উত্তরবঙ্গে বঙ্গবন্ধু

আপডেট: আগস্ট ৫, ২০২০, ১২:১২ পূর্বাহ্ণ

আনারুল হক আনা:


বঙ্গবন্ধুর রাজশাহী সফর : ১৯৫২
[জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতিকে অধিকার আদায়ের গণতান্ত্রিক লড়াইয়ে সুসংগঠিত করার উদ্দেশ্যে ছুটেছেন বাংলার জনপদ থেকে জনপদে। তাঁর সফরগুলো ইতিহাসের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেগুলো সুসংবদ্ধভাবে সমন্বিত শিরোনাম না হওয়ায় অন্বেষণ করা দুঃসাধ্য। সম্প্রতি আনারুল হক আনার অনুসন্ধান অভিযানে এ বিষয়ে কিছু তথ্য উঠে এসেছে। যার ফসল ‘উত্তরবঙ্গে বঙ্গবন্ধু’ গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি। সেখান থেকে ধারাবাহিক বর্ণনায় বঙ্গবন্ধুর উত্তরবঙ্গ সফরের কয়েকটি সফরের সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করা হলো:]

রাজশাহীর ভূমি বঙ্গবন্ধুর বিচরণ ক্ষেত্র হয়েছে কয়েক বার। রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দিও ছিলেন। এ পর্যন্ত অনুসন্ধানে লোকবর্ণনা, সমকালের পত্রিকা, স্মৃতিময় গ্রন্থ নিশ্চিত তথ্য দিচ্ছে, বঙ্গবন্ধুর স্বেচ্ছায় রাজশাহী সফর সাত বার। কারাগার যোগে আট।
এছাড়াও অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থে ১৯৫২ ও ১৯৫৩ এবং সিরাজ উদ্দীন আহমেদ রচিত ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ গ্রন্থে ১৯৬২ সালেও বঙ্গবন্ধুর রাজশাহী আগমনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে তা স্পষ্ট নয়।
অসমাপ্ত আত্মজীবনী তথ্য দিচ্ছে, বঙ্গবন্ধু ১৯৫২ সালের উত্তবঙ্গ সফর করেন। এ সফর হতে পারে জুন/জুলাইয়ে। বঙ্গবন্ধু ১৯৪৯ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অন্তরীণ হন ও ফরিদপুর জেল থেকে মুক্তি পান ১৯৫২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি (কারাগারের রোজনামচা গ্রন্থে উল্লেখ আছে এ কারা অন্তরীণকাল ১৪ অক্টোবর ১৯৪৯ থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২)। ফরিদপুর জেল থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি মার্চ মাস পর্যন্ত নিজ বাড়ি গোপালঞ্জে থাকার পর ঢাকায় এসে সাংগঠনিক কাজ শুরু করেন। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক তখন জেলে। এ অবস্থায় যুগ্ম সম্পাদক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পার্টির ওয়ার্কিং কমিটির সভা ডাকেন। মাত্র বারো-তেরো জন সদস্যের উপস্থিতিতে এ সভা বঙ্গবন্ধুকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেন। এরপর পার্টির সিদ্ধান্তেই মে মাসে করাচি গিয়ে তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা করেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনের কার্যালয়ে গিয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। খাজা নাজিমুদ্দীনের সঙ্গে আলোচনায় পূর্ব পাকিস্তানে কারাবন্দি নেতাদের মুক্তি ও ভাষা আন্দোলনে ছাত্র হত্যার বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানান। আওয়ামী লীগকে বিরোধী দল হিসেবে খাজা নাজিমুদ্দীনের স্বীকৃতিও আদায় করেন। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ফিরে এসে বঙ্গবন্ধুকে সাংগঠনিক কাজে আরো বেশি তৎপর হয়ে উঠতে দেখা যায়। তিনি জেলায় জেলায় কমিটি গঠনের কাজে দেশব্যাপি সফরের কর্মসূচি প্রস্তুত করেন। আতাউর রহমানকে নিয়ে তিনি উত্তরবঙ্গ সফরে আসেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থে বিভিন্ন জেলায় উপস্থিতি, সভা অনুষ্ঠান ও কমিটি গঠনের কথা বলা আছে। রাজশাহীতে কমিটি গঠন করতে না পারার কথা উল্লেখ আছে। রাজশাহীতে উপস্থিত হয়েছিলেন কি না তার স্পষ্টতা নেই। বঙ্গবন্ধুর নিজের ভাষায়, “আতাউর রহমান সাহেব ও আমি পাবনা, বগুড়া, রংপুর ও দিনাজপুরে প্রোগ্রাম করলাম। নাটোর ও নওগাঁয় কমিটি করতে পেরেছিলাম, কিন্তু রাজশাহীতে তখনও কিছু করতে পারি নাই। দিনাজপুরে সভা করলাম, সেদিন বৃষ্টি ছিল। তাই লোক বেশি হয় নাই। রাতে এক কর্মীসভা করে রহিমুদ্দিন সাহেবের নেতৃত্বে একটা জেলা কমিটি করলাম। এইভাবে বিভিন্ন জেলায় কমিটি করতে পারলাম। কিন্তু রাজশাহীতে পারলাম না। পাবনায়ও কেউ এগিয়ে আসল না। থাকার জায়গা পাওয়া কষ্টকর ছিল। পরে ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও আবদুর রব ওরফে বগাকে দিয়ে একটা কমিটি করলাম। অন্য কোনো লোক পাওয়া গেল না বলে, কয়েকজন ছাত্রের নাম দিয়ে দিলাম। পাবনায় ছাত্রলীগের কর্মীরা দুই ঘণ্টার নোটিশে এক সভা ডাকল টাউন হল মাঠে। মাইক্রোফোন ছিল না। আমি ও আতাউর রহমান সাহেব মাইক্রোফোন ছাড়াই সভা করলাম। এইভাবে উত্তরবঙ্গ সেরে আবার দক্ষিণবঙ্গে রওনা করলাম।” (চলবে)
লেখক : শিক্ষা শ্রমিক, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন