একজন মায়ের মনের জোর আর স্বাভাবিক প্রসবের গল্প

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২২, ২:৩৮ অপরাহ্ণ


সোনার দেশ ডেস্ক :


শারীরিক কিছু জটিলতার কারণে চিকিৎসক অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে মায়ের পরামর্শে মনোবল না হারিয়ে স্বাভাবিক প্রসবেই দ্বিতীয় সন্তানকে পৃথিবীতে এনেছিলেন ওয়ার্দা আশরাফ।

সেইভ দ্যা চিলড্রেন ইন বাংলাদেশের ডেপুটি ম্যানেজার ওয়ার্দা আশরাফের ভাষায়, স্বাভাবিক প্রক্রিয়াই ‘সুন্দর’। এমন নয় যে এখন আর স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সন্তানের জন্ম দেন না কোনো মা। কিন্তু সি সেকশন বা সিজারের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের প্রবণতা যে হারে বেড়েছে, তাতে উদ্বেগ রয়েছে খোদ নীতি নির্ধারকদের মধ্যেও।

সাধারণ নিয়ম হল, প্রসূতির শারীরিক জটিলতা দেখা দিলে মা ও সন্তানের জীবনের নিরাপত্তার স্বার্থে অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেবেন চিকিৎসকরা।

কিন্তু কিছু চিকিৎসক ও হাসপাতালের অতিরিক্ত ব্যবসা করার মানসিকতার কারণে বিনা প্রয়োজনে সি সেকশনের পরামর্শ দেওয়া হয় বলে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে।

আবার সি-সেকশনের কারণে গর্ভাশয়ের ক্ষতি, অস্বাভাবিক প্ল্যাসেন্টেশন, এক্টোপিক গর্ভাবস্থা, ভ্রূণের মৃত্যু, সময়ের আগে মিশুর জন্মের মত ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। পাশাপাশি শিশুর হরমোন, শারীরিক ও অন্যান্য বিকাশের উপর প্রভাব ফেলতে পারে এ অস্ত্রোপচার।

জরুরি কারণ ছাড়া সিজারে না যাওয়ার বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে কয়েকটি সংস্থার সমন্বয়ে গড়ে ওঠে – স্টপ আননেসেসারি সি-সেকশন নামে একটি প্রচারাভিযান সক্রিয় রয়েছে বেশ কয়েক বচর ধরে। ওয়ার্দা আশরাফের অভিজ্ঞতা নিয়ে ফেইসবুকে একটি ভিডিও প্রকাশ করে তারা।

এ ক্যাম্পেইনের এক্সিকিউটিভ তেহরিম চৌধুরী আরিবা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ডে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শিশু প্রসব ১৫ শতাংশের মধ্যে রাখার কথা বলা হলেও বাংলাদেশে তা অনেক বেশি।

২০১৭-২০১৮ সালের বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভের তথ্য অনুযায়ী দেশে মোট শিশু প্রসবের এক-তৃতীয়াংশ তখন সি-সেকশনে হত।

সরকারি এই জরিপ বলছে, সি-সেকশন প্রসবের হার ২০০৭ সালে ৮ শতাংশ, ২০১৪ সালে ২৩ শতাংশ এবং ২০১৭ সালে ৩৩ শতাংশ বেড়ে যায়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহেদ মালেক ২০১৭ সালে সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হাসপাতালগুলোতে ২০ থেকে ২৫ শতাংশের বেশি সিজার হয় না, কোনো ক্ষেত্রে এর থেকে কম। প্রাইভেট সেক্টরে ৫০ শতাংশের বেশি সিজার হয়ে থাকে।

সেইভ দ্য চিলড্রেনের বরাতে বিবিসি এক প্রতিবেদনে জানায়, ২০১৮ সালেই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান জন্মদানে বাবা-মায়ের খরচ হয়েছিল চার কোটি টাকার বেশি। পরিবারপ্রতি ধরলে গড়ে তা ৫১ হাজার টাকার মত। অথচ ওই বছর যত সি সেকশন হয়েছে, তার ৭৭ শতাংশই ছিল ‘অপ্রয়োজনে’।

বিষয়টি আদালতেও গড়িয়েছিল। এক রিট মামলার প্রেক্ষিতে হাই কোর্ট অপ্রয়োজনে সি সেকশন বন্ধে একটি নীতিমালা তৈরির নির্দেশ দিয়েছিল।
কীভাবে সিদ্ধান্ত নিলেন ওয়ার্দা আশরাফ?

কথিত আছে, খ্রিস্টের জন্মেরও বহু আগে প্রাচীন রোমের অধীশ্বর জুলিয়াস সিজারকে মা আউরেলিয়ার পেট কেটে বের করা হয়েছিলো। আর সে জন্যই স্বাভাবিক প্রসবের ব্যতিক্রম এই পদ্ধতিকে বলা হয় ‘সিজারিয়ান’, সেই সঙ্গে এ পদ্ধতিতে জন্ম নেওয়া শিশুদের বলা হয় ‘সিজারিয়ান বেবি’।

ওয়ার্দা আশরাফের প্রথম সন্তানের জন্ম হয়েছিল ২০১৩ সালে। কোনো রকম জটিলতা ছাড়াই কন্যা সন্তানের স্বাভাবিক প্রসব হয় এক বেসরকারি হাসপাতালে।

যদিও হাসপাতালে প্রসবের জন্য গেলে সি-সেকশন করাতে নানাভাবে ’চাপ’ দেওয়ার কথা অনেকের কাছ থেকেই শোনা ছিল ওয়ার্দা আশরাফের।

বিষয়টি নিয়ে তিনি বলেন, “প্রাইভেট হাসপাতালগুলো নানাভাবে চেষ্টা করে সিজার করাতে। এগুলো শুনে আমি খুব অভ্যস্ত।

“আমার কাজিনদের কাছে, কাছের অনেক মানুষের কাছে শুনেছি… ডাক্তারের কাছে গিয়েছিল, তেমন কোনো মেজর সমস্যা নেই। হয়ত হিমোগ্লোবিন একটু কম বা পার্শিয়াল প্রিভিয়া আছে, তো বলে যে দেখেন সি-সেকশন করবেন কি না।

কারণ পরে কিন্তু কোনো সমস্যা হলে আমরা দায়িত্ব নিতে পারব না। এমন করে ভয় দেখিয়ে দেয়।”
তবে ডাক্তার পরিচিত হওয়ায় প্রথম সন্তান প্রসবে এমন বিরূপ অভিজ্ঞতার মুখে পড়তে হয়নি ৩৩ বছর বয়সী এই মাকে।

“প্রথম সন্তানের সময় আমি যে চিকিৎসকের কাছে গিয়েছিলাম তিনি আমার মায়ের সাবেক সহকর্মী। সে কারণে তারা আমাকে সিজার করানো নিয়ে কিছু বলেননি। আমার কোনো সমস্যাও ছিল না।“

ওয়ার্দা আশরাফের প্রথম সন্তান মেয়ে। আর পরেরটি ছেলে সন্তান। দ্বিতীয় সন্তান জন্ম নেয় ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে। কিন্তু এবার তা বিনা জটিলতায় হয়নি।

“দ্বিতীয় সন্তান গর্ভে আসার পর আমার পার্শিয়াল প্ল্যাসেন্টা প্রিভিয়া দেখা দেয়। এটাকে বলে ফুল; যার মাধ্যমে গর্ভে সন্তান পুষ্টি পায়। তো ফুলটা আমার প্রসবের রাস্তা অর্ধেক কাভার করেছিল। ফুলটা যদি উপরের দিকে না থাকে তাহলে একটু রিস্কি। আমার বেলায় ফুলটা নিচের দিকে ছিল।

প্রসবের আগে এটা আলট্রাসনোগ্রাম করে দেখতে হয়।”
ওয়ার্দা বলেন, “অনেকের ক্ষেত্রে এই সমস্যা প্রথমে দেখা দিলেও পরে ঠিক হয়ে যায়; কারণ বাচ্চা যে থলিতে থাকে সেটা তো মুভ করে। তারা (চিকিৎসক) প্রথমে আমাকে সি-সেকশনেরই পরামর্শ দিয়েছিল। কিন্তু আমি রাজি হইনি। আমি বলেছিলাম, এটা তো পরে চেইঞ্জ হয়ে যেতে পারে।“

কর্মজীবী এই মায়ের মতে, সাধারণ মানুষ যেহেতু বিষয়গুলো সম্পর্কে খুব ভালো জানে না, ডাক্তার যেখন সি-সেকশনের কথা বলে, তাদের না মেনে উপায় থাকে না। আবার মায়েদের অনেকের একটা ভীতিও থাকে ‘নরমাল ডেলিভারি’ নিয়ে। অনেকেই ভাবেন, তিনি পারবেন কি না।

দ্বিতীয় সন্তান প্রসবের সময় ঘনিয়ে আসার মুহূর্তে যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন সেখানে ‘অবহেলার’ কথাও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন ওয়ার্দা আশরাফ।
“আমার লেবার পেইন উঠেছিল রাত ১০টার দিকে। বেসরকারি হাসপাতালের যাকে দেখাচ্ছিলাম তাকে ফোন করে বললাম যে, এটা কি ফলস পেইন কি না বুঝতে পারছি না। তিনি নিজে বা ডিউটি ডাক্তারকে বলে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে আমাকে বললেন কাছের কোনো হাসপাতালে চলে যেতে। কতটা রেসপনসিবিলিটির অভাব।”

“পরে রাতে আমরা হাসপাতালে গেলে সেখানে কেউ আমার দিকে কোনো খেয়াল করেনি।কাফরুল এলাকার ওই হাসপাতালে ডাক্তার ও আল্ট্রাসোনো করার কেউ ছিল না। বাধ্য হয়ে পরে রাত ১২টার দিকে আরেকটা হাসপাতালের জন্য বার হতে হয়। রাত ১টার দিকে অন্য হাসপাতালে পৌঁছাই; রাত দেড়টার দিকে আমার বেবি ডেলিভারি হয়।”
এরপরও সি-সেকশন এড়িয়ে স্বাভাবিক প্রসব করা গেল?

ওয়ার্দা আশরাফ বলেন, “এমন পরিস্থিতিতে কেউ আর ঝুঁকি নিতে চায় না। তাই অস্ত্রোপচারের জন্য অনেকটা রাজিও হয়ে গিয়েছিলাম। তবে ডাক্তার বলার পরেও নিজের মনের জোর এবং মায়ের সাহসে অস্ত্রোপচারের পরিবর্তে প্রাকৃতিক উপায়েই সন্তান জন্ম দিই।”

নিজের এই অভিজ্ঞতা থেকে ওয়ার্দা আশরাফের উপলব্ধি, “সাধারণ ডেলিভারিতে সন্তান জন্মদানে অনেকটা সময় ব্যয় হয়। ডাক্তারকে বেশি সময় ডিউটিতে থাকতে হবে, আয় কম ইত্যাদি সব কিছু মিলিয়ে হয়ত ডাক্তার বা হাসপাতাল থেকে সাধারণ ডেলিভারির চেয়ে সিজার করানোকে বেশি উৎসাহিত করা হয়।”

সচেতন থাকলে ডাক্তারের সঙ্গে খোলামেলা আলাপ করে অপ্রয়োজনীয় সি-সেকশন এড়ানো যেতে পারে বলে মনে করেন সেইভ দ্য চিলড্রেন ইন বাংলাদেশের কর্মকর্তা ওয়ার্দা আশরাফ।

তিনি বলেন, “আমার মা ডাক্তার হওয়ায় আমি মনে জোর পেয়েছিলাম। কিন্তু সবার পরিবারে ডাক্তার থাকবে না। তাই নিজেকেই সচেতন হতে হবে।

“বিভিন্ন সংস্থা নারীদের স্বাস্থ্য, গর্ভাবস্থা, প্রসব ব্যবস্থা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কাজ করছে। তাদের সঙ্গে সামাজিক মাধ্যমে সংযুক্ত থাকা, তাদের আয়োজিত ওয়ার্কশপগুলোতে যোগ দিয়ে অথবা ইন্টারনেট ব্যবহার করেও নিজের স্বাস্থ্য ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়া সম্ভব।“

‘স্টপ আননেসেসারি সি-সেকশন’ এর তেহরিম চৌধুরী আরিবা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “২০১৭ সালে আমরা বেশ কয়েকটি সংস্থার সাথে মিলে সি-সেকশন প্রসব প্রোমোট না করার ক্যাম্পেইনটা চালু করি।

আমরা পলিসি ডায়লগ করেছি বিভিন্ন শ্রেণি, সংস্থা, চিকিৎসক, সাংবাদিক ও সরকারের সাথেও।“
কী করা উচিত?
দু’বার স্বাভাবিক প্রসবে মা হওয়া ওয়ার্দা আশরাফ বলেন, “আমি সন্তান পেটে থাকাকালে খাওয়া-দাওয়া ডাক্তারের পরামর্শ মেনে করেছি। ওই সময় আমি অফিসও করতাম। গর্ভকালে আমি হাঁটতামও।

“শহরে জীবনে আমরা তো একটু ইনঅ্যাকটিভ। তো এ সময় হাঁটলে যেটা হয় পেশি বেশ ফ্লেক্সিবল থাকে। নরমাল ডেলিভারির জন্য শারীরিকভাবে ফ্লেক্সিবল থাকাটা খুব দরকারি।“

এরপরও অনেক ক্ষেত্রে সন্তান জন্মদানে স্বাস্থ্য জটিলতা দেখা দিতে পারে। আর সেসব ক্ষেত্রে সি-সেকশন এড়ানোর সুযোগ নেই বলেই মনে করেন ওয়ার্দা আশরাফ।
“তবে সেটা যেন অকারণে করা না হয় সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে হবে।

বাংলাদেশে অপ্রয়োজনীয় সি-সেকশনের খরচ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের তুলনায় অনেক বেশি। পরিবারের পাশাপাশি সরকার, সংস্থা ও এনজিওগুলো যদি এক্ষেত্রে সচেষ্ট ভূমিকা রাখে তাহলে হয়ত ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া যাবে।”

তার ভাষ্যে, প্রসূতির প্রতি পরিবার তো বটেই, হাসপাতালেও সবার যতœশীল হওয়া জরুরি।
‘ডেলিভারির সময় ভালো ব্যবহার যেমন নারীর মনোবল বাড়াতে অনেক সাহায্য করে, একইভাবে খারাপ আচরণ রোগীর জন্য অনেক বেশি ক্ষতিকারক হয়। কেবল চিকিৎসা নয়, ভালো ব্যবহারের মাধ্যমে প্রসূতির মনোবল বাড়াতেও চিকিৎসক ও নার্সদের সচেষ্ট থাকা প্রয়োজন।

কর্মজীবী এই নারী মনে করেন, গর্ভবতী নারীর প্রসব পরবর্তী জীবনের সুস্থতার কথা ভেবে স্বাভাবিক প্রসব পদ্ধতি ‘মানবিকভাবে’ দেখা দরকার।- বিডিনিউজ