একাত্তরের মার্চের অসহযোগ আন্দোলনে রাজশাহী

আপডেট: মার্চ ১, ২০২১, ১২:১৭ পূর্বাহ্ণ

ড. মো. মাহবুবর রহমান:
প্রফেসর (অব.), ইতিহাস বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়


মার্চ মাস বাঙালির জীবনে তাৎপর্যপূর্ণ। ১৭ই মার্চ হচ্ছে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি ও বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন। বঙ্গবন্ধুর ডাকে ১৯৭১ সালের ১লা মার্চ থেকে শুরু হয় পাকিস্তানি শাসনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লাগাতার অসহযোগ আন্দোলন। ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের জন্য বিখ্যাত। অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে ১৪ই মার্চ বঙ্গবন্ধু কর্তৃক অসহযোগ আন্দোলনের ৩৫ দফা নতুন কর্মসূচী ঘোষণা। ২৩শে মার্চ পাকিস্তান দিবসে পাকিস্তানি পতাকার পরিবর্তে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকার নিরস্ত্র জনগণের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং ইতিহাসের বর্বরতম নরহত্যা সংঘটিত করে। তাই ২৫শে মার্চ বাংলাদেশের গণহত্যা দিবস। পাকিস্তানি বাহিনী ২৫শে মার্চ রাত ১টা ১০ মিনিটে (২৬শে মার্চের প্রথম প্রহর) বঙ্গবন্ধুকে বন্দি করে এবং গোপনে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়। বন্দি হওয়ার পূর্বেই বঙ্গবন্ধু চট্টগ্রামস্থ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব এমএ হান্নানের নিকট স্বাধীনতার ঘোষণা বাণী প্রেরণ করেন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অঘোষিত যুদ্ধের প্রতিবাদে বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ থেকে যে স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু হয় তা চলে নয় মাস। তাই বলেছিলাম সমগ্র মার্চ মাসটাই আমাদের জাতীয় জীবনে তাৎপর্যপূর্ণ। অন্যভাবে বলা যায় একাত্তরের মার্চের অসহযোগ আন্দোলন বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। অসহযোগ আন্দোলন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা অর্জনকে তরান্বিত করেছে। অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ ও সকল শ্রেণি পেশার মানুষ, ছাত্র-শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, কৃষক, শ্রমিক, চাকরিজীবী ব্যবসায়ী, আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী, আইনজীবী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, লেখক, কবি, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, শিল্পী, অভিনেতা-অভিনেত্রী, দেশের নারী সমাজ এক ইস্পাত কঠিন ঐক্যে উপনীত হয়। অসহযোগ আন্দোলনে সকল রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠন রাজনৈতিক মতাদর্শগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও অসহযোগ আন্দোলনের সময় ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিটি কর্মসূচি পালন করেছে। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণে সারাদেশে মানুষ অনুপ্রাণিত হয়েছেন। অসহযোগ আন্দোলনে বাংলাদেশের পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বের প্রতি তাদের আনুগত্য প্রকাশ করেছিল। অসহযোগ আন্দোলনের খবর সংগ্রহের জন্য পৃথিবীর সেরা পত্রিকা ও টেলিভিশনের নামকরা সাংবাদিকবৃন্দ ঢাকায় উপস্থিত হয়েছিলেন। তাঁদের চোখের সামনেই ২৫শে মার্চের গণহত্যার ঘটনা ঘটে। ফলে তাঁদের মাধ্যমে দ্রুত গণহত্যার খবর সারা বিশে^ ছড়িয়ে যায়। যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ^জনমত গঠনে সহায়ক হয়। তাই বলা যায় যে, অসহযোগ আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিপর্ব। উক্ত আন্দোলন কেবল ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তা প্রতিটি জেলা, থানা, ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়েছিল।
অসহযোগ আন্দোলনে রাজশাহীবাসীও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ১৯৭১ সালের ১লা মার্চ অসহযোগ আন্দোলন শুরুর প্রেক্ষাপট হচ্ছে ইয়াহিয়া খান কর্তৃক ১৯৭১ সালের ১লা মার্চ দুপুর ১টা ০৫ মিনিটে বেতার মারফত এক ঘোষণা জারির মাধ্যমে ৩রা মার্চ (১৯৭১) অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা। এ বিষয়ে তিনি জাতীয় পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী আওয়ামী লীগ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে কোনো প্রকার আলোচনা করেন নি। ইয়াহিয়ার এই ঘোষণার বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়। বঙ্গবন্ধু ২রা মার্চ (১৯৭১) ঢাকায় এবং তার পরদিন সারা প্রদেশে হরতাল ডাকেন। সর্বত্র সাধারণ মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। আপামর জনসাধারণ স্বাভাবিক কাজ ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসে। মুহূর্তের মধ্যে ঢাকা এক বিক্ষোভ ও মিছিলের শহরে পরিণত হয়। মুহূর্তের মধ্যে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দোনাকপাট, মিল কল-কারখানা, যানবাহন বন্ধ হয়ে যায়। ঢাকা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠানরত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলাও বন্ধ হয়ে যায়। ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের বটতলা থেকে এক বিক্ষোভ মিছিল বের করে এবং পল্টনে জনসভা আয়োজন করে। ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া) বায়তুল মোকাররমে এক বিক্ষোভ সমাবেশ আয়োজন করে ও সমাবেশে শেষে গুলিস্তান এলাকায় মিছিল বের করে। ন্যাপ ও (মোজাফ্ফর) মিছিল বের করে। সর্বত্র শ্লোগান উচ্চারিত হয় : ‘শেখ মুজিবের পথ ধর বাংলাদেশ কায়েম কর, ভূট্টোর মুখে লাথি মার বাংলাদেশ কায়েম কর’।
রাজশাহীতে অসহযোগ আন্দোলনের সূচনা
১লা মার্চ রাজশাহীতেও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। মিছিলে মিছিলে উত্তপ্ত হয় রাজশাহী শহর। ইয়াহিয়ার ঘোষণার প্রতিবাদে রাজশাহী কলেজে তাৎক্ষণিকভাবে এক প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। ‘এতে বক্তব্য রাখেন খুরশিদ বিন আলম, রুহুল আমিন মঞ্জু, আব্দুল কুদ্দুস (পরবর্তীকালে এম.পি.ও প্রতিমন্ত্রী), আব্দুস সামাদ, মাহফুজুর রহমান খান, হাবিবুর রহমান টুকু প্রমুখ’। (হোসনে আরা খানম, ১৯৭১ : অসহযোগ আন্দোলনের কালপঞ্জি, পৃ.১৫২-১৫৩)। সভা চলাকালে বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা ফ্লাগ স্ট্যান্ড থেকে পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। সভা শেষে একটা মিছিল রাজশাহী কোর্টের দিকে এগিয়ে যায়। মুহূর্তে শহরের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা ক্লাসবর্জন করে ও ফ্লাগ স্ট্যান্ড থেকে পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে সেগুলি পুড়িয়ে ফেলে। রাজশাহী কোর্টের দিকে মিছিল অগ্রসর হওয়ার সময় পথে রেডিও স্টেশন, এসপি অফিস, ডিসি অফিস ও জেলা জজ অফিসের পতাকাও নামিয়ে পুড়িয়ে ফেলে। জেলা জজ অফিসে পতাকা নামাতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু মিছিলকারীরা কোনো বাঁধাই মানেনি। মিছিলকারীরা কোর্ট থেকে লক্ষ্মীপুর হয়ে বর্ণালীর দিকে অগ্রসর হয় এবং বর্ণালী সিনেমা হলে প্রদর্শনরত অবস্থায় উর্দু ছবি ‘রোড টু সোয়াত’-এর প্রদর্শনী বন্ধ করে দেয়। উক্ত মিছিলে সিটি কলেজ ও মেডিকেল কলেজের ছাত্ররাও যোগ দেয়। বিকেলে ভুবনমোহন পার্কে এক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। জনসভা থেকে পরদিন ২রা মার্চ ধর্মঘট ঘোষিত হয়।
রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়েও ইয়াহিয়ার ঘোষণার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। শিক্ষার্থীরা তাৎক্ষণিকভাবে ক্লাস বর্জন করে ও ক্যাম্পাসে মিছিল বের করে। শিক্ষকগণও ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ করে পরবর্তী করণীয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা শুরু করেন এবং ২রা মার্চের ধর্মঘট সমর্থন করেন।
সেদিন রাতে মানুষ অধির আগ্রহ সহকারে আকাশবাণী, বিবিসি ও ভয়েস অব আমেরিকার খবর শোনে। প্রতিটি বিদেশি বেতার মাধ্যমে ঢাকাসহ সারাদেশের আন্দোলনের খবর প্রচারিত হয়। তা শুনে মানুষ আরো বিক্ষুব্ধ ও উত্তেজিত হয়ে ওঠে। গ্রামাঞ্চলেও মানুষ আকাশবাণী, বিবিসি ও ভয়েস অব আমেরিকার খবর শুনে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হয়। এভাবেই শুরু হয় রাজশাহীতে অসহযোগ আন্দোলন।
[আগামীকাল প্রকাশিত হবে একাত্তরের ২রা মার্চের রাজশাহী।]