এইচআইভি এবং এইডস সচেতনার ক্ষেত্রে সামাজিক আন্দোলন

আপডেট: December 2, 2016, 12:08 am

মোহা. আবুল বাশার পল্টু

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
আরও একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এমএসএম (গধষব যিড় যধাব ংবী রিঃয সধষব)দের এক বৃহৎ অংশ অন্য পুরুষের সাথে ঘন ঘন ও অনিরাপদ যৌনকর্মের কারণে ঝুঁকির সম্মুখিন হয়। সমকামী পুরুষদের মধ্যে কনডম ছাড়া পায়ুপথে সংগম করা, ঐওঠ ও অওউঝ এবং অন্যান্য যৌনবাহিত সংক্রমণের একটি ঝুঁকিপূর্ণ উপায়। এই পুরুষদের অনেকেরই আবার নারীসঙ্গী থাকে। এর অর্থ হলো, পুরুষদের মধ্যে কনডমহীন যৌন সম্পর্ক তাদের নারী সঙ্গীদের এবং তাদের ভবিষৎ সন্তানদের জন্য এইচআইভি ভাইরাস ও অন্যান্য যৌনরোগের ঝুঁকি তৈরি করে। একইভাবে, দুইজন নারী ও পুরুষের মধ্যে কনডম ছাড়া যোনিপথে বা পায়ুপথে সংগম পুরুষ সঙ্গীদের জন্যও সংক্রমণের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে।
বিশেষ করে কনডমহীন পায়ুপথে সঙ্গমের (পায়ুপথে সঙ্গম নারী ও পুরুষের মধ্যে হতে পারে) মাধ্যমে ঐওঠ সংক্রমনের ঝুঁকি অধিক। পায়ুঁপথের বাহিরাবরন অতি পাতলা এবং সহজেই ছিঁড়ে যায়। এর বহিরাবনে সমান্যতম ক্ষতের মাধ্যম ভাইরাসটি অতি সহজে মানবদেহে প্রবেশ করতে পারে। এমনকি এই ধরনের ক্ষুদ্র ক্ষত না থাকলেও এটা মনে করা হয় যে, পায়ুপথের বহিরাগমনের ক্ষত কোণগুলোর এইচআইভি প্রতিরোধ ক্ষমতা খুবই অল্প। পায়ুপথে অরক্ষিত সঙ্গমের ক্ষেত্রে গ্রহণকারীর ঐওঠ থাকলে প্রবেশকারীরও এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। সঙ্গীদের যে কোন একজনের ঐওঠ এবং চিকিৎসা করা হয়নি এমন অন্যান্য যৌনবাহিত সংক্রমণ যেমন- সিফিলিস, গনোরিয়া এবং ক্যামইডিয়াল সংক্রমণ ঐওঠ-র ঝুঁকি বহুগুে বৃদ্ধি করে।
যেভাবে প্রতিরোধ করা যায়
আর এই এইচআইভি ভাইরাস প্রতিরোধের প্রধান উপায়গুলো হচ্ছে- পরীক্ষা ছাড়া রক্ত গ্রহণ না করা, অনিরাপদ যৌনমিলন থেকে বিরত থাকা এবং সুঁই ও সিরিঞ্জ ভাগাভাগি না করা ও শিরায় মাদক গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা। এ কাজগুলি করার মাধ্যমে এইচআইভি ভাইরাস প্রতিরোধ করা খুবই সহজ। আমরা এ সকল বিষয়গুলি নিয়ে অবহেলা করতে পারি না। আমাদের অবহেলার কারণে যদি আমরা রোগাক্রান্ত হই তাহলে রোজ কেয়ামতে বা শেষ বিচারের সময় আমাদের দায়ী থাকতে হবে। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন “কেয়ামতের দিন বান্দাকে নি’য়ামত সর্ম্পকে সর্বপ্রথম যে প্রশ্নটি করা হবে- তা হল (তার সুস্থতা সম্পর্কে), তাকে বলা হবে- আমি তোমাকে কি শারীরিক সুস্থতা দেইনি?” (সুনান তিরমিযী, হাদীস নং- ৩৩৫৮) কাজেই রোগ হওয়ার পূর্বেই আমাদের সতর্ক/সচেতন হয়ে তা প্রতিরোধ করতে হবে।
হিন্দু ধর্মের আলোকে সুস্থ ও পরিচ্ছন্ন জীবন যাপন
“গীতায় কাম প্রবৃত্তির ব্যাপারে সাবধান বাণী আছে, ত্রিবধিং নরকস্যেদং দ্বারং নাশনমাতুন :” কামঃ ক্রোধস্তথা লোভস্তস্মাদেরৎত্রয়ং ত্যজেৎ (গীতা ১৬ অধ্যায় ২১ শ্লোক। অর্থাৎ কাম, ক্রোধ ও লোভ এই তিনটি নরকের দরজার মত। এরা জীবের অধোগতির কারণ। এসব দরজায় প্রবেশ করলে মানুষ জীবনের কল্যাণকর কিছু লাভের অযোগ্য হয়। অতএব এই তিনটি বিষের মত ত্যাগ করা উচিত। সনাতন হিন্দু ধর্মশাস্ত্রে গৃহস্থ ব্যক্তিকে অবৈধ কাম থেকে সাবধান থাকার জন্য বলা হয়েছে। মহানির্ব্যনতন্ত্রে পবিত্র (৮ অধ্যায় ৪০ শ্লোক) আছে, হিতেষু স্বীয়দারেষু স্ত্রিয়মন্যাৎন সংস্পৃশেৎ, দৃষ্টেন চেতনা বিদ্ধান অন্যথা নারকী ভবেৎ। বিজ্ঞ ব্যক্তি স্বীয় পতœী বিদ্যমান থাকতে দুষ্টভাবে পরস্ত্রীকে স্পর্শ করবে না। স্পর্শ করলে নরকবাসী হবে। মারাত্মক ব্যাধির কবল থেকে বাঁচার জন্য শাস্ত্রে সতর্কবাণী আছে। বিভিন্ন পূজা-পার্বণ ও দেবতা বা মনীষিদের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ধর্মীয় আলোচনা ও সভা সেমিনারগুলোতে কীভাবে সৎ ও সুন্দর জীবন যাপনের মাধ্যমে যুবসমাজে ঐওঠ প্রতিরোধ ঐওঠ সম্পর্কে ভুল ধারণা, কুসংস্কার দূর করতে ধর্মীয়বিধি বিধানের আলোকে ধর্মীয় প-িতগণকে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে আরও দৃঢ়প্রত্যয়ী হতে হবে।
পবিত্র বাইবেল আলোকে সুস্থ ও পরিচ্ছন্ন জীবন যাপন
পবিত্র বাইবেলের প্রাচীনসন্ধি ও নবসন্ধিতে মানুষের যৌনজীবনের পবিত্রতা ও নৈতিকতা শিক্ষা ও মনোভাব উল্লেখ করা হয়েছে। নবসন্ধিতে জোর আহ্বান করে বলা হয়েছে, তোমরা অনৈতিকতা থেকে দূরে থাক (১ করি ৬ঃ১৮ মঙ্গলবাণী প্রচারত সাধু পৌল বলেছেন- ব্যভিচার, অশ্লীলতা, উচ্ছৃঙ্খলতা মানুষের নিম্নতর স্বভাবের কাজ (গালাতিয় ৫ঃ১৯)। সর্বোপরি পরমেশ্বর ব্যভিচারী আর দুঃশ্চরিত্র মানুষের বিচার করবেনই (হিব্রু১৩ঃ৪)। ঈশ্বর প্রদত্ত মানব জীবনযাত্রা ও মানব জীবাচরণের ব্যবস্থাপত্রটি ঐওঠ ও অওউঝ থেকে রক্ষা পাবার জন্য উপায়। এ প্রসঙ্গে বাইবেলের আরেকটি শিক্ষা উল্লেখযোগ্য “সমকামিতা গুরুতর একটি অনৈতিক কাজ (আদিপস্তক ১৯ঃ১-২৯, রোমীয় ১ঃ২৪-২৭ঃ১, করি ৬ঃ৯-১০, তিমথি ১ঃ১০।
নিরাপদ যৌনচর্চা সম্পর্কিত বিষয়গুরো ঙৎরঃবহঃধঃরড়হ, খরহশধমব, ঈড়ষধনড়ৎধঃরড়হ, ঘবঃড়িৎশরহম এবং অফাড়পধপু এর মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। জেলা এবং উপজেলাগুলোতে নিয়মিত বুকলেট, পামলেট, ব্রুশিয়ার বিলি করে এবং গম্ভীরা ও গণসচেতনতামূলক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ঐওঠ ও অওউঝ প্রতিরোধ কৌশল সম্পর্কে ব্যাপক জনমত সৃষ্টি করতে হবে। কাউন্সিলর, সমাজকর্মী, মনোবিজ্ঞানী এবং চিকাৎসা মনোবিজ্ঞানীদের এইচআইভি ও এইডস সম্পর্কিত উন্নততর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হবে, প্রয়োজনে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশগামী হয়ে দেশে এসে আক্রান্তদের সেবা দিতে হবে।
উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠি যথা সুঁইয়ের মাধ্যম মাদক ব্যবহারকারী, নারী ও পুরুষ যৌনকর্মী এবং হিঁজরা জনগোষ্ঠির জন্য সারাদেশে সমন্বিত কার্যক্রমের ধারা আরও একধাপ এগিয়ে নেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দিয়ে তাদেরকে কার্যকরী ভূমিকা পালনের নিমিত্তে উপযুক্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত করতে হবে। এতে ঐওঠ মাত্রা অনেকাংশে কমে যাবে। খেয়াল রাখতে হবে, ঐওঠ আক্রান্তরা বিনামূল্যে চিকিৎসা এন্টি রেট্রোভাইরাল ড্রাগস (অজঠ) যথাযথভাবে পাচ্ছে কিনা, তাদের সেবাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়কারীদের নিয়ে জরুরি আলোচনা সভা করতে হবে।
সর্বোপরি দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে যুববান্ধক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি করে তার মান বাড়াতে সামাজিকভাবে জোর প্রচেষ্ট চালিয়ে যেতে হবে। দেশের একমাত্র সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে এইচআইভি চিকিৎসা সেবার মান উত্তরোত্তর বাড়াতে হবে এবং অতিরিক্ত হাসপাতাল দ্রুত তৈরিকরণে স্বতঃস্ফুর্তভাবে নীতিনির্ধারক পর্যায়ে যোগাযোগ, ব্যাপক প্রচারণা ও জনমত গ্রহণে ধৈর্য্য সহকারে সামাজিক আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে।
লেখক: নির্বাহী পরিচালক, আসক্ত পূনর্বাসন সংস্থা (আপস),