উন্মাদনার ফুটবলে সোনালী অতীত শিক্ষা প্রশিক্ষণে বাড়াবে এর ভীত

আপডেট: মার্চ ৯, ২০১৭, ১২:০৩ পূর্বাহ্ণ

মো. আবুল হাসান, খন রঞ্জন রায়
ফুটবল হচ্ছে এ জনপদের সবচেয়ে জনঘনিষ্ঠ খেলা। বাংলাদেশের ফুটবলের রয়েছে এক গৌরবময় ইতিহাস। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের ইতিহাসের সাথে ফুটবল জড়িয়ে আছে। একেবারেই অঙ্গাঙ্গিভাবে। বলা যায়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধেও আছে আমাদের ফুটবলের বড় একটা অবদান। আমাদের ফুটবলারেরা সেদিন তাদের নিজেদের অবস্থান থেকে এই ফুটবলকে হাতিয়ার করেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। বিশ্বের ইতিহাসে বিরল এক ঘটনা। যা পৃথিবী আগে কখনও দেখেনি। একটি দেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের প্রতিনিধি হয়ে সেদিন বাংলাদেশের ফুটবলাররা বেরিয়ে পড়েছিলেন স্বাধীনতার খোঁজে। যে দলের নাম ছিল ‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল’।
আমাদের প্রাণের এই খেলা ফুটবল বেশ কয়েক বছর ধরেই যেন দিশাহীন। হারিয়ে গেছে আগের সেই আবেগ, উদ্মাদনা। ফাঁকা স্টেডিয়ামের গ্যালারি। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশের র‌্যাংকিং যেখানে ছিল ১১০, দুই দশক পরে তা ১৮৮ তে। জাতীয় দলের ব্যর্থতায় এবং সামগ্রিকভাবে ফুটবলের এই ক্রমেই পিছিয়ে পড়া জাতির জন্য বেদনাদায়ক। দক্ষিণ এশিয়ায় যে দেশগুলো আমাদের অনেক পেছনে ছিল, সেই আফগানিস্তান (১৪৭), মালদ্বীপ (১৫৪), ভুটান (১৭৬), নেপাল (১৮১) আমাদের চেয়ে ওপরে উঠে গেছে। ২০১৬ সালটি ছিল বাংলাদেশের জন্য আরো অধঃপতনের বছর। বেশ কয়েক বছর ধরে ঘুণে খেতে শুরু করা বাংলাদেশের ফুটবল যেন পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়ে এই সময়। যার শুরু হয় গেলো বছর বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচ দিয়ে। প্রায় প্রতিটা ম্যাচে অসহায় আত্মসমর্পণ করা বাংলাদেশ ঘরে বাইরে খায় ভূরি ভূরি গোল। অস্ট্রেলিয়া, জর্ডান, কিরগিস্তান আর তাজাকিস্তানের সাথে ৮ ম্যাচে ৩২ গোল হজম করে বাংলাদেশ।
যদিও সাম্প্রতিক সময়ে ক্রিকেট ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু জনপ্রিয়তা মাপকাঠিতে এখনও ক্রিকেটের চেয়ে এগিয়ে আছে ফুটবল। ব্যাপক জনপ্রিয় হওয়ার পরও ফুটবলের মান উন্নয়নে তেমন তৎপরতা নেই। বরং আমাদের ফুটবলের মান খাদে নামতে নামতে এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ভুটানের মতো দেশের সঙ্গেও লড়তে পারছি না আমরা বীরবিক্রমে। ফুটবলের উন্নয়নে সঠিক ও কার্যকর কোনো কর্মপরিকল্পনা না থাকার কারণেই পরিস্থিতি আজ এতটা শোচনীয় হয়েছে। দেশের ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) এত দিনেও একটা সঠিক পথরেখা তৈরি করতে পারেনি। ক্লাবগুলো বালুতে মুখ গুঁজে আছে। নতুন খেলোয়াড় তৈরিতে তারা ভূমিকা রাখতে না পারার কারণেই জাতীয় দলে খেলোয়াড়ের সংকট এতটা তীব্র। আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় টুর্নামেন্ট দক্ষিণ এশীয় ফুটবল ফেডারেশন চ্যাম্পিয়নশিপ বা সাফের গত তিনটি আসরেই আমরা গ্রুপ পর্বেই বিদায় নিয়েছি। এখন চট্টগ্রামে চলছে শেখ কামাল আন্তর্জাতিক ক্লাব কাপ টুর্নামেন্ট। জানা অজানা কয়েকটি ক্লাবের দৌড়াদৌড়ি দেখতেও কেউ স্টেডিয়ামে ঢ়ুঁ-মারছে না।
এদেশের বিশেষায়িত একমাত্র ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি) ৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকে  দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড কারিকুলাম অনুসরণ করা হয়। বিকেএসপি শিক্ষার্থীদের শিক্ষা বোর্ডের নিয়মনীতি অনুসরণ করে সাধারণ লেখাপড়ার ফাঁকে খ-কালীন ফুটবলের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। যা দিয়ে জাতির আশা আকাক্সক্ষা পূরণ হওয়া সম্ভব নয়। বিশ্বমানের দূরের কথা সার্ক মানেরও ফুটবলার তৈরি করতে পরছে না বিকেএসপি। বিশ্ব আজ একবিংশ শতাব্দীর দেড় দশক পাড়ি দিয়েছে। মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট চৈতন্যের পর এখন সাসটেইনেবল ডেভেলাপমেন্ট গোলস্ বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের দুই বছর অতিক্রম করেছে। বাংলাদেশের ফুটবল দল বিশ্বকাপ, এশিয়া কাপ জয় করতে হলে পুরাতন ধ্যান-ধারণা ত্যাগ করে টেকসই লক্ষ্যমাত্রায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রযুক্তিগুলো শিক্ষানীতিতে সংযোগ ঘটাতে হবে।
বাংলাদেশ ফুটবলের অভিভাবক হিসেবে গত সাড়ে আট বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন কিংবদন্তী ফুটবলার কাজী সালাউদ্দিন। এই মেয়াদে দেশের ফুটবল উন্নয়নে কথার ফুলঝুরি ছোটানো ছাড়া জাতিকে আর কিছুই উপহার দিতে পারেননি। তিনি পোশাক পাল্টানোর মতো ফুটবলারদের জন্য কোচ পাল্টেছেন। ট্রেনার, ফিজিও, গোলরক্ষক কোচ-কোনোটাই আনতে বাদ রাখেননি। অন্তত জাতীয় দলের কোচিং স্টাফের ব্যাপারে কার্পণ্য দেখাননি তিনি। কিন্তু জাতীয় দল নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা কি তিনি করেছেন? মোটেও না, ভুটানের কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা আছে। নতুন খেলোয়াড় তৈরির আশায়  ভুটান যুবকদের দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ ছাড়াও এ বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ডিপ্লোমা কোর্স চালু করেছে বেশ আগেই। বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর এসে ফুটবল শিক্ষায় আলাদা কোর্স কারিকুলাম চালু করতে পারেনি। এখানেই দুই দেশের বড় পার্থক্য। ভুটানের ডিপ্লোমা শিক্ষার ফুটবলার কোর্সের ফসল একজন চেনচো। ৭ নম্বর জার্সিধারী এই ফরোয়ার্ড বাংলাদেশের ‘কালরাত’ সৃষ্টি করেছেন। দুর্ভাগ্য, একজন চেনচো নেই বাংলাদেশের। ভুটানের অধিনায়ক বিমান চালনা শেষে বাকি সময়ে ফুটবল খেলেন। আর আমাদের মামুনুলরা ৬০ লাখ টাকা ক্লাব থেকে পেয়েও জিততে পারেন না। তাঁরা জাতীয় দলের অনুশীলন বাদ দিয়ে একটি সার্ভিসেস দলের ম্যাচ খেলতে যান। নতুন খেলোয়াড় নেই বলে তাঁদের ওপর ভরসা করতে হয় বারবার।
অবাকের বিষয় ফুটবল শিক্ষাতো নয়ই তদুপরি খেলাধুলার সরঞ্জাম কারখানাও স্থাপন করা হয়নি। ফুটবল উন্নত জাতি হিসাবে নিজেদের আত্মপ্রকাশ ঘটাতে হলে সব বিষয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে। বিকেএসপি’র মাধ্যমিক পরবর্তী প্রাতিষ্ঠানিক ডিপ্লোমা শিক্ষা কোর্স চালু করতে হবে। ডিপ্লোমাপ্রাপ্ত তরুণরা ফুটবল পেশাজীবী হবে। ‘ধরে বেঁধে হরিনাম; না বানিয়ে  আক্ষরিক অর্থেই নিজ পেশার মানোন্নয়নে মনোনিবেশ করবে।
ফুটবল শিক্ষায় ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠায় যাবতীয় সরকারি রেয়াত সুবিধা গ্রহণ করবে। আর তা হলেই অতীত শক্তির ফুটবল তার হৃতগৌরব পুনরুদ্ধার হবে। দেশের আনাচে কানাচে গড়ে উঠবে প্রফেশনাল ফুটবল ক্লাব, দল আর খেলোয়াড়।
লেখক: সভাপতি ও মহাসচিব, ডিপ্লোমা শিক্ষা গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ
শযধহধৎধহলধহৎড়ু@মসধরষ.পড়স