উগ্র জাতীয়তাবাদ : অশুভ ছায়ায় ভারত

আপডেট: সেপ্টেম্বর ৭, ২০১৭, ১২:৫৫ পূর্বাহ্ণ

সুখরঞ্জন দাসগুপ্ত


ভারত @৭০। ৭০ বছর আগে ১৯৪৭ সালে ভারত ইউনিয়নের পতাকা নামিয়ে তেরঙ্গা জাতীয় পতাকা ওঠালো, সেদিন সব ভারতীয়রা কি স্বাধীনতার স্বাদ ভোগ করতে পেরেছিল? এক কথায় উত্তর হল না। কারণ যে ভারত ব্রিটিশে শাসন করেছে, সে ভারতকে ভাগ করা হল। পাঞ্জাব ও বাংলা। পাঞ্জাবের পশ্চিম পাকিস্তান এবং পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে ভাগাভাগি হয়ে গেল। আর এদিকে অবিভক্ত বাংলায় পূর্ব অংশ গেল পাকিস্তানের অধীনে। আর বাংলার অপর অংশ পাকিস্তানের সঙ্গে যোগ দিল। ফলে পূর্ব বাংলা থেকে লাখো মানুষ ছিন্নমূল উদাস্তু ¯্রােত এসে পড়লো পশ্চিমবঙ্গের ওপরে।
পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামীরা জিদ ধরলেন, এই স্বাধীনতা তারা চাননি। তারা চেয়েছিলেন ব্রিটিশকে চিরতরে বিদায় করতে। তা করতে গিয়ে তাদের যে দেশছাড়া হতে হবে, তা তারা কল্পনাও করতে পারেন নি। কিন্তু বারবার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় বিধ্বস্ত হয়ে লাখো লাখো মানুষ পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করে। তাঁদের নাম দেয়া হয়েছিল শরণার্থী। কেউ বা বলতেন উদ্বাস্তু। মাসের পর মাস তারা কাটিয়েছেন রেললাইনের ধারে ঝুপড়ি করে। এটা ইতিহাস। এবার দেখা যাক, এই ৭০ বছরের মধ্যে ভারতে রাজত্ব করেছে জাতীয় কংগ্রেস। স্বাধীনতা সংগ্রামে যার নেতৃত্ব ছিলেন জাতির পিতা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, জওহর লাল নেহরু, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, সরোজিনি লাইডুর মতো বিশাল মাপের নেতা-নেত্রীরা।
কংগ্রেস প্রায় ৬ দশক ধরে ভারত নামক দেশটি শাসন করেছে। নেহরুর মন্ত্রই ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা। সঙ্গে উন্নয়ন। স্বাধীনতার পর ভারতে চার জন মুসলিম রাষ্ট্রপতি ছিলেন। এরা সকলেই স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম সারির নেতা ছিলেন। ড. জাকির হোসেন থেকে শুরু করে ড. আবুল কালাম এবং ফকরুদ্দিন আলি আহমেদ, এরা দীর্ঘ সময় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে অধিকাংশ সময় জেল খেটেছেন। এই ৬০ বছরে ভারত বিশ^সভায় শ্রেষ্ঠ আসন নিয়েছিল। নেহরুর মন্ত্র ছিল দুনিয়া থেকে কলোনিমুক্ত করতে হবে। তিনি ঔপেনিবেশিকতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। গোটা বিশে^ শন্তির বার্তা নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন। তাতে সাফল্য পেয়েছিলেন। একটা নির্জোট আন্দোলন তৈরি করেছিলেন, যার বর্তমান সদস্য সংখ্যা বাংলাদেশসহ ১৯৪টি দেশ।
এই সব ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিয়ে ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যে তিনটি স্লোগান নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন, তা হল- অযোধ্যায় রাম মন্দির তৈরি করা, কাশ্মীর থেকে ভারতের সংবিধানের ৩৭০ ধারা প্রত্যাহার করা এবং অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রবর্তন করা। এই তিনটি কার্যকর করতে গিয়ে ভারতকে ৭০ বছর পিছিয়ে দিল। তাঁর কর্মকাণ্ড দেখে মনে হচ্ছে, যদি তিনি আরো দেড় বছর ক্ষমতায় থাকেন, তাহলে ভারতের মধ্যে হবে আরেকটি পাকিস্তান। সম্প্রতি এই মন্তব্য করেছেন কংগ্রেসের মুখপাত্র মনীশ তিওয়ারি এবং অন্যান্য নেতারা। সারা দেশে ধর্ম এবং জাতপাতের নামে বিভক্ত করার জন্য তাঁর দোসর আরএসএস (যাঁরা মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করেছিল)-এর উদ্যোগে হিন্দু-মুসলিমের নামে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। এর পরিণাম যে কী হবে, তা আন্দাজ করে ইতিহাসবিদরা খুবই বিচলিত। যার পরিণামে এখন দেখা যাচ্ছে, সরকারের প্রথম এবং প্রধান কাজ হচ্ছে গোহত্যা নিবারণ। তারা জাতীয়তাবাদকে সুড়শুড়ি দিয়ে দেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদ কায়েম করতে চাইছে। যে মহারাষ্ট্রের আরএসএস’র জন্ম সে রাজ্যে বিজিপি সরকার। সেই সরকার নির্দেশ দিয়েছে, পুলিশ বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ নিয়ে দেখবে, কোন বাড়িতে গোমাংস আছে বা রান্না করা হচ্ছে। তা পাওয়া গেলেই তাদের গ্রেপ্তার করা হবে। মধ্যযুগীয় এই বর্বরতা রক্ষার জন্য বিজিপি বিরোধী শক্তি একাট্টা হওয়ার জন্য সম্প্রতি একটি সম্মেলনও করেছে দিল্লিতে। মোদির পূর্বসূরি অটলবিহারী বাজপেয়ী গান্ধী-নেহরুর দেখানো পথেই চলেছেন। কিন্তু মোদি সরকার এসে প্রথমেই তাদের অস্বীকার করেছেন। গেরুয়া বাহিনী যতদিন দিল্লিতে ক্ষমতায় থাকবে ততদিন ভারতকে কঠিন সমস্যার মধ্যে পড়তে হবে। ইতোমধ্যে একটার পর একটা সমস্যা ভারতকে গ্রাস করেছে। সমাজের সর্বস্তরের মানুষ আজ হা-পিত্যেশ করছেন। কেন জাতপাতকে মোদি অগ্রাধিকার দিচ্ছেন? এই প্রশ্নের জবাব বিজেপির ম্যানেজাররা দিতে পারছেন না।
তাই তাদের মুখোশটা খুলে দিয়েছেন, দু’দুবারের ভারতের উপরাষ্ট্রপতি তথা রাজ্যসভার চেয়ারম্যান হামিদ আনসারি। তিনি তাঁর কর্মজীবনের শেষ দিনে বলেছেন, ভারতবর্ষ নামক দেশটায় সংখ্যালঘুরা, বিশেষ করে মুসলিমরা আর নিরাপদ বোধ করেন না। সেই সঙ্গে তিনি এও বলেছেন, ভারতের মুসলিমদেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। তাঁর এই বিদায়ী ভাষণে রীতিমতো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে সরকার পক্ষ বা বলা ভালো মোদি-বাহিনী। কোনও কোনও ক্ষেত্র থেকে এমনও বলা হয়েছে, মুসলিমদের জন্য নিরাপদ মনে না হলে স্বচ্ছন্দে পাকিস্তান চলে যেতে পারেন সদ্য প্রাক্তন হওয়া উপরাষ্ট্রপতি। আনসারির এই মন্তব্য নতুন কিছু নয়। মোদি সরকারের গোমাংস নিয়ে বাড়াবাড়ি এবং দেশজুড়ে গোরক্ষকদের তাণ্ডবের সময়ও হামিদ আনসারি মোদি সরকারের তীব্র নিন্দা করেছিলেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, সে কারণেই আনসারির ওপর আরো বেশি ক্ষুব্ধ হয়েছে বিজেপি এবং আরএসএস। হামিদ আনসারিকে আক্রমণ এবং গবাদি পশু হত্যা সংক্রান্ত যে বিধি মোদি সরকার লাগু- করেছে, তার তীব্র সমালোচনা শুরু হয়, ৭১তম স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালেই। রাজনীতিক এবং সমাজবিদরা বলেছেন, হত্যার উদ্দেশ্যে গবাদি পশু কেনাবেচা করা যাবে না ধরনের সরকারি নির্দেশ সমাজে আরো বিভেদ তৈরি করবে। এই ধরনের একতরফা নির্দেশের ফলে দুই বা ততোধিক সম্প্রদায়ের মধ্যে হিংসাত্মক ঘটনা ঘটে যাওয়াও বিচিত্র কিছু নয়। তেমন কিছু ঘটলে বিশ^সমাজের কাছে ভারতের মুখে আরো চুলকালি পড়বে।
দক্ষ কূটনীতিবিদ হামিদ আনসারি কি অবসর নেবেন? নাকি আবার প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে আসবেন, তা নিয়ে জল্পনা চলছে। অনেকে মনে করেন, তাঁর মতো দক্ষ প্রশাসক এবং সুপণ্ডিত কংগ্রেসে যোগ দিলে দেশের মঙ্গল হবে। তাই অ-বিজেপি মহলে দাবি উঠেছে, দেশের এই দুঃসময়, তিনি মাঠে-ময়দানে নামুন, মোাদি প্রশাসনের স্বরূপ উদঘাটন করুন। ভারতের অখণ্ডতা বজায় রাখার জন্যও তাঁর সক্রিয় রাজনীতিতে আসা জরুরি বলে মনে করছেন অনেকে।
রাজনীতিকরা মোদিকে পাকিস্তানের আয়ুব খাঁন ও ইয়াহিয়ার সঙ্গে তুলনা করে বলছেন, পাকিস্তানের অত্যাচার থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। তাই দেশের রাজনৈতিক মহল এই দুঃসময় তার মতো একজন নেতাকে কালবিলম্ব না করে রাস্তায় নেমে মোদির মোকাবিলা করার জন্য আহ্বান করছেন। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং কম কথার মানুষ। তিনি এক লাইনে বলেছেন সাড়ে তিন বছরে মোদি অভ্যন্তরীণ ও বিদেশ নীতিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। বিশে^র কথা ছেড়ে দিলেও সার্ক সদস্যভুক্ত সাতটি দেশের মধ্যে মোদির এখন কোনও বন্ধু নেই। একমাত্র বাংলাদেশের সঙ্গে তিনি সুসম্পর্ক রেখে চলেছেন।
তাই ৭০ বছর পর আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে ১০০ বছর আগে এই আগস্ট মাসেই রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, জাতীয়তাবাদ ভালো, কিন্তু উগ্র জাতীয়তাবাদ দেশকে ধ্বংসের মুখে এগিয়ে নিয়ে যাবে। কবি যে কত দূরদর্শী ছিলেন, তা ভারতীয়রা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। এই ৭০ বছর ধরে তারা যে উন্নয়নের জোয়ার ডেকেছিল তা আজ স্তব্ধ।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলকাতা