উসামার নির্দেশেই সংসদ ভবনে হামলার পরিকল্পনা!

আপডেট: মে ৬, ২০২১, ১০:২৫ অপরাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক:


আলি হাসান উসামা (বাঁয়ে) ও সাকিব (ডানে)

উগ্রপন্থী ইসলামি বক্তা আলি হাসান উসামার নির্দেশেই সংসদ ভবনে তলোয়ার নিয়ে হামলার পরিকল্পনা করেছিল আনসার আল ইসলামের সক্রিয় সদস্য আল সাকিব। এই হামলার জন্য সাকিবকে মোট ৩১৩ জন সদস্যকে একত্রিত করার নির্দেশনা দেয় উসামা। বদর যুদ্ধের আদলে এই হামলা চালানোর পরিকল্পনা করেছিল সে। এজন্য ফেসবুকে গোপন একটি গ্রুপও খোলা হয়েছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সাকিব কয়েকজন সহযোগীসহ সংসদ ভবন এলাকায়ও গিয়েছিল। তাদের সঙ্গে ছিল ধারালো অস্ত্র। উদ্দেশ্য ছিল সংসদ ভবনে ঢুকতে বাঁধাদানকারী আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর প্রথমে হামলা করা হবে। যদি এতে তারা জয়লাভ করে, তাহলে সংসদ ভবনে প্রবেশ করবে।
কিন্তু গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে আগে থেকেই বিষয়টি জানতে পেরে আল সাকিবকে বুধবার (৫ মে) রাত ৮টার দিকে সংসদ ভবন এলাকার মানিক মিয়া এভিনিউ থেকে ধারালো অস্ত্রসহ গ্রেফতার করা হয়। এ সময় তার সহযোগী কয়েকজন পালিয়ে যায়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সাকিবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাতেই অভিযান চালিয়ে রাজবাড়ী থেকে গ্রেফতার করা হয় উগ্রবাদ ছড়ানো ইসলামি বক্তা আলি হাসান উসামাকে।
ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট-সিটিটিসির উপ-কমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সাকিব আনসার আল ইসলামের সক্রিয় সদস্য। আর আলি হাসান উসামা আনসার আল ইসলামের আধ্যাত্মিক গুরু হিসেবে পরিচিত। আনসার আল ইসলামের সদস্যরা সবাই এখন উসামার উগ্রবাদী ওয়াজ প্রচার করে কথিত জিহাদের জন্য সদস্য সংগ্রহ করে আসছে।’
দীর্ঘ দিন ধরে জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে কাজ করে আসা পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা উসামা এবং সাকিবকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবো। তাদের পুরো পরিকল্পনা কী ছিল তা জানার চেষ্টা চলছে। একইসঙ্গে তাদের সহযোগীদের গ্রেফতারের জন্যও অভিযান চালানো হচ্ছে।’
বাংলাদেশে সক্রিয় জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে আল-কায়েদার অনুসারী আনসার আল ইসলাম অন্যতম। আগে এই সংগঠনটি ‘আনসারুল্লাহ বাংলা টিম’ নামে পরিচিত ছিল। ২০১৩ সাল থেকে মুক্তমনা ব্লগার, লেখক, প্রকাশক, ভিন্নমতালম্বী ও ভিন্নধর্মালম্বীদের টার্গেট কিলিং করে আলোচনায় আসা আনসারুল্লাহ বাংলা টিমকে ২০১৫ সালের ২৫ মে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এরপর নাম পাল্টিয়ে নিষিদ্ধ এই সংগঠনের সদস্যরা ‘আনসার আল ইসলাম’ নামে তাদের কর্মকা- চালাতে থাকে। ২০১৭ সালের ৬ মার্চ আনসার আল ইসলামকেও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। সর্বশেষ নিষিদ্ধ এই সংগঠনের সদস্যরা ২০১৬ সালের ২৫ এপ্রিল সমকামী বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘রূপবান’ এর সম্পাদক ইউএস এইডের কর্মকর্তা জুলহাজ মান্নান ও নাট্যকর্মী মাহাবুব তনয়কে গলা কেটে ও কুপিয়ে হত্যা করে।
কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের কর্মকর্তারা বলছেন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে আনসার আল ইসলামের অনেক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তখন থেকেই এই সংগঠনের কোণঠাসা নেতাকর্মীরা নতুন করে টার্গেট কিলিং বন্ধ করে দাওয়াতি কার্যক্রম শুরু করে। সাম্প্রতিক করোনাকালীন সময়ে তারা অনলাইনে নিজেদের প্রচারণা চালিয়ে নতুন নতুন সদস্য সংগ্রহ করেছে।
কাউন্টার টেরোজিম ইউনিটের একজন কর্মকর্তা জানান, আনসার আল ইসলামের সদস্যরা আগে মাওলনা জসিম উদ্দিন রাহমানীকে তাদের আধ্যাত্মিক গুরু হিসেবে মেনে চলতো। নিজেদের সদস্যদের মধ্যে তারা জসিম উদ্দিন রাহমানীর বিভিন্ন ওয়াজ ও বক্তব্য এবং কথিত জিহাদের স্বপক্ষে বিকৃত ব্যাখ্যা প্রচার করে বেড়াতো। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়া অনেক জঙ্গি রাহমানীর বক্তব্যে মোটিভেটেড হয়ে জঙ্গিবাদে জড়িয়েছে বলে স্বীকার করে। ২০১৩ সালের আগস্ট মাসে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে বর্তমানে কাশিমপুর কারাগারে রয়েছে রাহমানী।
কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট সূত্র জানায়, রাহমানী কারাগারে থাকায় তার নতুন কোনও ওয়াজ বা বক্তব্যের প্রচারণা বন্ধ হয়ে গেছে। গত কয়েক বছর ধরে আলি হাসান উসামাকে ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে মেনে আসছিল আনসার আল ইসলামের নেতাকর্মীরা। উসামাই বদর যুদ্ধের আদলে ৩১৩ জনকে নিয়ে সাবিকবে সংসদ ভবনে হামলার নির্দেশনা দেয়। ১৭তম রমজানে বদর যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল। যেই যুদ্ধে ৩১৩ জন সাহাবি অংশ নিয়েছিলেন।
কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের কর্মকর্তারা জানান, তারা উসামা ও সাকিবের ভার্চুয়াল যোগাযোগের কিছু তথ্য পেয়েছেন। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করছেন তারা। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আল সাকিবও উসামার নির্দেশনায় হামলায় অংশ নেওয়ার কথা স্বীকার করেছে।
সংশ্লিস্ট সূত্র জানায়, সিলেটের বাসিন্দা আলি হাসান উসামা রাজবাড়ী জেলায় একটি মাদ্রাসা তৈরি করে সেখানেই বসবাস করে আসছিল। রাজবাড়ী থেকেই বিভিন্ন ওয়াজে কথিত জিহাদের ডাক দেওয়ার পাশাপাশি ইউটিউবে উগ্রবাদী মতাদর্শ ছড়াতো। উসামা যে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছে, সেই মাদ্রাসার উপদেষ্টা হলেন— মুফতি হারুন ইজহার ও মাওলানা মাহমুদুল হাসান গুণভী। তাদের দু’জনের বিরুদ্ধেও জঙ্গিবাদে মদদ, সম্পৃক্ততা ও উগ্রবাদী প্রচারণা চালানোর অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি চট্টগ্রামে নিজ মাদ্রাসা থেকে হারুন ইজহারকে গ্রেফতার করে এলিট ফোর্স র‌্যাব।
নজরদারিতে রকমারী ডটকম
কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের কর্মকর্তারা বলছেন, আনসার আল ইসলামের আধ্যাত্মিক নেতা আলি হাসান উসামা ইন্টারনেটের মাধ্যমে উগ্রবাদী বক্তব্য প্রচারের পাশাপাশি অনেকগুলো বই লিখেছেন। এসব বইয়ের মধ্যে অনেকগুলো কথিত জিহাদের বিষয়ে অপব্যাখ্যায় ভরা। ‘গাজওয়াতুল হিন্দ’ বা হিন্দুস্থানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার সময় এসেছে— এমন বই লেখার মাধ্যমে তরুণদের কথিত জিহাদের ভুল পথে নেওয়ার চেষ্টা করছে উসামা। তার এসব বই রকমারী ডটকম নামে একটি অনলাইন বই বিক্রির প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞাপন দিয়ে বিক্রি করে আসছিল।
কাউন্টার টেরোরিজম কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা রকমারী ডটকমের মতো উসামার জিহাদি বই-পুস্তক আরও যারা প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে বিক্রি করতো, তাদেরকেও গোয়েন্দা নজরদারি করছি। এটা শুধু বিক্রির জন্যই, নাকি এর পেছনে একই ভাবাদর্শের প্রচারণার কোনও উদ্দেশ্য ছিল তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার (৬ মে) আলী হাসান উসামাকে গ্রেফতারের খবর প্রচারিত হওয়ার পরপরই রকমারী ডটকমের ওয়েবসাইটে থেকে উসামার সব বইয়ের বিজ্ঞাপন সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে রকমারী ডটকমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান সোহাগের সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভি করেননি।
তথ্যসূত্র: বাংলাট্রিবিউন