একশো বছরে পাবনার বনমালী শিল্পকলা কেন্দ্র

আপডেট: মার্চ ৬, ২০২৪, ১০:১০ অপরাহ্ণ


শাহীন রহমান, পাবনা:পাবনা জেলায় সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার ঐতিহ্য টিকিয়ে রেখেছে শহরের মধ্যে অবস্থিত বনমালী শিল্পকলা কেন্দ্র। যেখানে নিয়মিত মঞ্চস্থ হয় নানা অনুষ্ঠান। সংস্কৃতির বিভিন্ন ধারায় প্রশিক্ষণসহ সংগঠনগুলোকে আর্থিক প্রণোদনা দিচ্ছে এই প্রতিষ্ঠান ।
মঙ্গলবার ( ৫ মার্চ) পাবনার জেলার সাংস্কৃতিক চর্চার বাতিঘর বনমালী শিল্পকলা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার শতবর্ষ পূর্ণ করেছে। দীর্ঘ এই পথচলায় গর্বিত জেলার সাংস্কৃতিক কর্মীরা।

বনমালী সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চায় পাবনা জেলার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এই জেলায় জন্মেছেন বহু গুণী শিল্পী, কবি ও সাহিত্যিক। রয়েছে নাটক, সংগীত, নৃত্য ও আবৃত্তিচর্চার একাধিক সক্রিয় সংগঠন। মিলনায়তনের ব্যবস্থা করে জেলায় সংস্কৃতিচর্চার সেই ধারা সক্রিয় রেখেছে শহরের বনমালী শিল্পকলা কেন্দ্র।

সংগঠনের প্রতিষ্ঠাকাল ও পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, পাবনার জমিদার রায়বাহাদুর বনমালী রায়ের দুই ছেলে ক্ষীতিশ রায় ও রাধিকা রায় সংস্কৃতিমনা ছিলেন। তাঁরাই সংস্কৃতি চর্চার প্রসার ও প্রেরণা দিতে ১৯২৪ সালের ৫ মার্চ তাঁদের বাবার নামে প্রতিষ্ঠা করেন বনমালী শিল্পকলা কেন্দ্র। ৩৯ শতাংশ জমির ওপর তৈরি হয় বিশাল মিলনায়তন। তখন এর নাম ছিল বনমালী রঙ্গমঞ্চ। পরে করা হয় বনমালী ইনস্টিটিউট। তখন থেকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে প্রতিষ্ঠানটি।

বনমালী প্রযোজিত সীতা নাটকে অভিনয় করতে এসেছিলেন কলকাতার অভিনেতা ছবি বিশ্বাস, রবি রায় ও মমতা ব্যানার্জি। বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি সুচিত্রা সেন একাধিক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। ১৯৮৫ সালে বনমালীর উদ্যোগে ৩৩টি নাট্য সংগঠনে আন্তজেলা নাট্যোৎসব অনুষ্ঠিত হয়।

দেশবরেণ্য কবি-সাহিত্যিক মাজাহারুল ইসলাম, আবু হেনা মোস্তফা-কামাল, কবি বন্দে আলী-মিয়া, সৈয়দ শামসুল-হক, কবির চৌধুরী, কবি শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণ, কবি সুফিয়া কামাল, কামাল লোহানী, গীতিকার গৌরী প্রসন্ন-মজুমদার, হাসান আজিজুল হকসহ বহু গুণীজন এখানে এসেছেন। অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন ওস্তাদ বারীণ মজুমদার, ফেরদৌসী রহমান, তপন চৌধুরী, ডলি জহুর, হুমায়ুন ফরীদি, সুবর্ণা মুস্তাফা, পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, রাইসুল ইসলাম আসাদ, আলী যাকের, রামেন্দু মজুমদার ও মামুনুর রশিদ।

একপর্যায়ে পুরোনো মিলনায়তনটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে যায়। ২০০৯ সালে সরকারি উদ্যোগে মিলনায়তন সংস্কার শুরু হয়। তখন এটিকে বহুমুখী ব্যবহার উপযোগী কমিউনিটি সেন্টার হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু প্রতিবাদ জানান স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মী ও সুধীজনেরা। নিজেদের অর্থায়নে মিলনায়তনটিকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের উপযোগী করেন। গড়ে তোলা হয় আধুনিক সুবিধা-সংবলিত মিলনায়তন হিসেবে। এ সময় নতুন করে এর নামকরণ করা হয় বনমালী শিল্পকলা কেন্দ্র।

প্রতিষ্ঠানটি সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত কমিটি দিয়ে পরিচালিত হয়। বর্তমানে ত্রি-বার্ষিক এই কমিটির সভাপতি স্কয়ার গ্রুপের পরিচালক অঞ্জন চৌধুরী এবং সাধারণ সম্পাদক পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মো. হাবিবুল্লাহ।

মো. হাবিবুল্লাহ জানান, এখানে নিয়মিত অভিনয়, আবৃত্তি, সংগীত ও নৃত্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন বয়সী ছেলেমেয়েরা এখানে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। শিক্ষার্থীদের নিয়ে নিয়মিত বিভিন্ন প্রযোজনা করা হচ্ছে। অন্য সংগঠনগুলোর জন্য নেওয়া হয়েছে বিশেষ উদ্যোগ। এখানে অনুষ্ঠান করার জন্য মিলনায়তনের ভাড়া দিতে হয় না, বরং সংগঠনগুলোকে প্রণোদনা হিসেবে নগদ আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানের আগে চারদিন স্থানীয় পত্রিকায় বিজ্ঞাপন, মাইকিং, বিলবোর্ড স্থাপন, মিলনায়তনের সাজসজ্জা, লিফলেট ছাপা, মঞ্চ ব্যবস্থাপনা সব করে দেওয়া হয়। ফলে সংগঠনগুলোকে বাড়তি চাপ নিতে হয় না।

বনমালী শিল্পকলা কেন্দ্রের সভাপতি ও স্কয়ার গ্রুপের পরিচালক অঞ্জন চৌধুরী বলেন, দেশের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে বনমালী শিল্পকলা কেন্দ্র কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। শতবর্ষের এই পথচলায় বনমালীতে বহু গুণী ব্যক্তির পদচারণে পড়েছে। দেশের বহু খ্যাতনামা সংগঠন ও শিল্পী এখানে নাটকসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান করেছেন। জেলার সাংস্কৃতিক চর্চায় এটি মাইলফলক। আগামী দিনেও বনমালীর এই ধারা অব্যাহত রাখবে।

উল্লেখ্য, শতবর্ষ পূর্তিকে স্মরণীয় করে রাখতে বছরব্যাপী নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে বনমালী শিল্পকলা কেন্দ্র। অনুষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে শত বছরের কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোকচিত্র প্রদর্শনী, সুধী সমাবেশ, সুভ্যেনির প্রকাশ, নাটক, আবৃত্তি, নৃত্য ও সংগীত অনুষ্ঠান।