ্যাসাগর উপাধি লাভ করেন। পরে তিনি দু-বছর ওই কলেজে ব্যাকরণ, সাহিত্য, অলঙ্কার, বেদান্ত, ন্যায়, তর্ক, জ্যোতির্বিজ্ঞান, হিন্দু আইন এবং ইংরেজি বিষয়ে অধ্যয়ন করেন। তাছাড়া প্রতি বছরই তিনি বৃত্তি এবং গ্রন্থ ও আর্থিক পুরস্কার পান।
১৮৪১ সালের ডিসেম্বর মাসে সংস্কৃত কলেজ ত্যাগ করার অল্প পরেই তিনি ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের বাংলা ভাষার প্রধান পন্ডিতের পদ লাভ করেন। ১৮৪৬ সালের এপ্রিল মাসে সংস্কৃত কলেজে সহকারী সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই কলেজের শিক্ষকগণের রক্ষণশীল মনোভাবের কারণে ১৮৪৭ সালের জুলাই মাসে তিনি সংস্কৃত কলেজের কাজে ইস্তফা দেন এবং ১৮৪৯ সালের জানুয়ারি মাসে, ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের হেড রাইটার ও কোষাধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। ১৮৫০ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি সংস্কৃত কলেজের সাহিত্যের অধ্যাপক পদ লাভ করেন এবং পরের মাসে ওই কলেজের অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন।
১৮৫৪ সালে চার্লস উডের শিক্ষা সনদ গৃহীত হওয়ার পর সরকার গ্রামীণ এলাকায় শিক্ষা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেয়। এ উদ্দেশে ১৮৫৫ সালের মে মাসে বিদ্যাসাগরকে সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ পদের অতিরিক্ত সহকারী স্কুল পরিদর্শকের দায়িত্ব দেয়া হয়। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে তিনি নদিয়া, বর্ধমান, হুগলি এবং মেদিনীপুর জেলায় স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। দুবছরের মধ্যে তিনি এ রকমের বিশটি স্কুল স্থাপন করেন। এছাড়া তিনি এসব স্কুলে পড়ানোর জন্যে, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য একটি নর্মাল স্কুল স্থাপন করেন। তিনি নিজ গ্রামে নিজ খরচে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। পরে ১৮৫৭ সালের নভেম্বর থেকে ১৮৫৮ সালের মে মাসের মধ্যে আরও পঁয়ত্রিশটি স্কুল স্থাপন করতে সমর্থ হন।
সংস্কৃত কলেজের সংস্কার ও আধুনিকীকরণ এবং বাংলা ও বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন ছাড়া, শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো পাঠ্যপুস্তক রচনা ও প্রকাশ করা। বর্ণপরিচয় (১৮৫১) প্রকাশের আগ পর্যন্ত প্রথম শিক্ষার্থীদের জন্যে এ রকমের কোনো আদর্শ পাঠ্যপুস্তক ছিল না। তাঁর বর্ণপরিচয়ের মান এতো উন্নত ছিল যে, প্রকাশের পর থেকে অর্ধশতাব্দী পর্যন্ত এই গ্রন্থ বঙ্গদেশের সবার জন্যে পাঠ্য ছিলো। দেড়শো বছর পরেও এখনও এ গ্রন্থ মুদ্রিত হয়। বর্ণপরিচয়ের মতো সমান সাফল্য লাভ করেছিল বোধোদয় (১৮৫১), কথামালা (১৮৫৬), চরিতাবলী (১৮৫৬) এবং জীবনচরিত (১৮৫৯)। সংস্কৃত ব্যাকরণের উপক্রমণিকা ও (১৮৫১) বর্ণপরিচয়ের মতো অভিনব- এর আগে বাংলা ভাষায় কোনো সংস্কৃত ব্যাকরণ ছিল না। চার খ-ে লেখা ব্যাকরণ-কৌমুদীও (১৮৫৩-৬৩) তাঁর ব্যাকরণ রচনার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক অবদান।
তিনি ছিলেন আধুনিক মনোভাবাপন্ন। তিনি উপলব্ধি করেছেন, পুরোনো মূল্যবোধ এবং পরিবারের ভেতর থেকে পরিবর্তন আনতে না পারলে সমাজ এবং দেশের কখনো প্রকৃত উন্নতি হবে না। এ জন্যে তিনি বিধবা-বিবাহ চালু করা, বহুবিবাহ ও বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধ করা এবং স্ত্রীশিক্ষা বিস্তারের জন্যে আন্দোলন আরম্ভ করেছিলেন।
তাঁর সংস্কৃত কলেজ ছাড়ার কয়েক মাস পরে বালবিধবাদের পুনর্বিবাহের পক্ষে তাঁর প্রথম বেনামি লেখা প্রকাশিত হয় ১৮৪২ সালের এপ্রিল মাসে বেঙ্গল স্পেক্টেটর পত্রিকায়। আর এ বিষয়ে তাঁর প্রথম গ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৮৫৫ সালের জানুয়ারি মাসে, দ্বিতীয় গ্রন্থ অক্টোবর মাসে। এভাবে বিধবাবিবাহের পক্ষে শাস্ত্রীয় প্রমাণ দেয়া ছাড়াও, বিধবাদের পুনর্বিবাহ প্রবর্তনের পক্ষে একটি আইন প্রণয়নের জন্যে তিনি সামাজিক আন্দোলন আরম্ভ করেন। এ মাসেরই ৪ তারিখে তিনি এর পক্ষে বহু স্বাক্ষরসংবলিত একটি আবেদনপত্র সরকারের কাছে পাঠান। পরে এরকমের আরও ২৪টি আবেদনপত্র সরকারের কাছে পাঠানো হয়। অনেকগুলি আবেদনপত্র আসে ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চল থেকে। এসব আবেদনপত্রে প্রায় পঁচিশ হাজার স্বাক্ষর ছিল। অপরপক্ষে, রক্ষণশীল সমাজ আইন প্রণয়নের বিরোধিতা করে সরকারের কাছে আঠাশটি আবেদনপত্র পাঠান। তাঁদের যুক্তি ছিল যে, এ রকমের আইন পাস করে দেশবাসীর ধর্মে হস্তক্ষেপ করা সরকারের পক্ষে উচিত হবে না। এতে স্বাক্ষর ছিল পঞ্চান্ন হাজারেরও বেশি। বিরোধীদের পক্ষেই পাল্লা ভারী ছিল, তা সত্ত্বেও ১৮৫৬ সালের জুলাই মাসে বিধবাবিবাহ আইন প্রণীত হয়।
সূত্র: ইউপিডিয়া