উত্তাল ১৯৭০ এ জননেতা কামারুজ্জামান এর ঐতিহাসিক বক্তৃতামালা-

আপডেট: নভেম্বর ৩, ২০২২, ১২:৩৭ পূর্বাহ্ণ

আহমদ সফি উদ্দিন:


বাঙালির প্রতি বৈষম্য অবসানে জনমত গঠন ও রাজনৈতিক সচেতনতা সৃষ্টিতে রাজশাহীতে সংবাদপত্র দরকার তা উপলব্ধি করেছিলেন জননেতা এএইচএম কামারুজ্জামান। তাঁর জনপ্রিয় ডাকনাম ‘হেনাভাই’। ১৯৭০-এ সারা দেশের জনসভার মাঠে ও রাজপথে উত্তাল ছাত্রজনতার ঢল নেমেছে। জাতিকে নতুন স্বপ্ন দেখাতে স্বাধীনতার চেতনা জাগাতে রাজশাহী থেকে প্রকাশিত হলো সাপ্তাহিক সোনার দেশ। প্রকাশক তাঁর সহধর্মিনী জাহানারা জামান। প্রকাশনার দিন ছিল শুক্রবার। প্রথম পাতায় বড় হরফে সোনার দেশ লোগোর নীচে লেখা হতো ‘গণতান্ত্রিক জীবনবোধের মূল্যায়ন সাধনায় নিয়োজিত প্রগতিশীল সাপ্তাহিক।’ রাজশাহীর সংবাদপত্র প্রকাশনার ইতিহাসে সোনার তারিখ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে, শুক্রবার ৪ঠা আষাঢ় ১৩৭৭, ১৯শে জুন ১৯৭০। এইদিন এএইচএম কামারুজ্জামানের স্বপ্নের ফসল সাপ্তাহিক সোনার দেশ এর প্রকাশনা শুরু।
ছয়মাস পর ১৯৭০ এর ১০ ডিসেম্বর এলো জাতীয় পরিষদ নির্বাচন। এবং ১৭ ডিসেম্বরে হলো প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন। এরপর বিজয়ী দল আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা। শুরু হলো অসহযোগ আন্দোলন। ভয়াল রাত হয়ে এলো ২৫ শে মার্চ ১৯৭১ বৃহস্পতিবার। কাগজ ছাপা হচ্ছিল পরের দিন শুক্রবার বিলি হবে বলে। তখন মধ্যরাতে পাকিস্তানি ঘাতকদের গোপন অভিযানে হত্যার জন্য ধরপাকড় শুরু হয়েছে। পাঠকের কাছে ২৬ মার্চ শুক্রবারের সেই ছাপানো কাগজ আর পৌঁছানো যায়নি। ছাপাখানার কর্মীরা পুড়িয়ে ফেলেছিল। সিসার অক্ষরে সাজানো ডামি আর প্রেস তছনছ করে যায় আর্মিরা। জব্দ করে অফিসের সকল নথি কাগজপত্র। প্রকাশের নয় মাস পর বন্ধ হয়ে গেল সোনার দেশ। কিন্তু শুরু হয়ে গেল ‘সোনার দেশ’ অর্জনের যুদ্ধ।
যেভাবে শুরু হলো
সোনার দেশ নামটিই তখন রক্তে জাগিয়েছিল শিহরণ। পাকিস্তান সৃষ্টির সময় বৃটিশ আমলের বেঙ্গল প্রভিন্স (বাংলা প্রদেশ) ১৯৪৭ এ দুই ভাগ হয়। আমাদের অংশের নামকরণ হয় ‘ইস্ট বেঙ্গল’ (পূর্ববঙ্গ বা পূর্ববাংলা)। নয় বছর পর নতুন নামকরণ ‘ইস্ট পাকিস্তান’ বা ‘পূর্ব পাকিস্তান’ করা হলেও রাজনীতি সচেতন বাঙালি সমাজ পূর্ব বাংলা, বঙ্গ বা বাংলা নামকে আপন মনে করতো। পশ্চিমের শাসক সম্প্রদায়ের সাথে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দূরত্ব যতই বাড়ছিল বাঙালি চেতনা ততই শানিত হচ্ছিল। কবিতায়, গানে, সাহিত্যে, নাটকে, সিনেমায়, সংবাদপত্রে, রাজনৈতিক বক্তৃতায় তার প্রতিফলন দিনে দিনে বাড়তে থাকে। ১৯৭০ এ ‘সোনার দেশ’ নামটি তাই পাঠকের হৃদয় জয় করে। তখন পুরনো বাংলা সংবাদপত্রের নাম ছিল আজাদ, ইত্তেফাক, পয়গাম, মিল্লাত এইসব।
কামারুজ্জামানের বাল্যবন্ধু ছিলেন শাহ মোসলেম উদ্দিন। শহরে তিনি ‘মোসলেম শাহ’ নামে পরিচিত। একসময় আওযামী লীগের ট্রেজারার ছিলেন। রানীবাজার মোড়ে তাঁর বিশাল দোতলা বাড়িটির নিচতলা ব্যবহার হতো তাঁর রড সিমেন্ট ও ফুড ব্যবসার গোডাউন হিসেবে। দোতলায় বড় বড় বেশ কয়েকটি হলঘর। দক্ষিণের হলঘর আওয়ামী লীগের অলিখিত অফিস। ভবনের নিচতলায় বসানো হলো পুরোনা একটি ছাপার মেশিন। মোসলেম শাহর কিনে দেওয়া। বিশালদেহি মেশিনম্যানকে হাতলের চাকা ঘুরিয়ে ছাপাতে হতো কাগজ। সিসার টাইপে হলো কম্পোজের আয়োজন। শুরুতে বড় টাইপ ছিলনা। পরে ঢাকা থেকে আনা হলো হেডিং এর জন্য টাইপ। দোতলায় কয়েকটি ছোট কাঠের টেবিল বসিয়ে সম্পাদনা ও সাংবাদিকদের বসার ব্যবস্থা।
সোনার দেশকে ঘিরে রাজশাহীর বুদ্ধিজীবী ও প্রগতিশীল তরুণরা সংঘবদ্ধ হয়ে কলমযুদ্ধে অংশ নেন। রাজনৈতিক ভাষ্য ও কলামগুলি থাকতো ছদ্মনামে। কলামগুলির নাম ছিল ‘জনতার মুখ’, ‘দেশ দেশান্তরে’। চিঠিপত্র কলামের নাম ‘মতামত’। আট পৃষ্ঠার সোনার দেশে নিউজ ছাড়াও বের হতো বিভাগীয় পাতা। ‘সোনামনির আসর’, ‘মহিলা মহল’, ‘সাহিত্য’, ‘সংস্কৃতি]- এসব। নিউজ ও বিভিন্ন পাতায় যাঁরা লিখতেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন, রাজশাহী মহিলা কলেজের বাংলার অধ্যাপক আবদুল হাফিজ, গীতিকার রফিকুজ্জামান, ডক্টর জাহানারা বেগম (পরে ঢাবি অধ্যাপক), ভাষা সংগ্রামী এম আবদুল লতিফ, ভাষা সংগ্রামী মুহম্মদ আবুল হোসেন, আবু সাইয়িদ, অধ্যাপক মুহম্মদ আবদুল খালেক, অধ্যাপক জুলফিকার মতিন, প্রশান্ত কুমার দত্ত, সিকানদার আবু জাফর, খা মু সাইফুল ইসলাম, এজাজ উল হক, কাজী আব্দুল মালেক, শহিদুল ইসলাম, হাসিবুল ইসলাম, কৌশিক আহমেদ, মুস্তাফিজুর রহমান, শামসুল আলম সরদার, আবুল হোসেন আলেকী (মালেক), লুৎফর রহমান খোকন, ইয়াসমিন রহমান, সাহাব উদ্দিন আহমদ, সুজা উদ্দিন আহমদ, আনওয়ারা মঞ্জুর, ইমদাদুল ইসলাম, শা ম বখতিয়ার, মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান, আহমদ সফি উদ্দিন (লেখক) প্রমুখ। বিশ্ববিদ্যালয়ে সবে আমি ভর্তি হয়েছি। আমাকে প্রথমে স্টাফ রিপোর্টার ও এক মাস পরেই চিফ রিপোর্টারের দায়িত্ব দেয়া হলো।
দূরদৃষ্টিসম্পন্ন কামারুজ্জামান জানতেন সংবাদপত্রে পেশাদারিত্ব না থাকলে পাঠকপ্রিয় হবেনা। তাই তাঁর খবর নিজ কাগজে ছাপা হতো ভেতরের পাতায়। তাও একটির বেশি নয়। তবে ইলেকশনের আগে পরে গুরুত্ব অনুযায়ী প্রথম পাতায় আসতেন তিনি। পাকিস্তানের রাজনীতিতে তিনি তখন অতি উচ্চ পর্যায়ের নেতা। নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। ইলেকশনের আগে পরে তাঁর বক্তৃতায় আওয়ামী লীগের চিন্তাভাবনা প্রতিফলিত হতো বিধায় ঢাকা, করাচি ও রাওয়ালপিন্ডির সংবাদপত্র গুরুত্ব দিয়ে ছাপাতো। সোনার দেশে প্রকাশিত তাঁর বক্তব্য ও সাক্ষাৎকারের কয়েকটি রিপোর্ট এখানে সংকলিত করা হয়েছে। ভবিষ্যতের গবেষকদের জন্য যা হতে পারে মূল্যবান রেফারেন্স।
সোনার দেশে প্রকাশিত কামারুজ্জামানের কয়েকটি জনসভার রিপোর্ট ছিল এরকম-


‘বাংলাকে শোষণ মুক্ত করাই আওয়ামী লীগের উদ্দেশ্য’
কামারুজ্জামান
[ষ্টাফ রিপোর্টার]
বাঙালী আর বাংলার মাটি যতদিন শোষনমুক্ত না হবে আওয়ামী লীগ ততদিন সংগ্রাম করে যাবে।
গত শুক্রবার রাজশাহী শহর আওয়ামী লীগের উদ্যোগে ভুবন মোহন পার্কে আয়োজিত এক বিরাট জনসভায় প্রধান অতিথির ভাষণ দান কালে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব এ, এইচ, এম, কামারুজ্জামান (হেনা) উপরোক্ত মন্তব্য করেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন জনাব মোঃ মহসীন, সভাপতি শহর আওয়ামী লীগ।
জনাব জামান বলেন যে, প্রতিষ্ঠা থেকে আওয়ামী লীগ সংগ্রাম করে আসছে, বর্তমানে করছে এবং ভবিষ্যতেও করবে। সত্য ও ন্যায়ের বিরুদ্ধে, চক্রান্ত কারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে আওয়ামী লীগ পশ্চাদপদ হবে না। এমন কোন শক্তি নেই যা আওয়ামী লীগকে কর্ত্তব্য ও দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত করতে পারে।
তিনি বলেন যে, যারা নির্বাচনী প্রচারনা হিসেবে ধর্মকে হাতিয়ার স্বরূপ মনে করছেন এবং জনসাধারণ, বিশেষ করে সাধারণ মানুষের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তাদের ন্যাকারজনক কাজ সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। .. (১৯ জুন ১৯৭০)
মন্ত্রিত্বের লোভে নয়, বাঙালীদের স্বার্থরক্ষার জন্যই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যেতে চায়
কামরুজ্জামান
(ষ্টাফ রিপোর্টার)
নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব এ, এইচ, এম কামরুজ্জামান গত মঙ্গলবার রাজশাহী জেলার মোহনপুরে এক বিরাট জনসভায় ভাষণ দান কালে বলেন,ধর্মীয় জিগির ভুলে ও ধর্মের মুখোশ পরে যারা বাংলাদেশের বঞ্চিত লাঞ্ছিত কোটি কোটি মানুষকে দীর্ঘদিন ধরে শাসন ও শোষণ করে এসেছে তাদের মোকবেলা করার জন্য আজ বাঙালীরা প্রস্তুত। তিনি বলেন, আর মাত্র কমাস পর জাতীয় জীবনে সেই বহু প্রতিক্ষিত সুদিন আসবে যে দিন নির্যাতীত সহায় সম্বলহীন মানুষ একটি শাসনতন্ত্র রচনা করবার জন্য প্রতিনিধি নির্বাচিত করবে।
জনাব জামান বলেন, এদেশের অবহেলিত বঞ্চিত মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পুঁজিপতিদের অর্থ যোগান দিয়ে আজ নিঃস্ব রিক্ত। তাদের অর্থে গড়ে উঠেছে এদেশের বাইশটি পরিবার, যাদের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে দেশের সিংহ ভাগ সম্পদ। তিনি ঘোষণা করেন, এইসব অবহেলিত মানুষের মুক্তি সনদ ছয় দফা কর্মসূচী এবং ছয় দফাই বাঙালীদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি আনবে।
জনাব কামরুজ্জামান ঘোষণা করেন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে পঁচিশ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ করে দেবে এবং বাঁধ দিয়ে ও খাল কেটে দেশের ফসলকে অধিক ফলনের উপযোগী করে তুলবে। জনাব কামরুজ্জামান আঞ্চলিক বৈষম্যের কথা উল্লেখ করে বলেন যে কেবলমাত্র আওয়ামী লীগের কর্মসূচীই এদেশের সকল আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করতে সক্ষম। জনাব কামরুজ্জামান বলেন, ক্ষমতার লোভে আওয়ামী লীগ আজ ভোট পার্থী নয়। সে চাই ছয় দফা ও এগারো দফা বাস্তবায়ন করতে। আওয়ামী লীগ তাই জাতির সামনে ছ’দফা ভিত্তিক স্বায়ত্তশাসন ও এগার দফা ভিত্তিক শাসনতন্ত্র পেশ করেছে। আওয়ামী লীগ জনগণের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির জন্যই সংগ্রাম করে যাবে। আওয়ামী লীগ শুধুমাত্র মন্ত্রীত্ব চায় না। তিনি বলেন মুক্তির চরম লক্ষ্য অর্জনের স্বার্থে ও ছয় দফা এগার দফা বাস্তবায়নের জন্যই আওয়ামী লীগ আজ ভোটে দাঁড়িয়েছে।
আবেগ জড়িত কণ্ঠে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জনতার উদ্দেশ্যে বলেন, আপনারা আমাদের নির্বাচনী প্রতীক নৌকায় ভোট দানের মাধ্যমে প্রমাণ করে দিন বাঙালীকে তাদের ন্যায্য দাবী আদায়ের অধিকার থেকে কোন শক্তিই বঞ্চিত করতে পারবে না। আওয়ামী লীগ মন্ত্রীত্ব করার জন্য লালায়িত নয় বা ক্ষমতায় যেতে চায়না। আওয়ামী লীগ বাঙালীদের স্বার্থ রক্ষার জন্যই ক্ষমতায় যেতে চায়। এবং সেই জন্যই নির্বাচনের বহু পূর্বেই ছয় দফা কর্মসূচী ঘোষণা করেছে এবং সেই কর্মসূচী বাস্তবায়নের জন্য বদ্ধ পরিকর। (৬ নভেম্বর ১৯৭০)
আয়ুব শাহীর পতনের পর প্রথম গণ নির্বাচন
নির্বাচনী প্রচারণার মুখে রাজশাহী শহর
বিক্ষুব্ধ, অত্যাচারিত, গণ-মানুষের অধীর প্রতীক্ষা
(রাজনৈতিক ভাষ্যকার)

রোলার চালিয়ে গণমানুষের কন্ঠকে করেছিল স্তব্ধ। কৃষক, শ্রমিক এবং বুদ্ধিজীবী মানুষের অধিকারকে করেছিল হরণ। শিশু বৃদ্ধ ও মহিলারাও তার রুদ্র রোষ থেকে পায়নি অব্যাহতি। পূর্ব বাংলার মানুষকে ধোঁকা দিয়ে তাদেও ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল ঔপনিবেশিক শাসন। এই আইযুব খান এবং তার সাঙ্গোপাঙ্গোরা বেলুচিস্তানের ঈদের জামাতে বোমা ফেলে হাজার হাজার শিশু বৃদ্ধকে হত্যা করেছিল। এই আইয়ুবই দেশের গণতান্ত্রিক ব্যব¯’াকে ধ্বংশ করে চাপিয়ে দিয়েছিল মৌলিক গণতন্ত্র নামে একটি মহাপাপ। এই আইয়ুবই রচনা করেছিল মুখবন্ধ আইন। এই আইয়ুবই তৈরী করেছিল বিখ্যাত আগরতলা মামলার গোপন দলিল। এই আইয়ুবই দেশের নেতৃবৃন্দকে বিনাবিচারে করেছিল কারারুদ্ধ।
তারপর ভিজে ড্যাবড্যাবে চোখে জ¦লে উঠলো ধিকিধিকি অগ্নিশিখা। আইয়ুব শাহীর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হল পূর্ববাংলার আপোষহীন ছাত্রসমাজ। … (৪ ডিসেম্বর ১৯৭০)
৬ দফা ভিত্তিক শাসনতন্ত্র প্রণয়নে কেউ


বাধা দিলে প্রত্যক্ষ সংগ্রাম শুরু করা হবে
কামরুজ্জামান
(ষ্টাফ রিপোর্টার)
গত ১৩ই ডিসেম্বর বিকালে রাজশাহী মাদ্রাসা ময়দানে এক জন সভায় বক্তৃতা প্রসঙ্গে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব এ, এইচ, এম কামরুজ্জামান এ কথা বলেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেন কোন মহল হতে ৬ ও ১১ দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র প্রণয়নের প্রচেষ্টা নস্যাতের চেষ্টা করলে তার দল প্রত্যক্ষ কর্মপš’া গ্রহণ করবে।
তিনি আরও বলেন পাকিস্তানের অখ-ত্য যদি রক্ষা করতে হয়, তবে জাতিকে অবশ্যই ম্যাগনাকার্টার রূপে ছয় দফাকে মেনে নিতে হবে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষ ডঃ মষহারুল ইসলাম সভাপতির ভাষণে বলেন যে, আওয়ামী লীগ গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রকে এক নূতনরূপে সংমিশ্রিত করতে চেষ্টা করবে।
জেলা ছাত্র লীগের সভাপতি জনাব আবদুল কুদ্দুস বলেন যে, নির্বাচিত জাতীয় পরিষদ সদস্যগণ যদি বাংলা দেশের স্বার্থের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেন ও ছয় দফা ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র প্রণয়নে ব্যর্থ হন, তবে তাদেরকে বাংলাদেশে ফিরে আসতে দেয়া হবেনা। (১৮ ডিসেম্বর ১৯৭০)
ইতিহাস বিস্মৃত জাতির পতন অবশ্যম্ভাবী
১৩ই ডিসেম্বর রাজশাহী সহরের কয়েক স্থানে নব নির্বাচিত জাতীয় পরিষদ সদস্যবৃন্দকে প্রাণঢালা সম্বর্দ্ধনা দেওয়া হয়। রাণী বাজারের জনাব হিসাম উদ্দিন আহাম্মদের বাসভবনে মনোজ্ঞ নৈশভোজে ভাষণ দানকালে জনাব কামরুজ্জামান বলেন, ১৯৪৭ সনে আমরা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলি পশ্চিম পাকিস্তানীদের দিয়ে ছিলাম। সে সময় আমরা রাষ্ট্র প্রধান, প্রধানমন্ত্রী এমনকি কেন্দ্রীয় রাজধানী পর্যন্ত পশ্চিম পাকিস্তানে দিয়েছিলাম যার বিষ ফল গত ২৩ বছর আমরা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছি। সোনার দেশকে শ্মশানে পরিণত করা হয়েছে। তখন সাময়িকভাবে আত্ম বিস্মৃত হয়েছিল ইতিহাস ভুলেছিল। আজ জাতি জাগ্রত আর ফিরে পেতে চায় তার ন্যায্য অধিকার।
আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে একক সংখ্যা গরিষ্ঠ দল। সংবিধান রচনায় আওয়ামী লীগ কারো মুখাপেক্ষী নয়। উক্ত ১১ দফা ভিত্তিক শায়ত্ব শাসন ও সংবিধান যারা মেনে নিবেনা তাদের সাথে আওয়ামী লীগ কোন জোট গঠন করবেনা। রাণীবাজারের আওয়ামী লীগ কর্মীরা এই সম্বর্ধনা ভোজ সভার আয়োজন করেছিলেন। (১৮ ডিসেম্বর ১৯৭০)
গণ বিরোধী চক্র দ্রব্য মূল্য বৃদ্ধি করে
সঙ্কট সৃষ্টি করতে চায় Ñকামরুজ্জামান
॥ ষ্টাফ রিপোর্টার ॥
প্রাদেশিক পর্যায়ে নির্বাচন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিষপত্রের অগ্নি মূল্যে জনগণের মনে ভয়ানক হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে ধানের দাম ১৫-১৬ টাকা থেকে ২৩ টাকায় এবং চালের দাম ৩০-৩২ থেকে ৪০ টাকায় বৃদ্ধি পেয়েছে। কেরোসিন তেল বাজার থেকে উধাও হয়েছে। কোন জিনিসের মূল্যই আর জন সাধারণের ক্রয় সীমার মধ্যে নেই। শাক সব্জি, আলু, কপি, মাছ-মাংস, মশলাপাতি সবকিছু চড়া দামে বিক্রয় হচ্ছে। কেরোসিনের অভাবে নি¤œমধ্যবিত্ত এবং মজুরের ঘরে বাতি জ্বলছে না। সারা দিনমান খেটে একজন মজুর যা পায়, তা দিয়ে এক সের চাল কিনতে হয় চৌদ্দ আনা দিয়ে আর এক সের কেরোসিন কিনতে হয় বারো আনা দিয়ে। কিছুদিন যাবৎ রাজশাহী বাজারে মাছ-মাংসের আমদানী কমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের পক্ষে মাছ-মাংস কেনা অসম্ভব হয়ে উঠেছে। এমতাবস্থায় জনগণের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে জিনিষপত্রের মূল্য বৃদ্ধি কৃত্রিম না অন্য কিছু?
এ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব কামরুজ্জামান ‘সোনার দেশের’ প্রতিনিধিকে এক সাক্ষাৎকারে জানান যে গণবিরোধী চক্র পুনর্বার পুরাতন খেলায় মেতে উঠেছে এবং দ্রব্য মূল্য বৃদ্ধি করে এই চক্রই নতুন কৃত্রিম সংকটের সৃষ্টি করছে। তিনি বলেন যে, এই আকস্মিক মূল্য বৃদ্ধির ফলে জনগণের মতে হতাশার সৃষ্টি হয়েছে ও তারা অসহায় বোধ করছে। এই গণ বিরোধী চক্রের উদ্দেশ্যে তিনি হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করে বলেন যে, জনসাধারণ এখন যথেষ্ট সচেতন। তিনি বলেন যে, এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির কোন পার্থিব কারণ থাকতে পারে না। নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমুল্য রোধের জন্য তিনি সরকারের প্রতি অবিলম্বে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান। এ প্রসঙ্গে তিনি আওয়ামী লীগের সমস্ত কর্মীকে সদাজাগ্রত থাকবার জন্য অনুরোধ জানান। তিনি বলেন যে, জনগণ আর কাঁদতে রাজী নয়, তারা গণ বিরোধী চক্রের এই নতুন কারসাজিকে যে কোনো মূল্যে নস্যাৎ করে দেবে। (২৫ ডিসেম্বর ১৯৭০)
কামারুজ্জামান কখনই কোনো নির্বাচনে পরাজিত হননি। দীর্ঘদিন এমএনএ, এমপি ও মন্ত্রী থাকলেও ঢাকা শহরে তাঁর নিজস্ব কোন বাড়ী ছিলনা। নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সংসদে বিরোধী দলীয় উপনেতা হওয়া সত্ত্বেও তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় ও পরে কখনো উঁচু পদের দাবি করেননি। দলীয় সিদ্ধান্তকে সম্মান দিয়েছেন। নেতৃত্বের গুনাবলী বিবেচনা করে এবং তাঁর ত্যাগ ও মহত্বের প্রতি যথাযথ সম্মান দিয়েই ১৯৭৪ এর জানুয়ারি মাসে বঙ্গবন্ধু তাঁকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করেন। বঙ্গবন্ধুর পর স্বাধীন বাংলাদেশে তিনিই একমাত্র আওয়ামী লীগের সভাপতি হয়েছিলেন। এটাই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মান ও গৌরব।
(লেখক সোনার দেশের প্রতিষ্ঠাকালীন সাংবাদিক ও প্রাক্তন ডেপুটি রেজিস্ট্রার, রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়।)