উত্তরবঙ্গে বঙ্গবন্ধু

আপডেট: আগস্ট ১৪, ২০২০, ১২:০৪ পূর্বাহ্ণ

আনারুল হক আনা


বঙ্গবন্ধুর রাজশাহী সফর: ১৯৬৬
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
বিপুল শ্রোতৃমণ্ডলীকে উদ্দেশ (উদ্দেশ্য) করিয়া শেখ মুজিবর রহমান বলেন, ছয় দফা কোন দল বিশেষের কর্মসূচী কিংবা ভোটলাভের কৌশল নয়। পাকিস্তানের জনগণের যে দঃখ-দুর্দশা পুঞ্জীভূত হইয়া উঠিয়াছে, ইহা তাহারই বহিঃপ্রকাশ। বিগত ১৮ বৎসর যাবত এদেশের জনগণ যে দুর্দশা ভোগ করিতেছে-ছয়দফার মাধ্যমে তাহাই ব্যক্ত হইতেছে। ইহা নিছক ভাবাবেগ নয়, ইহা রূঢ় বাস্তবেরই প্রতিধ্বনি এবং আমাদের জীবন মরণের প্রশ্ন। আমাদের অস্তিত্ব বজায় থাকিবে, না আমরা নিশ্চিহ্ন হইয়া যাইব, ছয়দফার সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা হইতে তাহা বুঝা যাইবে। সুতরাং এই প্রশ্নে কোন বিচ্যুতি বা আপোষ চলিতে পারে না।
ছয়দফা কর্মসূচীর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ছয়দফা রাজনৈতিক দিগন্তে ভাসমান সাম্রাজ্যবাদের ক্রীড়নকদের উচ্ছেদ ঘটাইয়া জনগণের শাসন কায়েম করিবে। এই কর্মসূচীতে অর্থনৈতিক শোষণ অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদের কবল হইতে মুক্তির কথা বলা হইয়াছে। শেখ মুজিব বলেন, অত্যন্ত বিপদের কথা এই যে, কোন কোন প্রগতিশীল মহল সাম্রাজ্যবাদের নিন্দার দোহাই দিয়া সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের পথই অবরুদ্ধ করিতেছে। তাহারা সময় থাকিতে আর একবার চিন্তা করিয়া নিজেদের কর্মপদ্ধতি পরিবর্তন না করিলে জনসাধারণের নিকট তাহাদের ভূমিকা বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করা হইবে। কোন বিশেষ মতবাদের জন্য জনগণের ভাগ্য লইয়া ছিনিমিনি খেলার ফল ভাল হইবে না বলিয়া তিনি সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন।
তিনি বলেন, আমরা জনগণের পূজারী, তাঁহারাই আমাদের প্রভু। সুতরাং কোন বিশেষ মতবাদের পরিবর্তে তাঁহাদের স্বার্থই আমাদের তুলিয়া ধরিতে হইবে।
শেখ মুজিবর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের বিচিত্র সমস্যাসমূহের কথা বিস্তারিতভাবে আলোচনা প্রসঙ্গে বর্তমান অনাবৃষ্টির সময়ে জলসেচের ব্যবস্থার অভাব, লোভীর দৌরাত্ব্যে একটাকা সের চাউল, মহামারীর তাণ্ডবলীলার কথা উল্লেখ করিয়া প্রশ্নের সুরে বলেন যে, এই পরিস্থিতির জন্য জবাবদিহি করিবে কে?
তিনি জনগণকে তাহাদের দুঃখ-দুর্দশার কথা উপলব্ধি করিয়া শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে আপোষহীন সংগ্রাম চালাইয়া যাওয়ার জন্য আহ্বান জানান। জনগণের বিশ্বাসহন্তাদের সম্পর্কে হুঁশিয়ার থাকার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানাইয়া তিনি বলেন, জনগণের ঐক্যই আমার কাম্য এবং এই ঐক্যই সাফল্যের একমাত্র চাবিকাঠি।
শেখ মুজিবর রহমানের সহিত সফররত জনাব তাজউদ্দীন আহমদ, খোন্দকার মোশতাক আহমদ, জনাব মুজিবর রহমান চৌধুরী, আবদুল মোমেন, শাহ মোয়াজ্জম হোসেন, ওবায়দুর রহমান ও নুরুল ইসলাম চৌধুরী পাবনায় রহিয়া গিয়াছেন।
ইতিপুর্বে পাবনা হইতে রাজশাহী গমনের পথে নাটোরে নেতবৃন্দকে বিপুলভাবে সম্বর্ধনা জ্ঞাপন করা হয়। পথের উপর মনোরমভাবে সজ্জিত তোরণে দণ্ডায়মান উৎসুক জনতা নেতৃবৃন্দকে দেখিবার জন্য অপেক্ষা করিতে থাকে। শ্রমিকদের পক্ষ হইতে শেখ মুজিবর রহমানকে প্রদত্ত একটি মানপত্রের ছয়দফা বাস্তবায়নের মৃত্যুপণ সংগ্রামের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
মানপত্রের জবাবে প্রাদেশিক আওয়ামী লীগ সভাপতি শ্রমিকদের প্রতি ত্যাগস্বীকারের আহ্বান জানাইয়া বলেন যে, এই ত্যাগই তাঁহাদিগকে সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাইয়া দিবে।
লেখক :শিক্ষা শ্রমিক, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন