উইলিয়ামসনের শহরে, মন খারাপের প্রহরে

আপডেট: জানুয়ারি ৫, ২০১৭, ১২:০৬ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক



মাইলের পর মাইল বিস্তীর্ণ সবুজ; মাঝে মাঝেই পাহাড়-টিলা, কোথাও কোথাও চোখ জুড়ানো পাহাড়ী লেক। মাঝ দিয়ে স্টেট হাইওয়ে-১। সবুজের বুক চিড়ে নেপিয়ার থেকে তাওরাঙ্গার পথ ২৯০ কিলোমিটার। এই পথ ধরেই বাংলাদেশ দল পা রাখল শেষ দুই টি-টোয়েন্টির শহরে।
বাংলাদেশ দলের সিনিয়র ক্রিকেটারদের কয়েকজনের উড়ান ভীতি প্রবল। তাদেরকে স্বস্তি দিয়ে নেপিয়ার থেকে তাওরাঙ্গায় বাসে এসেছে দল। পথে অপরূপ সৌন্দর্যময় লেক তাওপো আর হুকা জলপ্রপাতে কাটিয়েছে সময়। লেক তাওপোর অদ্ভুত সুন্দর নীল জলরাশি মন ভালো করে দেয় মুহূর্তেই। বাংলাদেশের ক্রিকেটাররাও দারুণ উপভোগ করেছেন সময়।
বিকেল ৫টার দিকে দল পৌঁছে তাওরাঙ্গায় নিজেদের আস্তানা ট্রিনিটি হোয়ার্ফ হোটেলে। যথারীতি দারুণ ছিমছাম, গোছানো পর্যটন শহর তাওরাঙ্গা। এখানে এসেই শুরুতে মাশররাফি বিন মুর্তজারা জেনেছেন, এটি কেন উইলিয়ামসনের শহর!
এমনিতেই বাংলাদেশের যথেষ্ট মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন উইলিয়ামসন। শেষ ওয়ানডেতে অপরাজিত ৯৫ রানের পর প্রথম টি-টোয়েন্টিতে অপরাজিত ৭৩ করেন নিউ জিল্যান্ড অধিনায়ক। টানা দুই ম্যাচ ম্যান অব দ্য ম্যাচ। এমন দুর্দান্ত ফর্ম নিয়েই এবার খেলবেন নিজের ঘরের মাঠে।
এই শহরেরই এক ক্রীড়া পরিবারে জন্ম উইলিয়ামসনের। এখানকার আলো-হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। একসময় বয়সভিত্তিক ক্রিকেট খেলেছেন তার বাবা, মা খেলতেন বাস্কেটবল, বোন ভলিবল। বাবার হাত ধরেই ক্রিকেটে হাতেখড়ি, পরে ভালোবাসা জন্মানো। তাওরাঙ্গা বয়েজ কলেজের হয়ে রান আর সেঞ্চুরির ফুলঝুরি ছুটিয়ে কিউই ক্রিকেটে জানিয়েছিলেন নিজের আগমণী বার্তা।
শেষ দুই টি-টোয়েন্টির ভেন্যু মাউন্ট মঙ্গানুইয়ের বে ওভালে দুটি আন্তজাতিক ম্যাচ খেলে দুটিতেই করেছেন অর্ধশতক। এবারও ব্যাটের ঝলকানিতে ঘরের মাঠকে আলোকিত করার অপেক্ষায়।
বাংলাদেশ দল ঘুরপাক খাচ্ছে অন্ধকার সুড়ঙ্গে, খুঁজে বেড়াচ্ছে আলোর রেখা। বেশ কয়েকবার আশা জাগলেও শেষ পর্যন্ত বের হওয়ার পথই মিলছে না! বিবর্ণ মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি যোগ হয়েছে মাঠের বাইরের চাপ। দেশ থেকে এসে যেটি চেপে বসেছে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে। একাদশ নির্বাচন নিয়ে বিসিবি প্রধানের মন্তব্য ভালোই নাড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ দলকে।
শেষ দুই ওয়ানডেতে তানবীর হায়দারকে একাদশে খেলানো নিয়ে চলছিল বেশ বিতর্ক। আঙুল তোলা হচ্ছিলো কোচের দিকে। কিন্তু প্রথম টি-টোয়েন্টির আগের দিন বিসিবি প্রধান নাজমুল হাসান দেশে বসে এমন এক মন্তব্য করলেন, যেটির ঝাপটা এসে লাগল সুদূর নিউজিল্যান্ডে। সংবাদমাধ্যমকে বিসিবি প্রধান জানান, কোচকে অযথাই দোষারোপ করা হচ্ছে। অধিনায়ক মাশরাফি ও সহ-অধিনায়ক সাকিব আল হাসান যা বলেন, সেটাই নাকি হয়। তানবীরকে নেওয়া হয়েছিল নাকি মাশরাফির চাওয়াতেই!
টি-টোয়েন্টি ম্যাচের দিন সকালে এক সিনিয়র ক্রিকেটার সেই ভিডিও ক্লিপিংস প্রথম দেখেন। যেটা দেখে বাজ পড়ে সবার মাথায়ই। একদিন আগে কোচ চন্দিকা হাথুরুসিংহে নিজেই সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন তানবীরকে নিয়ে তার ভালো লাগা ও পরিকল্পনার কথা; জানিয়েছিলেন, এ বছর চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি আর ২০১৯ বিশ্বকাপের ভাবনায় একজন লেগ স্পিনার পাওয়া তাড়নার কথা। তানবীর কার চাওয়ায় দলে, সেটি পরিষ্কার ফুটে ওঠে কোচের কথাতেই। তবে কার চাওয়ায় তানবীর দলে বা বোর্ড প্রধানের মন্তব্য ভুল কি ঠিক, সেটির চেয়েও দলকে বেশি ধাক্কা দিয়েছে বোর্ড প্রধান প্রকাশ্যে এভাবে মন্তব্য করায়। দল নির্বাচন নিয়ে টিম মিটিংয়ে অনেক কিছুই হয়। মিটিং থেকে বের হওয়ার পর দলটা সবারই, মাঠে নামা ১১ জন সবারই প্রতিনিধি। আর সব দলের মত এটি বাংলাদেশ দলেরও বরাবের রীতি। অধিনায়ক যদি নিজের পছন্দে একাদশ নাও পান, ম্যাচ শেষে জবাবদিহিতার দায়িত্ব নিজেই নেন। কিন্তু স্বয়ং বোর্ড প্রধান যেভাবে নাম উল্লেখ করে দায় চাপানোর চেষ্টা করেছেন, সেটি সবার জন্যই এসেছে বিস্ময় হয়ে। পরে সেটি রূপ নিয়েছে চাপা ক্ষোভে।
বিশেষ করে সিনিয়র ক্রিকেটাররা ব্যাপারটিকে সহজভাবে নিতে পারেননি মোটেও। টি-টোয়ন্টি ম্যাচের আগে মাঠের ক্রিকেটের চেয়ে বোর্ড প্রধানের মন্তব্যের ঝড় সামলাতেই বেশি ব্যস্ত থাকতে হয়েছে টিম ম্যানেজমেন্টকে। ম্যাচের কয়েক ঘণ্টা আগে টিম মিটিংয়েও এসব নিয়ে হয়েছে আলোচনা।
এইসব বিতর্ক-আলোচনা নবীন তানবীরের প্রতিও অন্যায়। যেভাবে দোষারোপের খেলা চলছে, তাতে নিজেকে তার মনে হতে পারে অনাহূত। দলের ২২ জন ক্রিকেটারের বিশাল বহরের তরুণ ক্রিকেটারদের সামনেও এসব খুব ভালো উদাহরণ নয়।
এমনিতেই মাঠের পারফরম্যান্স প্রত্যাশা মতো হয়ে উঠছে না, তার পরও এ্ই উটকো ঝামেলা মিলিয়ে সৌন্দর্যের লীলাভূমি নিউজিল্যান্ডেও বাংলাদেশ দলে অসুন্দরের ছাপ। প্রকৃতির মন জুড়িয়ে দেওয়া নির্মল বাতাসেও বাংলাদেশ দলে বইছে অস্বস্তির হাওয়া।
২২ গজে খেলাটা ব্যাট-বলের হলেও ক্রিকেট দারুণ মনস্তাত্ত্বিক খেলা। বাইরের ঘটনাপ্রবাহের প্রভাব মাঠে পড়ে অনেক সময়ই। কখনও কখনও আবার উল্টোও হয়। জেদ থেকে বের হয়ে আসে দারুণ কিছু। প্রথম টি-টোয়েন্টিতে তেমন কিছুর সম্ভাবনাও জাগিয়েছিল দল। শেষ পর্যন্ত আর পেরে ওঠেনি। আবারও সুযোগ হাতছাড়ার আক্ষেপে শেষ হয়েছে ম্যাচ। ম্যাচের পর সংবাদ সম্মেলনও শেষ হয়ে যাওয়ার বেশ পরে, নানা কথার শেষ পর্যায়ে মাশরাফি আনমনেই একবার বলে উঠেছিলেন, “চেষ্টা তো করছি, কিন্তু কিছুতেই যেন কিছু হচ্ছে না…।”
তারপরও বিরুদ্ধ স্রোত ঠেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। নতুন শহর, নতুন ভেন্যু, নতুন ম্যাচ। বাংলাদেশের নতুন কিছুর প্রত্যাশা। কে জানে, হয়ত উইলিয়ামসনের শহরেই শেষ হবে মন খারাপের প্রহর।-বিডিনিউজ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ