একই কবরে ঘুমিয়ে আছেন তিন শহিদ মেলে নি মুক্তিযোদ্ধার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি

আপডেট: এপ্রিল ১৩, ২০১৭, ১:০৩ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক


১৯৭১ সালের ১৪ এপ্রিল মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনীর গুলিতে রাজশাহীর টিবি হাসপাতালের কোয়াটারে শহীদ হন আবদুল বারী হাওলাদার, শহীদ আবদুল কাইয়ুম, শহীদ মোহাম্মদ সেলিম। ওই দিন টিবি হাসপাতালের কর্মরত অবস্থায় আবদুল বারী হাওলাদার সহ অফিস শেষে বাসায় আসার পরপরই পাক হানাদার বাহিনী ৬ জনকে গুলি করে মারে। এরমধ্যে তিনজন আবদুল বারী হাওলাদার, আবদুল কাইয়ুম ও মো. সেলিম শহীন এবং হবিবুর রহমান, আবুল ফজল ও মাহমুদ হোসেন বাদল আহত হয় ও পঙ্গুত্ব বরণ করেন। সাতদিন পর নার্সেস হোস্টেলের পূর্ব পাশে একই কবরে শহীদ তিনজনকে দাফন করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের ৩৭ বছর ১৯৯৭ সালে রাজশাহীর টিবি হাসপাতালের উদ্যোগে তিন শহিদের করব পাকা করে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। এ গণ কবরটি অবহেলা ও অযত্নে গাছপালা দিয়ে ভরে গেছে দেখার যেন কেউ নেই। এ পর্যন্ত সরকারি ভাবে কোন উদ্যোগ নেয়া হয় নি। ছবির ইনসেটে আবদুল বাড়ি হাওলাদার- সোনার দেশ

নগরীর বক্ষব্যাধি হাসপাতালের আবাসিক এলাকার একটি কবরে ঘুমিয়ে আছেন মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী তিন শহিদ। সরকারি চাকরি করেও নিজেদের আবাসিক কোয়ার্টারে গোলাবারুদ রেখে মুক্তিযোদ্ধাদের সরবরাহ করার দায়ে ১৯৭১ সালের ১৪ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনারা তাদের গুলি করে হত্যা করে। এর পাঁচদিন পর তাদের গলিত লাশ উদ্ধার করে একই কবরে মাটি চাপা দেয়া হয়। স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা এই তিন শহিদ।
মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পরপরই ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ দুপুরে পাকিস্তানি সৈন্যদের অতর্কিত হামলায় শহিদ হন রাজশাহী পুলিশ লাইনে কর্মরত ৭২জন পুলিশ সদস্য। পাকিস্তানি সৈন্যদের এই হামলার পর শহর দখলে নিয়ে রাজশাহী ক্যান্টনমেন্টকে লক্ষ্য করে আক্রমণ শুরু করে এ অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধারা। সরকারি চাকরি করেও সেই সময় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিজেদের আবাসিক কোয়ার্টারে গোলাবারুদ মজুদ রেখে মুক্তিযোদ্ধাদের সরবরাহ করতেন রাজশাহী বক্ষব্যাধি হাসপাতালের কর্মচারি আব্দুল বারী হাওলাদার, আব্দুল কাইয়ুম ও আব্দুল হাকিম। ১৪ এপ্রিল দুপুরে পাকিস্তানি সেনারা বক্ষব্যাধি হাসপাতালের আবাসিক কোয়ার্টারে অতর্কিত হামলা চালালে বারী ও কাইয়ুমের সাথে শহিদ হন হাকিমের ছোট ভাই মোহাম্মদ সেলিম। গুলিবিদ্ধ হয়েও বেঁচে যান বারীর ছেলে রাজশাহী মুসলিম হাইস্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র মাহমুদ হোসেন বাদল। নগরীর বহরমপুর এলাকার মডার্ন ট্রেডিং এজেন্সির স্বত্বাধিকারী মতিউর রহমানও ভাগ্যগুনে বেঁচে যান সেদিন। বাবা জসিম উদ্দিন সরকারের চাকরির সুবাদে ওই কোয়ার্টারে থাকতেন রাজশাহী মুসলিম হাইস্কুলের তখনকার সপ্তম শ্রেণির ছাত্র মতিউর রহমান।
মুক্তিযুদ্ধের বর্ণনা দিতে গিয়ে মতিউর রহমান বলেন, মুক্তিযোদ্ধা ইপিআর সদস্যরা রাজশাহী ক্যান্টনমেন্টকে লক্ষ্য করে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। বহরমপুর এলাকার মাওলানা আকরাম হোসেনের বাড়িতে তারা বাংকার খুঁড়ে হেভি মেশিনগান স্থাপন করেন। সেই মেশিনগানের গুলি বক্ষব্যাধি হাসপাতালে আবাসিক কোয়ার্টারে মজুদ করে রাখতেন হাসপাতালের স্টুয়ার্ড আব্দুল বারী হাওলাদার, সিকিউরিটি গার্ড আব্দুল কাইয়ুম ও আব্দুল হাকিম। সেই গুলি তারা সরবরাহ করতেন মাওলানা আকরাম হোসেনের বাড়িতে অবস্থান নেয়া ইপিআর সদস্যদের। ইপিআর সদস্যরা রাজশাহী ক্যান্টনমেন্ট লক্ষ্য করে হেভি মেশিনগান থেকে গুলি চালাতেন।
রাজশাহী শহরের আরও কয়েকটি এলাকা থেকে ক্যান্টনমেন্ট লক্ষ্য করে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করেন মুক্তিযোদ্ধারা। ১৪ এপ্রিলের আগে ক্যান্টনমেন্ট থেকে পাকিস্তানি সৈন্যদের গুলিতে মাওলানা আকরাম হোসেনের বাড়ির বাংকারে গুলিবিদ্ধ হন লক্ষ্মীপুর এলাকার মোসলেম উদ্দিনের ছেলে আবুল কাশেম মনু। মতিউর রহমানের সহপাঠি ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই মনু মারা যান। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধে অনেকটাই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে রাজশাহী ক্যান্টনমেন্টের পাকিস্তানি সৈন্যরা। তাদের সাহায্যে গোলাবারুদ ও ভারী যুদ্ধ সরঞ্জাম নিয়ে ঢাকা থেকে চলে আসে আরো পাকিস্তানি সেনা। ১৪ এপ্রিল রাজশাহী শহরের কয়েকটি এলাকার মতো তারা হামলা চালায় বক্ষব্যাধি হাসপাতালে আবাসিক কোয়ার্টারে।
সেদিনের বর্ণনা দিয়ে গিয়ে মতিউর রহমান বলেন, তখন দুপুর। কোয়ার্টারের কেউ কেউ দুপুরের খাবার খেয়েছেন। কেউ খাননি। জোহরের নামাজ শেষে তসবিহ জপছিলেন আব্দুল বারী হাওলাদার। এসময় পাকিস্তানি সেনারা চলে আসে কোয়ার্টারে। তখনও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য মজুদ রাখা গোলাবারুদ কোয়ার্টারের কয়েকটি কক্ষের বিছানার নিচে। পাকিস্তানি সেনারা কোয়ার্টারে ঢুকেই দরোজার পাশ থেকে প্রথমে গুলি করে আব্দুল বারী হাওলাদারদের রুমে। বারীর শরীরে অনেক গুলি লাগে। ঘটনাস্থলেই মারা যান তিনি। ওই রুমে পেটে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান আব্দুল কাইয়ুম। পায়ে গুলি লাগে হাসপাতালের বাবুর্চি হাবিবুর রহমানের। এরপর পাকিস্তানি সেনারা উল্টো পাশের রুমের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে গুলি করেন। দরজার পাশের দেয়ালে আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিলেন মতিউর রহমান। তার চোখের সামনেই পেটে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান হাকিমের ছোট ভাই মোহাম্মদ সেলিম। গলা ও পিঠে গুলিবিদ্ধ হন বারী হাওলাদারের ছেলে মাহমুদ হোসেন বাদল। হাসপাতালের বাবুর্চি ফজলুর রহমান হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। আহতদের ভর্তি করা হয় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
মাহমুদ হোসেন বাদলের সহপাঠি ফায়ার সার্ভিসের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী রেজাউল করিম বলেন, এ ঘটনার ৪/৫ দিন পর ভারত থেকে এসে দেখি বক্ষব্যাধি হাসপাতালের আবাসিক কোয়ার্টারে তিন জনের লাশ ফুলে গেছে। শুকিয়ে গেছে জমাটবাধা রক্ত। দেখি কোদাল নিয়ে তিনজন লোক আসছেন। তাদের সহযোগিতা নিয়ে কোয়ার্টারের পাশে একটি কবর খুঁড়ে তিনজনকে একই কবরে মাটিচাপা দিলাম।
মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী এই তিন শহিদের মধ্যে আব্দুল বারী হাওলাদারের বাড়ি ঢাকায়। অন্য দুজনের বাড়ি কিশোরগঞ্জে। তাদের পরিবারের সদস্যরা কে কোথায় আছে, তা জানে না রাজশাহীর কেউ। তবে শহিদ আব্দুল বারী হাওলাদারের পরিবারের সদস্যদের সাথে যোগাযোগ আছে রেজাউল করিম ও মতিউর রহমানের। তারা জানান, ১৯৯৭ সালে শহিদ বারী হাওলাদারের ছেলে ব্যবসায়ী মাহমুদ হোসেন বাদল ও দৈনিক সকালের খবরের প্রধান ফটোসাংবাদিক বুলবুল আহমেদের উদ্যোগে তিন শহিদের কবরকে শনাক্ত করে তা পাকা করা হয়।
যে হাসপাতালের কর্মচারি ও কর্মচারির পরিবারের সদস্য ছিলেন এই তিন শহিদ, সেই বক্ষব্যাধি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও বিস্তারিত জানে না এই শহিদদের সর্ম্পকে। তবে হাসপাতালের বর্তমান তত্বাবধায়ক ডা. আমির হোসেন বলেন, আব্দুল বারী হাওলাদার, আব্দুল কাইয়ুম ও মোহাম্মদ সেলিম যেন শহিদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায় সেজন্য যা যা করণীয় তা তিনি করবেন।
শহিদ বারী হাওলাদারের ছেলেরা প্রতি বছরের ১৪ এপ্রিল রাজশাহীতে এসে জিয়ারত করে যান বাবার কবর। তবে এই তিন শহিদের পরিবার যেখানেই থাক, তারা যেনো রাষ্ট্রীয়ভাবে শহিদের স্বীকৃতিটুকু পান, এই প্রত্যাশা ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী মতিউর রহমান ও রেজাউল করিমের। তারা বলেন, পাকিস্তানি সেনারা নির্মমভাবে গুলি করে তিনজনকে হত্যা করেছে। তাদের অপরাধ ছিলো, তারা নিজেদের আবাসিক কোয়ার্টারে গুলি মজুদ রেখে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করতেন। এখন সরকার যদি তাদের শহিদের স্বীকৃতিটুকু দেয়, তাহলে তাদের বিদেহী আত্মা শান্তি পাবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ