একটি দীর্ঘ গ্রাম কয়লার দিয়াড়

আপডেট: নভেম্বর ২০, ২০২১, ১২:০৬ পূর্বাহ্ণ

সামসুল ইসলাম টুকু:


চাঁপাইনবাবগঞ্জ-সোনামসজিদ স্থলবন্দর মহাসড়কের বামে লাহারপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে পশ্চিমের ছোট রাস্তায় নেমে গেলেই কয়লারদিয়াড় গ্রামের শুরু। তারপরে হাদিনগর পাগলাঘাট পর্যন্ত প্রায় ৪ কি.মি. দীর্ঘ এবং ঘনবসতিপূর্ণ হচ্ছে এই গ্রামটি। এত লম্বা গ্রাম বাংলাদেশে খুব কমই আছে। গ্রামের মাঝ দিয়ে চলে গেছে সাম্প্রতিককালের তৈরি সরু পিচ কার্পেটিং রাস্তা। শত বছরেরও পুরনো এই গ্রামটি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলাধীন শ্যামপুর ইউনিয়নের অন্তর্গত।
জনশ্রুতি রয়েছে একসময় এ গ্রামটি ছিল প্রমত্তা পদ্মা নদীর গর্ভ। নদী প্রকৃতির খেয়ালে এক সময় সেখানে চর জাগতে শুরু করে এবং পদ্মার অপর পাড় ভাঙ্গতে শুরু করলে ভাঙ্গন-কবলিত মানুষেরা এ পাড়ের চরে আশ্রয় নিতে থাকে। এক পর্যায়ে এ চরের মাটির নিচে একটি কয়লা ভর্তি নৌকার সন্ধান পায় এলাকাবাসী। সেই থেকে এ চরের নাম দেওয়া হয় কয়লারদিয়াড়। অন্যদিকে কয়লারদিয়াড় গ্রামের প্রায় দেড় কি.মি. দক্ষিণে শ্যামপুরে একটি কয়লা খনির সন্ধান পাওয়া যায় ষাটের দশকে। সরকারিভাবে সেখানে খননকাজ চলে কিছুদিন। কিন্তু লাভজনক মনে না হওয়ায় খননকাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
কুড়ি বছর আগেও এ গ্রামে পাকা রাস্তা ছিলনা। বর্ষার মৌসুমে কাঁচা রাস্তা এত পিচ্ছিল হতো যে পায়ে হেঁটে চলাও ছিল বেশ কষ্টকর। সাইকেল মটরসাইকেলের চাকায় এমনভাবে কাদা লাগতো যে তা চালানোর অযোগ্য হয়ে যেত। কিন্তু তারপরেও ওই গ্রামের শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত থাকে। কারণ সেখানে ছিল কিছু বিদ্যোৎসাহী ও দাতা ব্যক্তিবর্গ। ওই গ্রামে অশিক্ষিত মানুষ নেই বললেই চলে। পাশাপাশি চাষাবাদেও পিছিয়ে ছিলনা। তবে গোটা গ্রাম ঘিরে রয়েছে ঘন আমবাগান এবং এটাই ওই গ্রামের অর্থনীতির মূল ভিত্তি। বৃটিশ আমলেই অর্থাৎ ১৯৪১ সালে এই প্রত্যন্ত গ্রামের জনৈক রহিম বিশ্বাসের দানকৃত ২বিঘা জমির উপর প্রতিষ্ঠিত হয় কয়লারদিয়াড় প্রাথমিক বিদ্যালয়। মাত্র ২০ জন ছাত্র ছাত্রী নিয়ে এর যাত্রা শুরু হয় আর শিক্ষাদানের জন্য এগিয়ে আসেন ২/৩ জন অবৈতনিক শিক্ষক। তৎকালীন জাতীয় সংসদ সদস্য (এমএনএ) মরহুম ইদ্রীশ আহমেদ মিয়া এই বিদ্যালয়টিকে এমই স্কুল প্রতিষ্ঠায় প্রশাসনিক সহযোগিতা দেন। সে সময় গ্রামের মানুষের দেওয়া খড়ের চালা বাঁশের বেষ্টনি, তার কিছুদিন পরে টালির ছাউনি ই টিনের বেষ্টনি দিয়ে স্কুল চলতে থাকে। দীর্ঘ ৩২ বছর পরে ১৯৭৩ সালে সরকারি প্রজ্ঞাপনে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ করা হয়। কিছু ইট সিমেন্টের প্রলেপ পড়লেও বিদ্যালয়টির ভগ্নদশা কেটে ওঠেনি। বিদ্যালয় চত্বরটি গরু-ছাগলের বিচরণক্ষেত্র এবং মানুষ চলাচলের রাস্তা হয়ে ওঠে। ফলে শিক্ষার পরিবেশ ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। এমন সময় ২০১০ সালে বিদ্যালয়ের নতুন ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠিত হয় মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালেককে সভাপতি করে।
এদিকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন মুস্তাক আহামেদ। নতুন কমিটি, শিক্ষকবৃন্দ ও গ্রামবাসীকে সাথে নিয়ে শুরু হয় বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান উন্নয়ন, অবকাঠামো ও পরিবেশ উন্নয়নের কাজ এবং তা গতি সঞ্চার করে। ২০১২ সালে পিইডিপি-৩ প্রকল্পের আওতায় একটি একতলা ভবন ও দুটি ওয়াশ ব্লক নির্মিত হয়। এরপর স্থানীয় জনসাধারণের সহযোগিতায় নির্মিত হয় সীমানা প্রাচীর ও শিক্ষার্ত্থীদের বসার জন্য দুটি বিশালাকার ছাতা ছাউনি। যা দেশের কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আছে বলে মনে হয়না। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে একটি ছোট মাঠ রেখে চার পাশে ফুল ফল শোভিত পত্র-পল্লবে আচ্ছ্বাদিত করা হয়েছে। শিক্ষার পরিবেশ হয়ে উঠেছে ছায়া সুনিবিড় শান্ত মনোমুগ্ধকর। স্কুলটির পরিবেশ না দেখলে বিশ্বাস হবেনা। অভুতপুর্ব এই পরিবেশের সাথে যুক্ত হয়েছে শিক্ষকদের উন্নত শিক্ষণ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার শিক্ষা। স্কুলের কোথাও দেখা যাবেনা কোনো আবর্জনা- এমনকি টুকরো কাগজ পর্যন্ত। সামান্যতম আবর্জনা থাকলে ছাত্র ছাত্রীরা কুড়িয়ে ডাস্টবিনে ফেলে দেয়। এটাও শৃঙ্খলার এক নিদর্শন। শ্রেণিকক্ষসহ স্কুলের বিভিন্ন স্থানে ১৩ টি সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা আছে। এটাও কোনো প্রাথমিক স্কুলে দেখা যায়না। পাঠ্যপুস্তকের শিক্ষাক্রম ছাড়াও ল্যাপটপসহ প্রজেক্টরের ব্যবহার ও ইংরেজি শিক্ষা উন্নয়নের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় ছাত্র ছাত্রীদের। সমাপনি পরীক্ষার পূর্বে বিনা পারিশ্রমিকে পৃথকভাবে পাঠদান করে পরিক্ষার জন্য প্রস্তুত করেন শিক্ষকগণ। বর্তমানে স্কুলে ২৪৬ জন ছাত্রছাত্রী ( ছাত্রীর সংখ্যা বেশি ) এবং শিক্ষক রয়েছেন ৭ জন। এ বিদ্যালয়ের বহু শিক্ষার্থী আজ শিক্ষা বিভাগ, পুলিশ বিভ্গা, প্রকৌশল বিভাগে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার পদে আসীন রয়েছেন। তারা মঝে মাঝে একত্রিত হয়ে এ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সম্মিলনসহ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন।
বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই গ্রামসহ আশেপাশের গ্রামগুলোর মানুষের কাছে কয়লারদিয়াড় শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে বলে অল্পদিনের মধ্যেই সেখানে একটি আপগ্রেড স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। যা পরবর্তীতে কয়লারদিয়াড় হাইস্কুলে উন্নীত হয়। এ গ্রামে প্রায় ৪ হাজার ৬০০ ভোটার তথা প্রায় ২০ হাজার মানুষের বসবাস। অর্থাৎ প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ৫০০০ মানুষের বাস। বিচিত্র ব্যাপার হচ্ছে, এখান আওয়ামীলীগ, বিএনপি এবং জামাতের প্রায় সমান সংখ্যক ভোটার। কোনো নির্বাচনে কেউ জয়লাভ করলে বলা হয় সে এবার বেশি জনসংযোগ করেছে। গত সংসদ নির্বাচনে সারা দেশে ভোট চুরির ঘটনা ঘটলেও এ গ্রামের ওই তিন দলের নেতারা মিলিত হয়ে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করেন। শিক্ষা দীক্ষা ও রাজনৈতিক দিক থেকে কয়লারদিয়াড় যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে তেমনটা যদি দেশের প্রতিটি গ্রামে হতো আমাদের দেশটা সোনার দেশ হতো।
লেখক : সাংবাদিক