একজন মুক্তিযোদ্ধার যুদ্ধকথা

আপডেট: July 21, 2020, 12:06 am

সাইফুদ্দীন চৌধুরী


একজন খ্যাতিমান ইংরেজ ঐতিহাসিক বলেছেন, প্রতিটি মানুষের জীবনেই কিছু না কিছু অভিজ্ঞতা থাকে, যা কোনো এক সময় ইতিহাস রচনায় কাজে লেগে যায়। তিনি বলতে চেয়েছেন, অনেক দেশ-ভূ-খণ্ডের সামগ্রিক ইতিহাস পুনর্গঠনেও সে অভিজ্ঞতা ব্যবহৃত হতে পারে।
মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী কামালের ‘১৯৭১- আমার মুক্তিযুদ্ধ’ বইটি পড়তে পড়তে আমার মনে হয়েছে, মহান মুক্তিযুদ্ধের বেশ কিছু আলোচিত ও অনালোচিত ঘটনা লোকচক্ষুর আড়ালে রয়ে গেছে।
আমাদের দেশের কোনো কোনো গবেষক মনে করেন, আমাদের মহান ভাষা আন্দোলন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন, আরও তথ্যের প্রয়োজন রয়েছে।
মোহাম্মদ আলী কামালের ‘১৯৭১- আমার মুক্তি যুদ্ধ’ বইটি পড়ে আমারও মনে হয়েছে, কামাল এমন কিছু অজানা কথা বলেছেন বইয়ে যা অন্তত আমি আগে কোথাও পড়িনি বা চোখে পড়েনি।
মহান মুক্তিযদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণের গৌরব অর্জনের সুযোগ হয়নি আমার। আমার পিতৃব্য আবদুল্লাহ আল মাহমুদ চৌধুরী পশ্চিম দিনাজপুরের বালুরঘাট থেকে ‘সংগ্রামী স্বাধীন বাংলা’ নামে একখানি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। উল্লেখ্য, ওই পত্রিকার প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন জাতীয় নেতা শহিদ এএইচএম কামারুজ্জামান পত্নী শ্রদ্ধেয়া (মরহুম) জাহানারা জামান এবং প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন নওগাঁর প্রয়াত মন্ত্রী আবদুল জলিল। আগস্ট এবং সেপ্টেম্বর’ ৭১ পর্যন্ত আমি এবং মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীসের সম্পর্কের এক আত্মীয় ওই পত্রিকায় নিয়মিত সংবাদ (মুক্তাঞ্চলের) পাঠাতাম। সংগ্রামী স্বাধীন বাংলা পত্রিকা কিছু অংশ বিশিষ্ট কবি ও গবেষক ড. তসিকুল ইসলাম রাজার সংগ্রহে রয়েছে। উল্লেখ্য, আমার পিতৃব্য আবদুল্লাহ আল মাহামুদ চৌধুরী রাজশাহী প্রেসক্লাবে একসময় সেক্রেটারি ছিলেন।
তবে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সামান্য কিছু কাজ করার অভিজ্ঞতার সূত্রেই গভীর অভিনিবেশ সহকারে আমি মোহাম্মদ আলী কামালের বইখানি পাঠ করি। এ আলোচনা বইখানি সম্পর্কে কোনো তাত্ত্বিক আলোচনা নয়। আমার মতো সাধারণ পাঠকেরাও বইটির প্রতি আগ্রহী হনÑ সেই উদ্দেশ্যেই আমার এই ক্ষুদ্র নিবন্ধ।
মোহাম্মদ আলী কামালের ‘১৯৭১- আমার মুক্তিযুদ্ধ’ বইয়ের প্রকাশকাল ১৯৭১ এর ডিসেম্বর। ২৪২ পৃষ্ঠার এই বই উৎসর্গ করা হয়েছে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ও শহিদ মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে।
প্রায় এক ফর্মার গুরুত্ববহ সব আলোকচিত্র বইয়ের গৌরব বৃদ্ধি করেছে।
মুক্তিযোদ্ধা হতে হলে দেশ-প্রেম থাকতে হয়। মোহাম্মদ আলী কামাল আকস্মিকভাবে মুক্তিযোদ্ধা হয়ে উঠেন নিÑ অনেকখানি পথ পেরুতে হয়েছে তাঁকে। ছাত্র জীবন থেকেই যুক্ত হয়েছিলেন রাজনীতির সঙ্গে। অংশ নিয়েছেন ৬২‘র বিতর্কিত শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বাতিল আন্দোলনে, বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলনের মিছিলে, দিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নেতৃত্বে। প্রধান প্রচারকের ভূমিকা রেখেছিলেন ১৯৬৯ সালের এপ্রিল মাসে বঙ্গবন্ধুর রাজশাহী সফরকালে। মোহাম্মদ আলী কামাল তার জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জনের কথা তাঁর ভূমিকায় লিখেছেন :
‘আমার জীবনের অনেক অর্জনের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন, জাতির জনকের ডাকে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ ও স্বাধীনতা অর্জন।’
বইয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর প্রমুখের দৃষ্টির পাশাপাশি চরমপত্রখ্যাত এমআর আখতার মুকুল ও সহযোদ্ধা বীর উত্তম বিগ্রেডিয়ার গিয়াসউদ্দীন আহম্মদ চৌধুরীর সঙ্গে ছবি ছাপা হয়েছে। বইয়ের দুর্লভ ছবির মধ্যে রয়েছে বগুড়া ক্যাণ্টনমেণ্টের ৩ নং সাব সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে রেহাইচরে সংঘটিত সাঁড়াশি যুদ্ধের লোমহর্ষক রণকৌশলের বর্ণনা। মোহাম্মদ আলী কামাল রেহাইচরের ওই যুদ্ধের বর্ণনা বিশদভাবে দিয়েছেন তার বইয়ে :
১২ ডিসেম্বর ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর, লে. কাইউম আকুণ্ডবাড়ীয়া দিয়ে নদী পার হয়ে মোহনপুর দিয়ে রেহাইচরে পৌঁছায়। ….. আমার দলটি আকুণ্ডবাড়িয়া দিয়ে পার হয়ে নদীর ধার দিয়ে রেহাইচরের টিকরামপুরের দিকে ক্রমশ এগুতে থাকে। ডিসেম্বর ১৪ তারিখ সকালে পাকিস্তানিরা টের পেয়ে প্রথম ফায়ার আরম্ভ করে। পাল্টা জবাব দেই আমরা। ইতোমধ্যে সহযোদ্ধা জাহাঙ্গীর সাহেবের দলটি প্রথম বাঙ্কারে গ্রেনেড চার্জ করে। আমাদের মর্টার শেল শহরের বাঙ্কারে এসে পড়তে থাকে। প্রচণ্ড লড়াই হয়। হঠাৎ করে একটি বুলেট জাহাঙ্গীর সাহেবের মাথায় লাগে। মুহূর্তের মধ্যে জাহাঙ্গীর সাহেবের দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। খবরটি ছড়িয়ে পড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে। লে. কাইয়ুম আমাকে বলে, জাহাঙ্গীর আর নেই। যুদ্ধ থেমে যায় কিছুক্ষণের জন্য। লে. কাইউম ও আমি স্থির করি আক্রমণে গিয়ে জাহাঙ্গীরের লাশ উদ্ধারের জন্য। আমরা আমার আক্রমণে যাই (পৃ. ১০৪-১০৫)।
শুধু রেহাইচরের যুদ্ধেরই নয়। প্রত্যক্ষ ভূমিকায় থেকেÑ কানসাটযুদ্ধ, কানসাট কলাবাড়ি যুদ্ধ, দুর্লভপুর যুদ্ধ, খাসেরহাট যুদ্ধ, আড়গাড়হোট যুদ্ধসহ চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলের অন্যান্য যুদ্ধেরও আনুপার্বিক বর্ণনা আছে বইয়ে। বিশদ বর্ণনা আছে তাঁর রণকৌশলের। পাঠক বই পড়ে বিস্মিত হবে কতোটা দেশ প্রেম থাকলে, তবে এমন নিষ্ঠার সঙ্গে যুদ্ধ করা যায়।
যুদ্ধের বর্ণনার পাশাপাশি ছোট ছোট ঘটনাও তাঁর চোখ এড়ায়নি, বইয়ে তার নজির পাওয়া যায়। খাসের হাট যুদ্ধের বর্ণনা প্রসঙ্গে একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন তিনি :
একজন ইপিআর সিভিল নার্স খাসের হাট থেকে পালাবার সময়ে চারদিকে দেখে আর বুলেট বুলেট বলে চিৎকার করে পালাতে থাকে। যোদ্ধারা মনে করেন, হয়তো বাম দিক থেকে বুলেট আসছে। আমার ডান দিক থেকে কিছুদুর যাবার পরেও তার শব্দ কমেনি। তখন তাকে বসিয়ে মাথায় পানি ঢালা হলে তার জ্ঞান ফিরলো। পরে বোঝা গেল, তার ছেলের নাম বুলেট (পৃ. ৯৬)।
মোহাম্মদ আলী কামাল বইয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার প্রেক্ষাপট, যুদ্ধোত্তর নানা অনুষ্ঠানের বর্ণনা, মুক্তিযুদ্ধে তার অর্জিত বিভিন্ন স্মারকের আলোকচিত্র সংযোজন করেছে একান্তই প্রাসঙ্গিকভাবে। তবে, বইয়ের সংযোজিত তাঁর দিনপঞ্জির আলোকচিত্র ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের সহযোদ্ধাদের বিশাল তালিকা বইয়ের ওজন অনেক বাড়িয়েছে।
মোহাম্মদ আলী কামাল পেশাদার লেখক নন বলে নিজেকে মনে করেন। কথাটা পুরোপুরি মানা যায় না। ঘটনার উপস্থাপনা, বর্ণনা ও ভাষা ব্যবহারের কৃৎ কৌশল দেখে তাকে ব্যাকরণসম্মত অর্থেই একজন লেখক হিসেবে মনে হয়েছে আমার।
আমি, মোহাম্মদ আলী কামালের ‘১৯৭১ আমার মুক্তিযুদ্ধ’ বই পড়তে অনুরোধ জানাই, গদ্যে ইতিহাসনিষ্ঠ কিছু ঘটনা জানতে।
লেখক: ডিন, লিবারেল আর্টস, রাজশাহী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নাটোর

প্রাক্তন অধ্যাপক, ফোকলোর বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়