উত্তরবঙ্গে বঙ্গবন্ধু

আপডেট: আগস্ট ১৩, ২০২০, ১২:০৮ পূর্বাহ্ণ

আনারুল হক আনা


বঙ্গবন্ধুর রাজশাহী সফর: ১৯৬৬
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
শেখ মুজিবর রহমান বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত তার পাবনা সভার বক্তৃতার কথা উল্লেখ করিয়া রাজশাহীর জনসমাবেশে বলেন যে, কেন্দ্রীয় রাজধানী পূর্ব পাকিস্তানে স্থানান্তরিত করিলে তিনি ৬ দফা প্রত্যাহার করিবেন বলিয়া যে সংবাদ প্রকাশিত হইয়াছে, তাহা সঠিক নয়। তিনি বলেন যে, ৬ দফার যাথার্থ্য (যথার্থ) প্রমাণ প্রসঙ্গে যুক্তি প্রদর্শন করিতে গিয়া আমি সেদিন বলিয়াছিলাম যে, পশ্চিম পাকিস্তান, পাকিস্তানের সাবেক রাজধানী করাচী, অন্তবর্তীকালীন রাজধানী রাওয়ালপিণ্ডি এবং নির্মীয়মাণ রাজধানী ইসলামাবাদ, পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর তিনটি সদর দফতর এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানসমূহের সবকয়টি সদর দফতরের সুযোগ-সুবিধা লাভ করিয়াছে। এইসব সুযোগ-সুবিধা যদি গত ১৮ বৎসর ধরিয়া পূর্ব পাকিস্তান ভোগ করিত তবে পশ্চিম পাকিস্তানের ভাইয়েরা ৬-দফার চাইতেও গুরুতর দফা লইয়া সংগ্রাম শুরু করিতেন।
শেখ মুজিব বলেন যে, কোন কিছুর বিনিময়ে ৬ দফা প্রত্যাহার করার প্রশ্ন উঠে না। কারণ ৬-দফা কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। ৬-দফা আওয়ামী লীগ কাউন্সিলের অনুমোদন লাভ করিয়াছে, দেশবাসীও ৬-দফাকেই তাদের মুক্তি সনদ বলিয়া আদৃত করিয়াছে ও স্বীকৃতি দিয়াছে। ৬-দফা আজ দেশবাসীর আশা-আকাংক্ষার প্রতীক। দেশবাসীর আশা-আকাংক্ষাকে যেকোন ত্যাগের বিনিময়ে বাস্তবায়িত করাই আওয়ামী লীগের দায়িত্ব ও কর্তব্য। ৬-দফা বিনিময়যোগ্য বস্তু নয়। ৬-দফা আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন।
শেখ মুজিবর রহমান আরও বলেন যে, ৬-দফা কর্মসূচী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ স্বরূপ। ইহারই মাধ্যমে জনগণের সার্বভৌমত্ব এবং সর্বপ্রকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে জনগণের বিরামহীন সংগ্রামের দৃঢ়সংকল্পের কথা ব্যক্ত হইয়াছে।
শেখ মুজিব বলেন, ৬-দফা জাতির ভাগ্য নির্ধারণে জনগণের সর্বময় কর্তৃত্বের স্বীকৃতি দিয়া কায়েমী স্বার্থের চির অবসান এবং সাধারণ মানুষের মুক্তির প্রতিশ্রুতি বহন করিতেছে। শেখ মুজিব ও তাঁহার সহকর্মিগণ (সহকর্মীগণ) দিনাজপুর হইতে সরাসরিভাবে এখানে আগমনের পরই ঈদগাহ ময়দানের জনসভায় উপস্থিত হন। তাঁহাদের বর্তমান উত্তরবঙ্গ সফরের প্রথম পর্যায়ের ইহাই ছিল সর্বশেষ জনসভা।
কায়েদে মিল্লাতের নির্বাচনী সভার পর এইরূপ বৃহৎজনসভা রাজশাহীতে আর অনুষ্ঠিত হয় নাই। রাজশাহীর সকল শ্রেণীর মানুষ ৬-দফা কর্মসূচীর ব্যাখ্যা শ্রবণের জন্য এই বৃহৎ জনসভায় শরীক হইয়া ৬-দফার প্রতি তাঁহাদের অকুণ্ঠ সমর্থন জ্ঞাপন করেন।
৬-দফা কর্মসূচীর উদ্যোক্তাদের অন্তরঢালা অভিনন্দন ও স্বাগত জানাইবার উদ্দেশ্যে বিরাট জনতা ও তরুণ দল প্রখর রৌদ্রের মধ্যে বেলা ১২ টা হইতে বৈকাল (এখানে সংবাদ প্রতিবেদনের ২নং পাতা শেষ ও ৩নং পাতা শুরু। এ দুটি পাতার শেষ ও শুরুর মাঝে অসামঞ্জস্য মনে হয়) নেতৃবৃন্দের রাজশাহী পৌঁছিতে পাঁচঘন্টা বিলম্ব হইলেও তাহাদের উৎসাহ বিন্দুমাত্র স্তিমিত হয় নাই। তাঁহাদের মোটরগাড়ী মিউনিসিপ্যাল হলের নিকটে পৌঁছিলে তরুণদল ও হর্ষোৎফুল্ল জনতা মুহুর্মুহু জিন্দাবাদ ধ্বনিসহকারে তাঁহাদিগকে এরূপ বিপুলভাবে মাল্যভূষিত করে যে, ফুলের মালা রাখার জন্য মোটর গাড়ীগুলিতে স্থান সংকুলানও কষ্টকর হইয়া উঠে।
বেলা পড়ার সাথে সাথে দলে দলে লোক সভাস্থলের দিকে যাইতে আরম্ভ করে এবং অতি অল্প সময়ের মধ্যেই ময়দান ভর্তি হইয়া যায়। শেখ মুজিবর বক্তৃতামঞ্চে উপস্থিত হইলে উল্লসিত জনতা হর্ষধ্বনি ও পটকা ফুটাইয়া তাঁহাকে অভিনন্দিত করে। (চলবে)
লেখক :শিক্ষা শ্রমিক, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন