একটি ভূতুড়ে গল্প

আপডেট: নভেম্বর ১১, ২০২২, ১২:৪২ পূর্বাহ্ণ

কল্যাণ উবাচ:


ভূতের ভয় আমার একেবারেই নেই। কিন্ত তাই বলে আমি ভূতে অবিশ্বাসী তা নয়। বরং তেনাদের উপর আমার এ বিশ্বাস আছে, বেশি রকমই আছে, বিশেষ ভাবে আছে। তবু আমি তাদের ভয় পাইনে। তারাও পায় কিনা জানিনে, অন্তত আমার সামনে আসে না। বলা ভালো, আমি তাদের আসার সুযোগ দিই না। বেশ করে ব্যাঘাত ঘটাই তাদের আশায়। আসলে ছোটবেলা থেকে ভূতের গল্প পড়ে পড়ে আমার তেনাদের সম্পর্কে দারুন ভাল ধারণা হয়ে গেছে। তেনাদের প্রতিটি ধরণ-ধারণ আমার বেশ পরিচিত এখন। নানান লেখকের নানান কেরামতির শ্রীফল বলা যায়। আজকালকার লেখকরা আবার ভূতের বদলে ঠাকুর দেবতা নিয়ে টেনে টেনে ভয় দেখান। ভাবের রাজ্যে ভগবানের অবতরণ হয়। সম্ভবত এতেই তাঁদের ‘অভীষ্ট’ সিদ্ধ হয়। ছিন্নমস্তা থেকে বগলা, সতীদের নিয়ে ভক্তির বদলে ভয়ের মেলা। মিলিয়ে ছাড়ে একেবারে। তা যাকগে, মোট কথা ভূত সম্পর্কে আমি মোটামোটি জানি। তাই সেই ধারে আমি যাইনে। যেমন ধরুন, আপনি গ্রামে অসুস্থ আত্মীয়দের দেখতে যাবেন। ট্রেন থেকে নেমেই দেখবেন ফাঁকা ইস্টিশন, অন্ধকার রাত এবং জনশূন্য পথ। এদিকে আপনি বাড়ির পথ চেনেন না। অমনি দেখবেন, মুখ দেখা যায় না এমন একজন আপনাকে সাদরে সদর পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেবে। পিছিয়ে থেকে আপনাকে বুঝতে হবে সামনের লোকটি ভূত। একেবারে খাঁটি, নির্যাস ভূত।

তারপর ফাঁকা রেলগাড়ির কামরা। সেখানে গম্ভীর এবং আধা-আলোতে না আলোকিত লোকটি অবশ্যই ভূত। সে বিষয়ে বিশেষ ভাবনার অবকাশ নেই। রাতের অন্ধকারে যেমন আয়নায় মুখ দেখতে নেই। অবশ্যই সেখানে নিজের সুন্দর মুখের বদলে কোন বিগত সুন্দরির আত্মিক মার্কা মুখ দেখা যাবে। হে হে, এইসব বিষয়ে আমি বিশেষ সাবধানী। তাই আমার জীবনে ভূতকাল আছে, কিন্ত স্বয়ং ভূত নেই। আদারে বাদারে আঁধারে ঘোরার থেকে মলে ধারে মাল কেনা ভাল। তাতে ভূত মেলার চান্স কম। তবু এই সাবধানী আমিই একদিন ভূতের খপ্পরে পড়ে গেলাম। সেই নিয়েই এই গপ্পো। বড্ড করুণ এক ভূতুড়ে গপ্পো।

সল্টলেকের করুণাময়ীতে বইমেলা বসেছিল। আর এই মেলাতেই যত পাগল মিলে যায় একত্রে। এমনকি আমি, যে কিনা কোনোদিন স্কুলে অঙ্ক মেলাতে পারিনি, সেই আমাকেও এই মেলাতে খুঁজলে মিলে যাবে। তারপর অবিশ্যি মাসের শেষে বাড়ির বাজেট মেলে না। মেলার মাঝেই ডিম্পুর ফোন। বইয়ের মাঝে থাকলে বউ এর ফোন বিরক্তিকর। তবু ধরতে হয়। ‘নইলে বিপদ বাড়ে।’

‘আসার সময় চার প্যাকেট বিরিয়ানি নিয়ে এস। দমদম থেকে দিদি আসছে। আর্সেলানই এনো। বউয়ের বাড়াবাড়ি। বিরিয়ানি আনাটা সমস্যার, সেটা বলতে পারিনে। বইয়ের পেছনেই টাকা প্রায় শেষ, এখন বউ এর পেছনে খরচ করি কি করে। সেটা ভাবতে ভাবতেই গাড়িতে উঠি। আনমনে স্টার্ট দিই। গড় গড় করে সেটা, কি ভাগ্যি গড়বড় করে না।

রাত্রে একা বাইপাস দিয়ে গাড়ি নিয়ে আসা মানেই ভূতের খপ্পরে পড়া। সেই বিষয়ে আমি ওয়াকিবহাল। গাড়িতে গজল চালিয়ে দিই। বেড়ে গান। বড়ে গুলাম আলি খানের। আমার মনে জোর বাড়ে। গাড়ির স্পীডেরও। মাঝামাঝি আসতেই বিপদ। আমার জানা বিপদ অবশ্য। এরকমই হওয়ার কথা। ফাঁকা রাস্তায় একজন মহিলা। খোলা চুলে মুখ ঢাকা, সাদা শাড়ি পরা। হাত তুলে গাড়ি দাঁড় করাতে ইশারা করছে। হয়ে গেল। এ আমার চেনা ছক। একেবারে ছকিয়ে চেনা। চিনির মতো, চানার মতন চেনা। আজ আবার শনিবারের সন্ধ্যা। আর সন্দেহ নেই। এইবার লিফট চেয়ে গাড়িতে উঠবে, নিজের বাড়ি বলে নিয়ে যাবে কোন কবরখানায়। তারপর আমিই ওনার খানায় পরিণত হব। পরের দিন আমার রক্তহীন শক্ত দেহটা কবরখানার পাশের খানায় মিলবে। মশার কামড়ে অনেক রক্ত গেছে, এইবার একসাথে পুরোটাই যাবে। তবে পেত্নীর কামড়ে ডেঙ্গি হবে না বোধহয়। আমি ভয় পাই। আর ভয়ের চোটে ভুল করে গাড়িটাও দাড় করিয়ে ফেলি। কিন্ত পেতœীর মুখ দেখা গেল না। চুলে পুরো ঢাকা। বরং খোনা গলা শোনা গেল -” কল্যাণ- ‘ওরে দাদা -আমার নাম জানা পেত্নী। আমি দারুন জোরে গাড়ি চালাই। ধুকতে ধুকতে বাড়ি পৌঁছাই বিরিয়ানি কিনে। আর তারপর ঘরে ঢুকেই চমক। ডিম্পুর পাশে পেত্নীটা বসে আছে। আমি বরাবরই জানতাম ডিম্পুর সাথে ভূত প্রেতদের সম্পর্ক আছে। ওর মেজাজ দেখেই অনুমান করেছিলাম। এ তো প্রমাণিত। দৌড় মারব ভাবছিলাম, পেত্নী ডেকে উঠল, কিরে কল্যাণ- ওমা, এ তো ডিম্পুর দিদি। সেই স্নেহের সুর। ‘হে হে, দিদি নাকি’-তাড়াতাড়ি প্রণাম করলাম। সেই ফাঁকে দেখেও নিলাম, পা টা উল্টো নাকি। ‘গলা ভাঙল কি করে দিদি ? সর্দি লাগল বুঝি?’ ভালোমানুষ সাজি। ‘তুই আমাকে দেখেও গাড়িতে না তুলে চলে গেলি কেন?’ দিদির গলায় স্নেহের অভিযোগ। ‘তুমি ওই অন্ধকারে কি করছিলে?’ আমি রীতিমত অবাক হই। বাক্ হারিয়ে ফেলি। ‘আরে ওইখান পর্যন্ত পৌঁছিয়ে ট্যাক্সিটা খারাপ হল। কি করব ভাবছি, দেখি তোর গাড়ি। তা তুইও না নিয়ে চলে এলি। পরে আরেকটা উবের ধরে- ওরে বাবা , ওটা দিদি ছিল নাকি? আমি বিশেষ বিষম খাই। ‘মানে ইয়ে- আমিই’
আর বলতে পারি না। তার আগেই ডিম্পুর চিৎকার শুরু হয়। ‘তুমি এতবড় অসভ্য, আমার দিদিকে অন্ধকারে ফেলে রেখে চলে এলে? দাঁড়াও, আজ তোমার হচ্ছে। একফোটাও বিরিয়ানি পাবে না খেতে।’ তারপর শুরু হল হুমকি। এমন পত্নীর থেকে পেত্নীই ভাল ছিল না? ও হ্যাঁ, ভূত সম্পর্কে আমি কিছুই জানিনা। দয়া করে আমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করবেন না।