একাত্তরের মার্চের অসহযোগ আন্দোলনে রাজশাহী (১২ই মার্চ, ১৯৭১)

আপডেট: মার্চ ১২, ২০২১, ১২:১৪ পূর্বাহ্ণ

ড. মো. মাহবুবর রহমান
প্রফেসর (অব.), ইতিহাস বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সারাদেশে ছাত্র, শ্রমিক, পেশাজীবী ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের ব্যানারে সভা, সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। চলচ্চিত্র প্রদর্শকগণ অসহযোগ আন্দোলনের প্রতি সর্বাত্মক সমর্থন জানিয়ে সারাদেশে প্রেক্ষাগৃহ অনির্দিষ্টকাল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। রেলওয়ে কর্মচারীবৃন্দ, চারু ও কারুশিল্পীরা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে। জাতীয় লীগ প্রধান আতাউর রহমান খান ও পাঞ্জাবের কাউন্সিল লীগ নেতা পীর সাইফুদ্দীন বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডিস্থ বাসভবনে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত করেন।
লাহোরে স্থানীয় বুদ্ধিজীবী-রাজনৈতিক, ছাত্র, শ্রমিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এক যুক্ত বিবৃতিতে অবিলম্বে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানান। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সরকার প্রদত্ত খেতাব ও পদক বর্জন করার আহ্বান জানানোর প্রেক্ষিতে জাতীয় পরিষদ সদস্য মোহাম্মদ জহির উদ্দিন পাকিস্তান সরকার প্রদত্ত খেতাব বর্জন করেন। রেডিও পাকিস্তানের করাচি কেন্দ্রের জনপ্রিয় বাংলা খবর পাঠক সরকার কবীর উদ্দীন বেতারে বঙ্গবন্ধুর খবর প্রচার নিয়ন্ত্রণ করার প্রতিবাদে রেডিও পাকিস্তানে খবর পড়া বাদ দেন।
আওয়ামী লীগ নেতা ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এক বিবৃতিতে বাংলাদেশের জন্য পাঠানো খাদ্য বোঝাই মার্কিন জাহাজের গতিপথ বদল করে করাচি প্রেরণের ঘটনায় নিন্দা প্রকাশ করেন। স্বাধীন বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের এক বিবৃতির মাধ্যমে খাদ্য ব্যবসায়ীদের খাদ্য মজুদ করে জনজীবনে বিঘ্ন সৃষ্টি না করার জন্য হুঁশিয়ার করে দেয়। আরেকটি বিবৃতিতে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ বার্মা ইস্টার্ন, পাকিস্তান অয়েলস, দাউদ পেট্রলিয়াম প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে জ্বালানি সরবরাহ না করার জন্য নির্দেশ দেয়।
১২ই মার্চ মওলানা ভাসানী সদরঘাট টার্মিনালে এক পথসভায় ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের আহ্বান জানান। ন্যাপ (মোজাফ্ফর) কার্যনির্বাহী কমিটি এক সভায় অবিলম্বে সামরিক আইন প্রত্যাহার ও জনপ্রতিনিধিদের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানায়।
ওইদিন ‘জুট মার্কেটিং কর্পোরেশন ওয়াকার্স ইউনিয়ন’ অসহযোগ আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জ্ঞাপন করে এবং আওয়ামী লীগের সাহায্য তহবিলে তাদের একদিনের বেতন দান করে।
১২ই মার্চ হাসান হাফিজুর রহমানকে আহ্বায়ক করে ‘লেখক সংগ্রাম শিবির’ নামক একটি নতুন সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। জনগণের সার্বিক মুক্তি সংগ্রামে ভূমিকা রাখাই ছিল সংগঠনটির উদ্দেশ্য।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের চিকিৎসকগণ প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে ৬টা পর্যন্ত নিজ নিজ চেম্বারে অসহযোগ আন্দোলনে নিহত ও আহতদের পরিবারকে ফ্রি চিকিৎসা প্রদানের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন।
১২ই মার্চ ‘হার্ডওয়ার মার্চেন্ট সমিতি’, ‘চাটার্ড একাউন্ট ইনস্টিটিউট’, ‘হাউজিং এন্ড সেটেলমেন্ট কর্মচারী ইউনিয়ন’, ‘পূর্ব পাকিস্তান পাট ক্রয়-বিক্রয় ওয়াকার্স ইউনিয়ন’, ‘ব্যাংকের কর্মচারী ইউনিয়ন’, প্রভৃতি সংগঠন অসহযোগ আন্দোলনের প্রতি সংহতি ও একাত্মতা ঘোষণা করে।
রাজশাহীতে ১২ই মার্চ (১৯৭১)
ওইদিন ছাত্রলীগ ভুবন মোহন পার্কে একটি জনসভার আয়োজন করে। সভায় সভাপতিত্ব করেন রাজশাহী জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আবদুল কুদ্দুস। সভায় পাড়ায় পাড়ায়, গ্রামে গ্রামে সংগ্রাম পরিষদ গঠনের আহ্বান জানানো হয়। ওইদিন ওস্তাদ আব্দুল আজিজ বাচ্চুর নেতৃত্বে সুরবাণী সঙ্গীত বিদ্যালয়ের শিল্পীগণ রাস্তায় নেমে আসেন। তাঁরা বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করতে করতে দেশাত্মবোধক সঙ্গীত পরিবেশন করেন এবং সঙ্গীতের মাধ্যমে আন্দোলনরত জনতাকে উজ্জীবিত করেন। ওইদিন শিল্পী, সাংবাদিক ও সাহিত্যকগণ যৌথভাবে একটি শোক মিছিল বের করেন। মিছিলটি সাহেব বাজার চৌরাস্তার মোড়ে একটি পথসভার আয়োজন করে। পথসভায় রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. মযহারুল ইসলাম বক্তৃতা করেন। বক্তব্যে তিনি অসহযোগ আন্দোলন সফল করার লক্ষ্যে শিল্পী, লেখক ও সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। রাজশাহীতে ১২ই মার্চের ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন মুহাম্মদ লুৎফুল হক (রাজশাহী মহানগরী : অতীত ও বর্তমান, পৃ. ৪২১)। তিনি লিখেছেন, “১২ই মার্চ পত্রিকা মারফৎ রাজশাহী জেলা ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ওয়ালী ন্যাপ) এর সভাপতি আতাউর রহমান সামরিক বাহিনী কর্তৃক নিরীহ জনতার উপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ, হত্যা, পাইকারী হারে খানা তল্লাশী, গ্রেফতারের তীব্র প্রতিবাদ জানান। তিনি বলেন যে, জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করে জনগণের রায়ের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অক্ষুন্ন রাখার জন্য জনগণকে আহ্বান করেন। এদিন পত্রিকা মারফৎ ছাত্র ইউনিয়নের রাজশাহী জেলা শাখার সভাপতি সিকান্দার আবু জাফর এবং সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান বাদশা এক যুক্ত বিবৃতিতে গত ৩রা মার্চের গুলিবর্ষণ, গ্রেফতার ও নির্যাতনের তীব্র প্রতিবাদ জানান। তারা বিবৃতিতে উল্লেখ করেন, “কোন সভ্য দেশে সামরিক বাহিনীকে কখনও রেডক্রসের গাড়ীর উপর গুলিবর্ষণের শিক্ষা দেওয়া হয়না কারণ ইহা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী, কিন্তু এই বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষ বর্বরদের গুলির আঘাতে আহত হইলেও রাজশাহীতে এম্বুলেন্সের গাড়ী তাহাদের লইয়া আসিতে পারে নাই, কারণ সামরিক বাহিনীর গুলির শিকার হইয়াছিল এম্বুলেন্স। [দৈনিক সংবাদ, ১২ মার্চ, ১৯৭১]।”
১২ই মার্চ ঢাকার জাতিয় দৈনিক পত্রিকায় রাজশাহীর অসহযোগ আন্দোলন সম্পর্কে প্রকাশিত কয়েকটি সংবাদ শিরোনাম এখানে উল্লেখ করা হলো: Morning News : ‘No Compromise on basic questions, says Kamaruzzaman’, আজাদ : ‘রাজশাহীতে শোক মিছিল’, দৈনিক পাকিস্তান : ‘৩রা মার্চ রাজশাহীতে গুলি বর্ষণে শহীদ জাফরুল্লাহ্র ছবি’ (প্রথম পৃষ্ঠায় ক্যাপশনসহ ছাপা হয়), ‘এখনও সময় আছে চার দফা দাবি মেনে নিন রাজশাহীর জনসভায় কামারুজ্জামান’, ‘বিভিন্ন স্থানে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সমাবেশ, (রাজশাহী)’, ‘ঢাকার বাইরেও অসহযোগ (রাজশাহী)’। [আগামীকাল প্রকাশিত হবে ১৩ই মার্চের ঘটনা]