একই পরিবারের ১১ রোহিঙ্গাকে গুলি করে হত্যা, লাশ পুড়িয়ে নিশ্চিহ্ন

আপডেট: সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৭, ১:১৪ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


‘তখন সকাল ৯টা কী সাড়ে ৯টা।আমরা বাড়িঘর ছেড়ে চলে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছি। এমন সময় মিয়ানমার সেনাবাহিনী এসে আমাদের বাড়ি ঘেরাও করে। আমরা পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করছিলাম। তারা এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে শুরু করে। তাদের গুলিতে সেখানে আমাদের পরিবারের ১১ জন সদস্য মারা যান। লাশগুলো টেনে ঘরের ভেতরে নিয়ে যায় সেনারা। এরপর ঘরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে লাশগুলো নিশ্চিহ্ন করে দেয়।’
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সহিংসতার এমন বীভৎস বর্ণনা দিলেন গুলিবিদ্ধ হয়ে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হওয়া জাফর আলম।
জাফর মিয়ানমারের মংডু এলাকার তুলাতুলি গ্রামের গুড়া মিয়ার ছেলে। গত ৫ সেপ্টেম্বর তিনি চমেক হাসপাতালের ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি হন।
তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা সাত ভাই ও এক বোন। সবাই একত্রে থাকি। আমাদের পরিবারে মোট ২৪ জন সদস্য ছিলেন। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর গুলিতে মা, দুই ভাইসহ পরিবারের ১১ সদস্যকে হারিয়েছি।’
নিহতদের মধ্যে রয়েছেন জাফর আলমের মা ফরিদা বেগম (৬০), তার মেঝো ভাই নূরুল আমিন (৩৫), সেজো ভাই খায়রুল আমিন (৩২), নূরুল আমিনের স্ত্রী খুরশিদা (৩০), তার মেয়ে ইয়াসমিন (১২), ছেলে মুরতাজা (১০), আরকান উল্লাহ (৫), এহসান উল্লাহ (২), বরকত উল্লাহ (তিন মাস)। জাফর আলমের বড় ভাই সৈয়দ হোসেনের ছেলে জামাল হোসেন (১৬) ও জান্নাত উল্লাহ (৬)।
গুলিবিদ্ধ জাফর আলম বলেন, ‘মিয়ানমার সেনারা গুলি ছুড়ে তাদের হত্যা করেই ক্ষান্ত হননি। তারা লাশগুলো টেনে ঘরের ভেতরে নিয়ে যায়। তারপর ঘরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়।’
লাশগুলো যে পুড়িয়ে দেওয়া হয় সেটি কিভাবে জানলেন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমার বাবা নিজের চোখে দেখেছেন। আর্মিরা বাড়ি ঘেরাও করলে তিনি পাশের ধান ক্ষেতে গিয়ে লুকিয়ে ছিলেন। আর্মিরা চলে যাওয়ার পর তিনি বাড়িতে গিয়ে এ বীভৎস দৃশ্য দেখতে পান।’
তিনি আরও বলেন, ‘সন্ধ্যা পর্যন্ত আমার বাবা ধান ক্ষেতে লুকিয়ে ছিলেন। পরে ওই দিন রাতেই বেঁচে থাকা পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে সীমান্তে চলে আসেন। পরদিন সকালে তারা টেকনাফের ক্যাম্পে গিয়ে ওঠেন। এখন তারা ওই ক্যাম্পেই অবস্থান করছেন।’
আপনি কিভাবে চলে আসলেন জানতে চাইলে জাফর আলম বলেন, ‘আর্মিরা এলোপাতাড়ি গুলি করে। আমি গুলি খেয়ে পালিয়ে যাই। পরে দৌড়ে খালের পাড়ে আসলে সেখান থেকে নৌকায় করে আমাকে এ পাড়ে নিয়ে আসা হয়। এখানে এসে প্রথমে এমএসএফ হাসপাতালে চিকিৎসা নিই। পরে ওই হাসপাতাল থেকে আমাকে এখানে পাঠানো হয়।’
জাফর আলমের সঙ্গে হাসপাতালে অ্যাটেনডেন্ট হিসেবে আছেন তার ছোট ভাই মোহাম্মদ রহমতুল্লাহ।
তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সহিংসতার সময় আমি চট্টগ্রামে ছিলাম। আমাদের আরেক ভাই মালয়েশিয়ায় আছেন। তিনি ২০১২ সালে নৌকায় করে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান। আমরা দু’জন ছাড়া বাকি সবাই এখনও আতঙ্কে আছেন। চোখের সামনে পরিবারের সদস্যদের হত্যার দৃশ্য দেখে বাবা ভেঙে পড়েছেন। তার মানসিক অবস্থা খুবই খারাপ।’
তথ্যসূত্র: বাংলা ট্রিবিউন