একাত্তরের মার্চের অসহযোগ আন্দোলনে রাজশাহী

আপডেট: মার্চ ১৩, ২০২১, ১২:১৫ পূর্বাহ্ণ

ড. মো. মাহবুবর রহমান
প্রফেসর (অব.), ইতিহাস বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
১৩ই মার্চ (১৯৭১) সামরিক আইন কর্তৃপক্ষ ১১৫ নং সামরিক আইন জারি করার মাধ্যমে ১৫ই মার্চ সকাল ১০ টার মধ্যে প্রতিরক্ষা বিভাগের বেসামরিক কর্মচারীদের কাজে যোগদানের নির্দেশ দেয়। নির্দেশে বলা হয় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজে যোগদান করতে ব্যর্থ হলে তাদেরকে চাকরিচ্যুত ও পলাতক ঘোষণা করা হবে এবং সামরিক আদালতে বিচার করে ১০ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদ- দেওয়া হবে। এই নির্দেশ জারির প্রতিবাদ করে বঙ্গবন্ধু একটি বিবৃতি দেন এবং উক্ত নির্দেশ প্রত্যাহার করার দাবি জানান। বঙ্গবন্ধু সামরিক কর্তৃপক্ষকে সকল প্রকার উস্কানিমূলক তৎপরতা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়ে বলেন জনগণকে যতই ভয় দেখানো হোক না কেন তারা তাদের সংগ্রাম চালিয়ে যাবে।
সকালে রমনা পার্কে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে এক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। শীতলক্ষায় নৌ-পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের উদ্যোগে এক বিশাল নৌ মিছিল বের করা হয়। স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ (নূরে আলম সিদ্দিকী, শাহজাহান সিরাজ, আ.স.ম. আব্দুর রব ও আব্দুল কুদ্দুস মাখন) এক যুক্ত বিবৃতিতে বাংলাদেশ ত্যাগকারীদের এদেশে তাদের বাড়ি-ঘর-সম্পদ বিক্রি করে বিদেশে অর্থ পাচারের কাজে সহযোগিতা না করার জন্য জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানান। ওইদিন ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া) বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণ থেকে এক বিশাল মশাল মিছিল বের করে।
১৩ই মার্চ ন্যাপের সভাপতি খান আবদুল ওয়ালী খান ও ন্যাপ নেতা গাউস বক্স বেজেঞ্জা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনার জন্য ঢাকায় আসেন। ঢাকা বিমানবন্দরে তাঁরা বলেন ‘সামরিক শাসন প্রত্যাহার ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর সম্পর্কিত শেখ মুজিবুর রহমানের দাবির সঙ্গে তাঁরা সম্পূর্ণ একমত।’
ওইদিন বিশিষ্ট শিল্পী জয়নুল আবেদীন ও সাবেক জাতীয় পরিষদ সদস্য আব্দুল হাকিম পাকিস্তান সরকার প্রদত্ত খেতাব ও পদক বর্জন করেন।
ঢাকাস্থ জাতিসংঘ ও পশ্চিম জার্মান দূতাবাসের কর্মচারী ও তাঁদের পরিবারবর্গসহ ইতালি, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার ২৬৫ জন নাগরিক বিমানে বাংলাদেশ ত্যাগ করেন (মাহমুদ হাসান, দিনপঞ্জি একাত্তর, পৃ.৫৯)।
বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চ ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার যে আহ্বান জানিয়েছিলেন তার সেই ডাকে সাড়া দিয়ে সারাদেশে গ্রামে-গঞ্জে-শহরে বন্দরে সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয়। অনেক স্থানে সামরিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা হয়। সকল অফিস আদালত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে। প্রতিটি ভবনের শীর্ষে কালো পতাকা উড়োনো হয়। সারাদেশে চলে মিছিল-মিটিং।
রাজশাহীতে ১৩ই মার্চ (১৯৭১)
রাজশাহীতে অসহযোগ আন্দোলন দিন দিন তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। যদিও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ছাত্র নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা রাজশাহী ত্যাগ করে নিজ নিজ এলাকায় চলে যায়, তবে তারা নিজ নিজ এলাকায় যেয়ে অসহযোগ আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়। এভাবে রাজশাহী থেকে শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে অসহযোগ আন্দোলনের ঢেউ হাজার হাজার গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে যায়। রাজশাহী শহরে বসবাসকারী ছাত্র, শিক্ষক, সাংস্কৃতিক কর্মী, লেখক, সাংবাদিক রাজনীতিবিদ, এমনকি নারীরা রাজশাহী শহরে অসহযোগ আন্দোলন দিন দিন তীব্র থেকে তীব্রতর করতে থাকে। পাড়ায় পাড়ায় গড়ে ওঠে নারীদের প্রতিরোধ কমিটি। সে সময় রাজশাহী কলেজ শাখার ‘মহিলা সম্পাদিকা’ ছিলেন আলেয়া খাতুন। তিনি বিভিন্ন জায়গায় সমাবেশে অংশ নেন এবং নারীদের বিশেষ করে, নারী সাংস্কৃতিক কর্মীদের অসহযোগ আন্দোলনের পক্ষে কাজ করতে আহ্বান জানান।
অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী যাদের আটক করা হয়েছিল, কিংবা যাদের বিরুদ্ধে সামরিক কর্তৃপক্ষ মামলা করেছিল তাদের লিগ্যাল এইড দেওয়ার জন্য ন্যাপের উদ্যোগে ৩ জন আইনজীবী সমন্বয়ে একটি আইনি পরামর্শ প্রদান কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির আইনজীবীরা ছিলেন অ্যাডভোকেট বীরেন্দ্রনাথ সরকার, অ্যাড. খন্দকার আশরাফ হোসেন ও অ্যাড. গোলাম আরিফ টিপু। (সংবাদ, ১৯.৩.১৯৭১; আজাদ ১৮৩.১৯৭১)।
১৩ই মার্চ রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মচারীদের এক যৌথ সভায় অসহযোগ আন্দোলনে শহিদ ও আহতদের পরিবারবর্গকে সাহায্যের জন্য তাঁদের একদিনের বেতন দান করেন। এদিন আওয়ামী লীগের মহিলা শাখা এক কর্মীসভা আয়োজন করে। ওইদিন শহরের লেখক, সাংবাদিক ও শিল্পীদের এক যৌথ সভায় নাট্যকর্মী আতাউর রহমানকে সভাপতি ও গীতিকার মুস্তাফিজুর রহমানকে আহ্বায়ক মনোনিত করে একটি সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। এদিনও শিল্পী সংগ্রাম পরিষদ শহরে গণসঙ্গীত পরিবেশন করেন। অসহযোগ আন্দোলনের প্রতি দিন দিন সমাজের সকল স্তরের শ্রেণি পেশার মানুষের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পেতে থাকে। অফিস-আদালতে কর্মবিরতি অব্যাহত থাকে। ভবনে ভবনে কালো পতাকা উড়ানো হয়। মানুষের মনে সামরিক কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ঘৃণা বাড়তেই থাকে।
এদিনও বোমা বানানোর রসদ সংগহের লক্ষ্যে আন্দোলনকারী তরুণেরা সায়েন্স ল্যাবরেটরির রাসায়নিক পদার্থ লুট করে। [আগামীকাল প্রকাশিত হবে ১৪ই মার্চের ঘটনা]