একটি বদলে যাওয়া জনপদের গল্প

আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৫, ২০১৭, ১২:১৬ পূর্বাহ্ণ

আনিসুর রহমান, গুরুদাসপুর


নাটোর গুরুদাসপুরে এই সেতুটি নির্মাণের ফলে পাল্টে গেছে জনজীবন-সোনার দেশ

রুহাই। পশ্চাদপদ চলনবিলের অবহেলিত একটি গ্রাম। বর্ষায় গ্রামটি দ্বীপের মতো জেগে থাকে আর শুকনোয় রোদে পুড়ে খাঁ-খাঁ। শত বছরের বঞ্চনা বুকে ধারণ করে গ্রামটি। নাটোরের গুরুদাসপুর-সিংড়া আর সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার সীমান্তে গ্রামটির ভৌগলিক অবস্থান।
শত বছর ধরে ‘বর্ষায় নাও আর মেহন্তে পা’- নির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থায় আটকে ছিল রুহাই। কিন্তু গ্রামটির অদূরে বিলসায় চলনবিলেরর মাঝে নির্মিত হয়েছে ১৭৫ মিটার দীর্ঘ একটি ব্রিজ। সেই সঙ্গে রুহাই থেকে গুরুদাসপুরের চাঁচকৈড় পর্যন্ত সাড়ে ১০ কিলেমিটার দীর্ঘ একটি পাকা সড়ক। এখন রুহাই থেকে রাজাপুর (উপজেলার শেষ সীমা) পর্যন্ত উম্মোচিত হয়েছে আধুনিক সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। এজন্য ব্যয় হয়েছে ১৬ কোটি টাকা।
এতে করে পিছিয়ে পড়া রুহাই, বিলশা, খুবজীপুর, সিংড়া উপজেলার বেড়াবাড়ি, ইটালি এবং সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার কুন্দইল, বারুহাস, তাড়াশ সদরের সাথে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। এখন বর্ষাকালেও মানুষ দেশের আভ্যন্তরীণ জেলার পরিবহন সুবিধা গড়ে উঠেছে। সেইসঙ্গে বিল জনপদের মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার চিত্র বদলে গেছে। বিশেষ করে চলনবিলের মাঝে বিলশায় ‘মা-জননীী সেতু এবং পাকা সড়ক তৈরির কারণে বর্ষার সময় তৈরি হয়েছে মানুষের বিনোদনের পরিবেশ। বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নানা শ্রেণি পেশার মানুষ সেখানে জমায়েত হয়- চলনবিলকে উপভোগ করতে। চলনবিলের বিলসা গ্রামের কৃতী সন্তান ও স্থানীয় সাংসদ আবদুল কুদ্দুসের অক্লান্ত চেষ্টায় চলনবিলের বুকচিরে ১৬ কোটি টাকার ওই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হয়েছে। যা শত বছরে ইতিহাস বহন করবে।
নাটোর নির্বাহী প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে- গুরুদাসপুর-তাড়াশ মৈত্রী সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় গুরুদাসপুর পৌর সদরের চাঁচকৈড় থেকে উপজেলার রুহাই সীমানা পর্যন্ত সাড়ে ১০ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে তিন কিলোমিটার সাবমার্সেবল (ডুবো সড়ক)। সড়কটি ওয়াটার লেবেল চার মিটার উঁচু করা হয়েছে। ভরা বর্ষায় চলনবিলের উত্তাল ঢেউয়ে সড়কটি যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেজন্য সড়কের উভয় পাশে নেট ও ব্লক দিয়ে প্রতিরোধ ব্যবস্থা করা হয়েছে। এজন্য ব্যয় হয়েছে ৯ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। আর সাড়ে ১০ কিলোমিটার সড়ক ও দুই লেন বিশিষ্ট ১৭৫ মিটার আরসিসি গার্ডার সেতু। এজন্য ১৫ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয় বরাদ্দ রয়েছে। সড়কের জন্য ৯ কোটি ৩৯ লাখ টাকা এবং ৬ কোটি ৫ লাখ টাকা ব্যয় হবে ব্রিজ নির্মাণে। মেসার্স আনোয়ার ট্রেডার্স ও সরকার কন্সট্রাকশন নামে দুটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ওই প্রকল্পের কাজগুলো বাস্তবায়ন করে।
গুরুদাসপুর উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) রতন কুমার ফৌজদার জানান, চলনবিলের কৃষি ও কৃষকের পরিবহন ব্যবস্থা বিবেচনায় বিলসায় আরসিসি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণ করা হয়। ছয় স্প্যান বিশিষ্ট ১৭৫ মিটার দীর্ঘ ও ৫ দশমিক ৫ মিটার প্রস্থের ওই ব্রিজের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে একই সাথে গরু-মহিষের গাড়িসহ বাস-ট্রাক চলাচল করতে পারবে। সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়াতে ব্রিজটিতে পৃথক দুইটি লেন রাখা হয়েছে। একই সাথে ভরা বর্ষায় যাতে নৌচলাচলে বাধাগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়টি মাথায় রেখে নির্মাণ করা হয়েছে ব্রিজটি। চলনবিলবাসীর জন্য এটা একটি মডেল ব্রিজটি। এজন্য ব্যয় হয়েছে ৬ কোটি ৫ লাখ টাকা।
খুবজীপুর মেধা বিকাশ ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক সহকারি অধ্যাপক গোলাম মোস্তফা জানান, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে আগে মুমূর্ষু রোগিকে বাঁশের মাচাল বানিয়ে পায়ে হেঁটে উপজেলা সদরের হাসপাতালে নিতে হতো। সময় বেশী লাগার কারণে পথেই অনেক রোগির মৃত্যু হতো। এখন ব্রিজ আর পাকা সড়ক নির্মিত হওয়ায় মাত্র ১০ মিনিটেই হাসপাতালে পৌঁছা সম্ভব হচ্ছে।
বিলসা গ্রামের কৃষক ওসমান গনি জানালেন, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে চলনবিলে উৎপাদিত ধান পরিবহনের বস্তাপ্রতি ১শ টাকা করে ব্যয় হতো। এখন মাত্র ১০ টাকা লাগছে। সকল দিক বিবেচনা করে ব্রিজ ও সড়ক নির্মাণ হওয়ায় শুধু রুহাই-বিলসা নয়। চলনবিলের সিংড়া-তাড়াশ উপজেলা এলাকার মানুষের ভাগ্যউন্নয়ন হয়েছে।
খুবজীপুর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মনিরুল ইসলাম জানালেন, চলনবিলের ওই এলাকার মানুষ বর্ষায় অনেকটা বন্দি জীবন যাপন করতেন। নৌকাই ছিল প্রধান ভরসা। নতুন করে স্বপ্ন দেখছে চলনবিলের মানুষ। সেই সাথে বদলেছে জীবন ধারা।
গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে সহকারি কমিশনার (ভুমি) গনপতি রায় জানান, চলনবিলের মাঝের ‘মা-জননী সেতু আর সেতু কেন্দ্রিক পাকা সড়ক নির্মানের কারণে চলনবিল জনপদেও গুরুদাসপুর, সিংড়া ও সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলা এলাকার অন্তপক্ষে ২০টি গ্রাম সড়ক যোগাযোগের আওতায় চলে এসেছে। ফলে ওই গ্রামগুলোর কৃষি-কৃষকের ভাগ্য বদলেছে। এসফলতা দেখতে সম্প্রতি নাটোর জেলা প্রশাসক মোছা. শাহিনা খাতুন পরিবারসহ চলনবিল ঘুরে গিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
সাংসদ অধ্যাপক আবদুুল কুদ্দুস বলেন, চলনবিলের অবহেলিত মাটি ও মানুষের কথা চিন্তা করে প্রকল্পটির বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছে। সর্বত্র সভ্যাতার ছোঁয়া ছড়িয়ে পড়লেও চলনবিলের ওই এলাকার মানুষ পিছিয়ে ছিল। আর যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে কৃষক, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল। চলনবিলের মানুষের সেই কষ্ট আমাকে ব্যথিত করেছে প্রতিনিয়ত। কারণ, আমিও ছিলাম বিলসা গ্রামের সন্তান। সেসব বিচেনা করেই বিশাল ওই উন্নয়ন কাজ হাতে নেয়া হয়েছিল। এখন তা বাস্তবতায় রুপ নিয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২০১০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ওই প্রকল্পের অনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয় এবং নির্মাণ কাজের ফলক উন্মেচন করেন স্থানীয় সাংসদ অধ্যাপক আবদুুল কুদ্দুস। ২০১২ সালের ৯ আগস্ট ওই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বর্ষা মৌসুমে নির্মাণ কাজের বিঘ্ন ঘটায় একটু বেশি সময় লেগেছে। ২০১৩ সালের ৫ মে প্রকল্পটি চলাচলের জন্য উম্মুক্ত করে দেয়া হয়।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ