একাত্তরের মার্চের অসহযোগ আন্দোলনে রাজশাহী (২রা মার্চ, ১৯৭১)

আপডেট: মার্চ ২, ২০২১, ১২:১২ পূর্বাহ্ণ

ড. মো. মাহবুবর রহমান:
প্রফেসর (অব.), ইতিহাস বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়


পূর্ব প্রকাশিতের পর
রাজশাহীতে অসহযোগ আন্দোলনের সূচনা
১লা মার্চ (১৯৭১) রাজশাহীতে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। মিছিলে মিছিলে উত্তপ্ত হয় রাজশাহী শহর। ইয়াহিয়ার ঘোষণার প্রতিবাদে রাজশাহী কলেজে তাৎক্ষণিকভাবে এক প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। ‘এতে বক্তব্য রাখেন খুরশিদ বিন আলম, রুহুল আমিন মঞ্জু, আব্দুল কুদ্দুস (পরবর্তীকালে এম.পি.ও প্রতিমন্ত্রী), আব্দুস সামাদ, মাহফুজুর রহমান খান, হাবিবুর রহমান টুকু প্রমুখ’। (হোসনে আরা খানম, ১৯৭১ : অসহযোগ আন্দোলনের কালপঞ্জি, পৃ.১৫২-১৫৩)। সভা চলাকালে বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা ফ্লাগ স্ট্যান্ড থেকে পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। সভা শেষে একটা মিছিল রাজশাহী কোর্টের দিকে এগিয়ে যায়। মুহূর্তে শহরের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে ও ফ্লাগ স্ট্যান্ড থেকে পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে সেগুলি পুড়িয়ে ফেলে। রাজশাহী কোর্টের দিকে মিছিল অগ্রসর হওয়ার সময় মিছিলকারীরা পথে রেডিও স্টেশন, এসপি অফিস, ডিসি অফিস ও জেলা জজ অফিসের পতাকাও নামিয়ে পুড়িয়ে ফেলে। জেলা জজ অফিসে পতাকা নামাতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু মিছিলকারীরা কোনো বাধাই মানেনি। মিছিলকারীগণ কোর্ট থেকে লক্ষ্মীপুর হয়ে বর্ণালীর দিকে অগ্রসর হয় এবং বর্ণালী সিনেমা হলে প্রদর্শনরত অবস্থায় উর্দু ছবি ‘রোড টু সোয়াত’-এর প্রদর্শনী বন্ধ করে দেয়। উক্ত মিছিলে সিটি কলেজ ও মেডিকেল কলেজের ছাত্ররাও যোগ দেয়। বিকেলে ভুবনমোহন পার্কে এক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। জনসভা থেকে পরদিন ২রা মার্চ ধর্মঘট ঘোষিত হয়।
বঙ্গবন্ধুর ডাকে ২রা মার্চ ঢাকায় সর্বাত্মক ধর্মঘট পালিত হয়। হরতাল চলাকালে ঢাকা শহর মিছিলের নগরীতে পরিণত হয়। দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ মিছিলে অংশগ্রহণ করে। সকল সরকারি কর্মকা- অচল হয়ে পড়ে। প্রদেশটির যোগাযোগ সারাবিশ^ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধু ২রা মার্চ এক বিবৃতিতে বলেন, ‘এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সরকারি কর্মচারীসহ, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিটি বাঙালির পবিত্র কর্তব্য হচ্ছেÑ গণবিরোধী শক্তির সঙ্গে সহযোগিতা না করা। অধিকন্তু তাদের উচিত সবটুকু শক্তি দিয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দেওয়া’। ২রা মার্চ সকাল ১১টায় ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের উদ্যোগে ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ছাত্রলীগ সভাপতি নূরে আল সিদ্দিকী সমবেত ছাত্রদের বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে স্বাধীনতার সংগ্রাম চালিয়ে যাবার আহ্বান জানান। উক্ত সভায় বক্তব্য রাখেন ডাকসুর সহ-সভাপতি আ.স.ম. আবদুর রব ও ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক আবদুল কুদ্দুস মাখন। ২রা মার্চ হরতালের সময় ঢাকায় পুলিশের গুলিতে দুইজন নিহত ও কয়েকজন আহত হয়। সরকারি গুন্ডাবাহিনী বিভিন্ন স্থানে মিছিলের উপর হামলা করে। এর প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু এদিন সন্ধ্যায় এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পুলিশি হামলায় তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করেন ও ৭ই মার্চ পর্যন্ত আন্দোলনের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন। ঘোষণাতে ছিল : ৩রা মার্চ থেকে ৬ই মার্চ (১৯৭১) পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ৬:০০টা থেকে বেলা ২:০০ টা পর্যন্ত প্রদেশব্যাপী হরতাল পালন করা এবং ৭ই মার্চ বেলা ২:০০ টায় রেসকোর্স ময়দানে জনসভা আয়োজন করা।
২রা মার্চ এক ঘোষণার মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ ৩রা মার্চ ১৯৭১ ঢাকায় পল্টন ময়দানে এক জনসভা আয়োজনের ঘোষণা দেয়। ওইদিন পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলনের বিপ্লবী পরিষদ শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের উদ্দেশ্যে এক খোলা চিঠিতে সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমে স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানায়। ২রা মার্চ ছাত্র ইউনিয়নের (মতিয়া) কেন্দ্রীয় সম্পাদক মন্ডলী ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন শুরু করার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানায়। ওইদিন ন্যাপের (মোজাফ্ফর) উদ্যোগে পল্টন ময়দানে এক বিশাল জনসভা অনুষ্ঠিত হয়।
বঙ্গবন্ধুর ডাকে আন্দোলন জোরদার হতে থাকলে সরকার ২রা মার্চ রাত ৯টা থেকে ৩রা মার্চ সকাল ৭টা পর্যন্ত এবং পরে প্রতিদিন পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ঢাকা শহরে সন্ধ্যা ৭টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করে। কিন্তু কারফিউ জারির সঙ্গে সঙ্গে ছাত্র-জনতা ও শ্রমিকেরা কারফিউ ভেঙ্গে মিছিল বের করে ও শ্লোগান দেয় ‘সান্ধ্য আইন মানি না’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর’, জয় বাংলা, ইত্যাদি। কারফিউ ভঙ্গ করে মিছিল বের করা হলে সামরিক বাহিনী মিছিলে গুলিবর্ষণ করে। ফলে ৩ জন নিহত ও কমপক্ষে ৬০ জন আহত হয়।
রাজশাহীতে ২রা মার্চের কর্মসূচি
রাজশাহীতে ২রা মার্চ সর্বাত্মক ধর্মঘট পালিত হয়। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও দোকানপাট বন্ধ থাকে। প্রধান সড়কে মিছিল বের হয়। একটা মিছিল শহর থেকে জজকোর্ট পর্যন্ত যায় এবং বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে ফেলা হয়। রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ে সকল ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ থাকে। ৩রা মার্চ অনুষ্ঠিতব্য মাস্টার্স ও এল.এল.বি পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করা হয়। রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন পৃথক পৃথক মিছিল বের করে। মিছিল শেষে উভয় সংগঠনের পৃথক পৃথক ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। ওইদিন বিকেল ৪ টায় রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় থেকে একটা বিশাল মিছিল শহরে এসে প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। রাজশাহী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজেও (বর্তমানে রুয়েট) সর্বাত্মক ধর্মঘট পালিত হয়। মেডিকেল কলেজ ও সিটি কলেজের ছাত্ররা বিশাল মিছিল নিয়ে কোর্ট এলাকা পর্যন্ত যায়। প্রতিটি মিছিলে শ্লোগান ছিল : ‘আমি কে, তুমি কে বাঙালি বাঙালি’। ‘তোমার নেতা আমার নেতা, শেখ মুজিব শেখ মুজিব’। দুপুরে ভুবন মোহন পার্কে এক বিশাল জনসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন রাজশাহী শহর ছাত্রলীগের সভাপতি মো. সিরাজ (পরে ডাক্তার)। উক্ত সভা থেকে ৩রা মার্চে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ডাকা দেশব্যাপী ধর্মঘটের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করা হয়।
২রা মার্চ রাতে পাকিস্তান সরকার সামরিক আইন জারি করে। লে. জেনারেল সাহেবজাদা ইয়াকুব খান ‘খ’ অঞ্চলের সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত হন। সরকার সবধরনের মৌলিক অধিকার খর্ব করে মিছিল মিটিং, প্রচার-প্রচারণা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। বিদেশি সংবাদ মাধ্যমে এসব খবর প্রচারিত হয়। বিশেষ করে ঢাকায় সংঘটিত হতাহতের ঘটনায় রাজশাহীবাসীর মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। সকলে পরবর্তী দিনের কর্মসূচি সফল করার জন্য মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করে। এভাবেই ২রা মার্চ অতিবাহিত হয়। [আগামীকাল প্রকাশিত হবে ৩রা মার্চের ঘটনা। ৩রা মার্চ ছিল ঘটনাবহুল]