উন্নয়নে দানব এবং মন্ত্রীর ধমক

আপডেট: নভেম্বর ৮, ২০১৯, ১২:৫৬ পূর্বাহ্ণ

ফিকসন ইসলাম


বর্তমান সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রীর দায়িত্বে কাজ করছেন সাবেক আমলা জনাব এমএ মান্নান। মন্ত্রী পরিষদে সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত এবং তার সুনামও রয়েছে। গেলো মেয়াদে তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। বর্তমান মেয়াদে পদোন্নতি পেয়ে তিনি পূর্ণ মন্ত্রীর পদে দায়িত্ব পেয়েছেন। কদিন আগে তিনি তার পৈত্রিক সম্পত্তি জনহিতকর কাজের জন্য সরকরিভাবে দান করেছেন। যেখানে প্রায় সকলেই সহায় সম্পদ বৃদ্ধি করতে ব্যস্ত, কেউ বা জুয়ার আসর থেকে অর্থ ভাগাভাগিতে ব্যস্ত- সেই সময়ে তাঁর এই দান বা অবদান একঅর্থে প্রশংসার দাবী রাখে।
অতি সম্প্রতি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত এক সংবাদে জানা যায়, তার অধীনস্থ মন্ত্রণালয়ের একটি বিভাগের একটি প্রকল্পের ব্যয় নাকি এক ধমকেই অর্ধেকের বেশি কমিয়ে এনেছেন। এই ‘ধমক’ দেবার কারণে সরকারি ব্যয় কমলো অনেক বেশি এজন্য তিনি ধন্যবাদ পাবার যোগ্য। কিন্তু উন্নয়ন প্রকল্পের নামে এর সাথে সংশ্লিষ্ট যারা ছিলেন এক কথায় যারা লুটপাট করে খেতেন তারা মন্ত্রীর উপর অসন্তুষ্ট হয়েছেন এটা নির্দ্বিধায় বলা যায়। প্রতি দশ বছর পরপর দেশে আদমশুমারি করা হয়। আদমশুমারি হিসেবে পরিচিত জনশুমারি ও গৃহ গণনা প্রকল্পে ৩৫০০ কোটি টাকার ব্যয় প্রস্তাব করেছিলো তাঁর মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বুরো বা বিবিএস। পরিকল্পনা মন্ত্রীর কাছে এই প্রস্তাব পাঠানো হলে অংশভিত্তিক ব্যয়ের ফিরিস্তি দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন তিনি, এক কথায় “তাজ্জব’ বনে যান। প্রকল্প প্রণয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিবিএস কর্মকর্তাকে ধমক দিয়ে ব্যয় প্রস্তাব যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে মানার নির্দেশ দেন। ওই ধমকের পরে নতুন করে জউচচ বা সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাবে ২৫০০ কোটি টাকা থেকে ১৭৩৯ কোটি টাকা কমিয়ে ১৭৬১.৭৯ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে এবং তা ২৯ অক্টোবর’ ১৯ একনেক সভায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন করেন।
কথা হলো- এক ধমকেই ব্যয় কমে গেলে ১৭৩৯ কোটি টাকা? প্রশ্ন হচ্ছে এই বিশাল অংকের টাকা কোথায় যেতো, কারা ভাগ পেতো। ওই সংস্থার সচিব জনাব সৌরন্দ্রেনাথ এর বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে অভিযোগ উঠেছে- তিনি ১৩ মাসে ১৯ বার বিদেশ সফর করেছেন পরিবার পরিজন নিয়ে। সরকারি অর্থে পরিবারবর্গ নিয়ে বিদেশ ভ্রমণে কত শত টাকা যে নষ্ট হয়েছে তার হিসেব কি কেউ রাখে বা রাখার সময় আছে। মন্ত্রী মহোদয় মাঠ পর্যায়ে কাজ করে এতদূর পর্যন্ত উঠে এসেছেন ফলে তিনি সবকিছুই জানেন। তাঁর সচিব সাহেবরা উল্টোপাল্টা করে কিছু বোঝাতে পারবেন না জেনেও পুকুর চুরি করার ‘অপচেষ্টা’ করেছিলেন। মন্ত্রী মহোদয়ের ধমকেই ৫০.৩১% ভাগ ব্যয় কমে গেছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ছাড়া অন্য যেসব মন্ত্রণালয় রয়েছে, যে সকল মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী মহোদয়গণ তো এত কিছু জানেন না। ডিপিপি বা পিইসি সম্পর্কে জ্ঞান নেই তাদেরকে এক রকম ‘বোকা’ বানিয়ে সচিবগণ যাচ্ছেতাইভাবে প্রকল্প অনুমোদন করিয়ে নিচ্ছেন। একটি উদাহরণ থেকেই বোঝা যায়। আমাদের দেশে উন্নয়নের নামে যে সকল প্রকল্প হাতে নেয়া হচ্ছে বা প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে তা অনায়াসেই ৫০% কমে বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
দুর্নীত আর অনিয়মের কারণেই উন্নয়নের সুফল থেকে জনগণের বঞ্চিত হওয়ার কথা সম্প্রতি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেও উচ্চারিত হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হওয়া জনগণের শ্রম ও ঘামের কষ্টার্জিত অর্থ ব্যয় করে সরকার বিভিন্ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন করে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ এসব উন্নয়ন প্রকল্পের সুফল কতটা ভোগ করতে পারে বা পারছে বা পারবে তা নির্ভর করে মূলত দুটো বিষয়ের ওপর। প্রথমতঃ প্রকল্পগুলো কতটা সুপরিকল্পিত এবং দ্বিতীয়ত প্রকল্পগুলো কতটা অনিয়ম ও দুর্নীতি মুক্তভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো- সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতি এখন এতটাই ‘অপ্রতিরোধ্য’ হয়ে উঠেছে যে, প্রকল্প প্রণয়নের সময় বা প্রকল্পের পরিকল্পনাতেই দুর্নীতির নীলনকশা প্রস্তুত করা যেন এখন রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেন অন্যায় বা দুর্নীতি এখন বৈধ। সম্প্রতি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীন এমন কিছু প্রকল্প প্রস্তাবনা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে গিয়ে আটকে গেছে এবং সংবাদ মাধ্যমে সেসব নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
প্রথমে উল্লেখ করেছি পরিকল্পনা মন্ত্রীর এক ধমকেই প্রকল্প ব্যয় ৫০.৩১% কমে গেছে। আর এই অবস্থা সকল মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রযোজ্য। দেশের প্রকৃত জনসংখ্যা কত তা জানতে প্রতি ১০ বছর পর পর আদশশুমারি বা জনশুমারি ও গৃহগণনা করে বিবিএস। সর্বশেষ ২০১১ সালের এই প্রকল্প প্রকৃত ব্যয় হয়েছিলো ২৩৭ কোটি টাকা আর দশ বছর পর এমন কী ঘটলো? যাতায়াত, বেতন, খাওয়া সবকিছুতে কত পরিবর্তন হয়েছে যে ২৩৭ কোটি টাকা- ১৫ গুন বেড়ে ৩৫০০ কোটি টাকা হয়ে গেলো। এবং ওই প্রকল্প প্রণয়নে অযৌক্তিক ব্যয় প্রস্তাব আসলে দুর্নতিরি নীল নকশা ছিলো।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বুরো বা বিবিএস সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালের আদমশুমারেতে ই-মেইল, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন, টেলিফোন এবং পিক অ্যান্ড ড্রপ পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করা হবে এজন্য অভিজ্ঞতা অর্জনে বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য ৭ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব দেয়া হয়েছিলো। পরিকল্পনা কমিশন এত বিশাল অংকের টাকায় বিদেশ ভ্রমণ বা প্রমোদ ভ্রমণে প্রশ্ন তোলায় নতুন প্রস্তাবনায় তা করা হয়েছে প্রায় ৪ কোটি টাকা। এছাড়াও টেলিফোন, ফ্যাক্স ও ইন্টারনেট খাত, বিজ্ঞাপন খাত, মানচিত্র প্রণয়ন, প্রকল্পের জন্য গাড়ি, তেল, লুব্রিকেট এবং গ্যাস জ্বালানি খাত, আপ্যায়ন, গাড়ি কেনাসহ বিভিন্ন খাতে প্রস্তাবিত ব্যয়ের চেয়ে সরাসরি অর্ধেকে নামিয়ে নানা হয়েছে। তবে মন্ত্রীর ধমকের পর সংশোধিত প্রস্তাবনায় ব্যয় কমানো হয়েছে মূলত প্রকল্পের দেশি অর্থায়নের অংশে, বৈদেশিক সহায়তা অংশের প্রস্তাবিত ব্যয়ে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর আদমশুমারি ও গৃহ গণনা প্রকল্পের ব্যয় প্রস্তাবই পরিকল্পনা পর্যায়ে দুর্নীতির নীলনকশা এমন প্রথম দৃষ্টান্ত নয়, কিছুদিন আগে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে চট্টগ্রামে আন্তর্জাতিক মানের মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ প্রকল্পের ক্রয় প্রস্তাবে অস্বাভাবিক ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন তোলে নির্বাচন কমিশন। বিভিন্ন সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে জানা গেছে ওই প্রকল্পে ১২টি দ্রব্যের প্রস্তাবিত ক্রয়মূল ছিলো অনেকটা পাহাড়সম। প্রকল্প প্রস্তাবনা বা উচচ তে প্রতিটি বালিশ ক্রয়ে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছিলো ২৭ হাজার ৭২০ টাকা, আর বালিশের কাভারের প্রস্তাব ছিলো ২৮ হাজার করে। লোক জানাজানির পর অবশ্য ওই প্রস্তাব সংশোধন করা হয়।
বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে এমন অস্বাভাবিক ব্যয় প্রস্তাবে এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, প্রকল্প প্রণয়ন ও অনুমোদনের ক্ষেত্রে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা বা চচজ যথাযথভাবে অনুসৃত হচ্ছে কিনা? যদি তা না হয়ে থাকে সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা দপ্তরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ‘বিধিমালা’ লংঘনের দায়ে কোনো প্রকার শান্তিমুলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না কেন? নানা সময়ে সরকারি প্রকল্পের দুর্নীতি বন্ধ না হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে সরকারি কর্মকর্তাদের অলিখিত দায় মুক্তি’কে অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশ্লেষককরা। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি বাড়তে থাকার মতো অর্থনৈতিক প্রগতির খবরে যেমন আশা জাগানিয়া, তেমনি সর্বগ্রাসী দুর্নীতির খবর সেই আশাভঙ্গের অন্যতম কারণ। কেননা দুর্নীতির লাগাম টানতে না পারলে সমাজ ও রাষ্ট্রকে সামগ্রিকভাবে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। এ আবদার রাজনৈতিক অঙ্গনে চলমান শুদ্ধি অভিযানের মতোই সরকারি পর্যায়ে দুর্নীতির লাগাম টানার বিশেষ পদক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়েছে।
যে সরকারি কর্মচারী ১৩ মাসে ১৯ বার বিদেশ ভ্রমণ করেছে, যে সচিব একাই চারটি সরকারি গাড়ি ব্যবহার করছেÑ এই সব দৈত্য-দানবদের উপযুক্ত শিক্ষা দিতে না পারলে এই গরিব দেশের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে- তাতে সন্দেহ নাই।
লেখক: প্রকৌশলী