ঋণের জালে ‘ডালের রাজধানী’ বন্ধ হয়ে গেছে বেশিরভাগ ডাল মিল

আপডেট: জানুয়ারি ১৩, ২০২০, ১২:৪২ পূর্বাহ্ণ

বুলবুল হাবিব


রাজশাহীর বানেশ্বরে একটি ডালমিলে কাজ করছেন কয়েকজন শ্রমিক -সোনার দেশ

জালাল উদ্দীন ২৫ বছর ধরে ডাল প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাতকরণের সাথে জড়িত। তার বানেশ্বর বাজারে রূপালী ডাল মিল নামে একটি মিল ছিলো। আগে তিনি ডালজাতীয় শস্য কৃষকদের কাছ থেকে ক্রয় করে তার মিলে প্রসেসিং করে বাজারজাত করতেন। গত তিন বছর ধরে লোকসান গুণতে গুণতে পুঁজি হারিয়ে মিলটি বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু পুঁজি হারিয়ে মিল বন্ধই হয়নি, তিনি ঋণের জালে জর্জরিত হয়ে গেছেন। ব্যাংকে তার লোন দাঁড়িয়েছে দুই কোটি ২০ লাখ টাকা। তিনি এখন বাজারে ছোট একটি ওষুধের দোকান দিয়ে কোনোরকমে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
আলতাফ হোসেন ২০০৭ সাল থেকে ডাল প্রসেসিং করে বাজারজাতকরণের সাথে যুক্ত। তারও বাজারে বিপ্লব ডাল মিল নামে একটি মিল ছিলো। সেখানে তিনি ডাল শস্য থেকে প্রসেসিং করে মার্কেটিং করতেন। গত তিন বছরে তিনিও পুঁজি হারিয়ে ব্যাংকের ঋণে জর্জরিত হয়ে গেছেন। তার ব্যাংকে ঋণ রয়েছে ৫০ লাখ টাকা।
রাজশাহীর বানেশ্বরে মিলে ডাল প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাতকরণের জন্য সারাদেশের মধ্যে বিখ্যাত। বানেশ্বরকে ‘ডালের রাজধানী’ বলা হয়। সারাদেশের প্রায় ৬০ শতাংশ ডাল এখান থেকে সরবরাহ করা হয়। অথচ গত পাঁচবছর ধরে এই ডাল ব্যবসায়ী ও মিল মালিকরা পুঁজি হারিয়ে ঋণের জালে জর্জরিত হয়ে পড়েছেন। বেশিরভাগ মিল বন্ধ হয়ে পড়েছে। বানেশ্বরের ৩০০টি ডাল মিলের মধ্যে বর্তমানে চালু রয়েছে ৫০ থেকে ৬০টি। এর ফলে ডাল প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাতকরণের সাথে যুক্ত হাজার হাজার মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। যেসব মিল চালু রয়েছে তারাও ভর্তুকি দিয়ে মিল চালাচ্ছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত শতাব্দীর আশির দশকে বানেশ্বর বাজারে ডাল মিলের গোড়াপত্তন হয়। তখন থেকেই চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনার ঈশ্বরদী, ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ, ফরিদপুর, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া থেকে ডাল শস্য ক্রয় করে এনে বানেশ্বরে মিলে প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাত করা শুরু হয়। তবে এই শতাব্দীর শুরুর দিকে বানেশ্বরে ডাল ব্যবসা সারাদেশে প্রসার লাভ করে। কিন্তু ২০১৩ সালের দিক থেকে মেঘনা গ্রুপ, ফ্রেস, সিটি গ্রুপ, ডিকে গ্রুপ, এসি আই গ্রুপসহ বড় বড় শিল্প গোষ্ঠী বিদেশ থেকে মোটা দানার ডাল ক্রয় করে কমমূল্যে বাজারে ছাড়ে। তখন থেকেই অল্প অল্প করে ডালের বাজারে ধস নামে। কিন্তু ২০১৫ সালের শেষ দিকে এসে বাজার পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ হয়ে দাঁড়ায়। তারপরই একের পর একে ডাল মিল বন্ধ হয়ে যায়। গত তিনবছরে একটার পর একটা ডাল মিল বন্ধ হয়ে যায়। এখন যেসব ডাল মিল চলছে সেসব ভর্তুকি দিয়ে চলছে।
মিল মালিক ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত পাঁচবছর ধরে বহুজাতিক কোম্পানির সিন্ডিকেট ব্যবসায়ের কারণে তারা ব্যাপক লসে পড়েছেন। বহুজাতিক কোম্পানির লোকেরা এলসির মাধ্যমে অস্ট্রেলীয়, কানাডা থেকে মোটা দানার মসুরের ডাল কিনে এনে দেশীয় মসুরের ডালের অর্ধেক দামে মাত্র ৫০ টাকা কেজি দরে ডাল বিক্রি করছেন। ফলে দেশি ডালের দামেও ধস নেমে যাচ্ছে। দাম কম হওয়ায় গুদামে দেশি ডাল অবিক্রিত পড়ে থাকছে। এছাড়া ব্যাংকের চড়া সুদও ঋণের জালে জর্জরিত হওয়ার একটা বড় কারণ। মিল মালিকদের স্বল্প সুদে ঋণ প্রদান করে ডাল আমদানি বন্ধের আহ্বান জানান মালিকরা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, দাম কমে যাওয়ার কারণে কৃষকরাও ঠিক সেভাবে আর ডাল জাতীয় শস্য উৎপাদন করছেন না।
রজব অ্যান্ড ব্রাদার্স ডাউল মিলের ম্যানেজার মোহাম্মদ আলী সরকার বলেন, যেখানে দেশি মসুরের ডালের দাম মণপ্রতি ২২০০ টাকা- সেখানে মোটা দানার মসুরের ডাল বিক্রি হচ্ছে মণপ্রতি ১৪০০ টাকায়।
মেসার্স মামা-ভাগ্নে ডাউল মিলের সত্ত্বাধিকারী নাসির উদ্দিন বলেন, বহুজাতিক কোম্পানিগুলো সিন্ডিকেট করে বিদেশ থেকে এলসির মাধ্যমে ডাল ক্রয় করে দেশে কম দামে ছাড়ছে। ফলে মিল মালিকরা ডাল বিক্রি করতে পারছে না। তাদের গুদামে শত শত মণ মসুরের ডাল অবিক্রিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। আবার বাধ্য হয়ে কম দামেই ডাল বিক্রি করতে হচ্ছে।
মেসার্স সাহা ডাল মিলের প্রোপাইটার সুব্রত মোহন সাহা বলেন, আগে কৃষকদের কাছ থেকে ডাল ক্রয় করে প্রসেসিং করে বাজারজাত করতাম। ব্যাংকে ঋণ হয়ে যাওয়ায় আর ডাল ক্রয় করতে পারিনা। ব্যবসায়ীরা এসে আমার মিলে ডাল প্রসেসিং করে নিয়ে যায়। সেখান থেকে যা লাভ হয়। ব্যাংকের সুদ কমিয়ে স্বল্প সুদে মিল মালিকদের ঋণ দেয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।
মেসার্স নর্থবেঙ্গল ডাউল মিলের সত্ত্বাধিকারী সেলিম রেজা বলেন, ডালের ব্যবসা মসুর ডাল দিয়েই। সবসময় মসুর ডালের চাহিদা বেশি থাকে ভোক্তাদের কাছে। কিন্তু মোটা দানার বিদেশি মসুর ডালের কারণে দেশি মসুর ডালের দাম কমে যাওয়ার কারণে মিল মালিকরা প্রচুর লোকসানে পড়েছে। এখন কোনোমতে মুগ ডালের ব্যবসা করে মিল টিকিয়ে রাখা হয়েছে। বেশিরভাগ মিল বন্ধ হয়ে গেছে।
বানেশ্বর আঞ্চলিক ডাউল ব্যবসায়ী অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ওবায়দুর রহমান বলেন, গত পাঁচবছর ধরে ডাল ব্যবসায়ীরা নিঃস্ব হয়ে গেছে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো সিন্ডিকেট করে কম দামে ডাল বিক্রি করে আমাদের মতো ক্ষুদ্র মিল মালিকদের নিঃস্ব করেছে। গত পাঁচবছরে আমার ক্ষতি হয়েছে ২০ কোটি টাকা। ভর্তুকি দিয়ে মিল চালাতে হচ্ছে। গুদামে অবিক্রিত পড়ে রয়েছে সাড়ে ১৭ হাজার মণ মসুরের ডাল। সরকারকে এসব ক্ষতি পূরণে এগিয়ে আসতে হবে। স্বল্পমূল্যে সুদে কৃষকদের ঋণ দেয়ার পাশাপাশি এসব বহুজাতিক সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের রোধ করতে হবে। বিদেশ থেকে ডাল আমদানি বন্ধ করতে হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ