একাত্তরের মার্চের অসহযোগ আন্দোলনে রাজশাহী

আপডেট: মার্চ ২০, ২০২১, ১২:২৭ পূর্বাহ্ণ

ড. মো. মাহবুবর রহমান
প্রফেসর (অব.), ইতিহাস বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
২০শে মার্চ (১৯৭১) প্রেসিডেন্ট ভবনে ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর চতুর্থ দফা আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ওইদিন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, খোন্দকার মোশতাক আহমেদ, এএইচএম কামারুজ্জামান এবং ড. কামাল হোসেন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের পক্ষে ছিলেন পীরজাদা, কর্নেলিয়াস ও কর্নেল হাসান। ওইদিন আলোচনা সোয়া দুই ঘণ্টা চলে। আলোচনা শেষে প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে বের হয়ে এলে রাস্তায় অপেক্ষমান জনতা ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ শ্লোগান দেয়। বঙ্গবন্ধু নিজ বাসভবনে ফিরে এলে সেখানে অপেক্ষমান দেশি-বিদেশি সাংবাদিক তাঁকে ঘিরে ধরেন। তাঁদের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘কাল আবার বৈঠক হবে… সময় এলে আমি অবশ্যই সবকিছু বলব’। বঙ্গবন্ধু তাদের বলেন, জয়দেবপুরে সেনাবাহিনীর গুলিবর্ষণের ঘটনার প্রতি প্রেসিডেন্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ‘আমি আমার বক্তব্য বলেছি’। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘যদি প্রয়োজন হয় পশ্চিম পাকিস্তানি নেতৃবৃন্দসহ আমরা এক সঙ্গে আলোচনা করতে পারি’।
২০শে মার্চ কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে নৌবাহিনীর প্রাক্তন বাঙালি নৌ-সৈনিকদের এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে সম্মিলিত মুক্তিবাহিনী কমান্ড গঠনের জন্য সশস্ত্র বাহিনীর প্রাক্তন বাঙালি সৈনিকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। সমাবেশ শেষে নৌসেনারা কুচকাওয়াজ করে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে যান এবং তাঁর নেতৃত্বে মাতৃভূমির জন্য যেকোনো ত্যাগ শিকারের প্রতিশ্রুতি দেন।
এদিনও সারাদিন শহরের নানান প্রান্ত থেকে মিছিলের পর মিছিল বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে এসে সমবেত হয়। বঙ্গবন্ধু সমবেত জনতাকে বলেন, ‘মুক্তি পাগল সাড়ে সাত কোটি বাঙালির চূড়ান্ত বিজয়কে পৃথিবীর কোনো শক্তিই রুখতে পারবে না’। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের সার্বিক মুক্তি অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত, সত্যগ্রহ চলবে’। বঙ্গবন্ধু সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে বলেন, ‘যত বাধাই আসুক বাংলার মানুষের স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রাম চলবে। আপনারা আন্দোলনে ভাটা পড়তে দেবেন না’। (মাহমুদ হাসান, দিনপঞ্জি একাত্তর, পৃ. ৮৩-৮৪)।
২০শে মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু এক দীর্ঘ বিবৃতি দেন। বিবৃতিটির সার সংক্ষেপ নি¤œরূপ : ‘মুক্তি অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চলবে’। ‘শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে নিজেদের আন্দোলন প্রতিটি গ্রাম-শহর-নগরের নারী-পুরুষ-শিশুকে বাংলাদেশের দাবির পেছনে সুসংগঠিত করেছে… সর্বস্তরের মানুষ, মাঠের মানুষ, কারখানার শ্রমিক, ব্যাংক, অফিস, বন্দর ও সরকারি চাকরিতে নিযুক্ত কর্মচারী যারা আমাদের নির্দেশাবলির কাঠামোর মধ্যে অর্থনীতি রক্ষা করার জন্য নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন সবাইকে আমি অভিনন্দন জানাই…’। (ঐ, পৃ. ৮৪)।
উক্ত বিবৃতিতে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন যে, পরবর্তী ২৩শে মার্চ ‘লাহোর দিবস’ উপলক্ষে সারা বাংলাদেশে ছুটি থাকবে। এই বিবৃতির আলোকে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ঘোষণা করে যে, ২৩শে মার্চ হবে ‘পাকিস্তান প্রজাতন্ত্র দিবসের’ পরিবর্তে ‘প্রতিবাদ দিবস’। ওইদিন সকাল ৮ টায় বাংলাদেশের প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি অফিস আদালত ও বাসভবনে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের জন্য সংগ্রাম পরিষদের পক্ষে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। পতাকার বিবরণে বলা হয় ‘চতুস্কোণ বিশিষ্ট আয়তকার পতাকাটির দৈর্ঘ্য ৭ ইঞ্চি হলে প্রস্থ ৫ ইঞ্চি হবে। পতাকার কেন্দ্র বিন্দুতে থাকবে বাংলাদেশের সোনালী রঙের মানচিত্র। এই মানচিত্রের রঙে গোলাকার বৃত্ত থাকবে। বৃত্তের চারদিকে রঙ হবে কালচে সবুজ। ( হোসনে আরা খানম, ১৯৭১ অসহযোগ আন্দোলনের কালপঞ্জি, পৃ.৭৯)।
ওইদিন সকালে পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের প্রখ্যাত আইনজীবী ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম কৌসুলী এ. কে. ব্রোহী ঢাকায় আসেন। সন্ধ্যায় হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে কাউন্সিল মুসলিম লীগ প্রধান মমতাজ মোহাম্মদ খান দৌলতানা, ন্যাপ প্রধান খান আব্দুল ওয়ালী খান, জমিয়তে ওলামায়ে নেতা মওলানা মুফতি মাহমুদ, পাঞ্জাব কাউন্সিল লীগ প্রধান সরদার শওকত হায়াত খান, বেলুচ ন্যাপের প্রধান গাউস বক্স বেজেঞ্জা, পীর সাইফউদ্দিন প্রমুখ পশ্চিম পাকিস্তানি নেতা এক ঘরোয়া বৈঠকে মিলিত হন। (ঐ, পৃ.৮৫)।
রাজশাহীতে অসহযোগ আন্দোলন (২০শে মার্চ, ১৯৭১)
২০শে মার্চ সোনার দেশ পত্রিকা অফিসে মহিলা আওয়ামী লীগ সংগ্রাম কমিটির উদ্যোগে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন মিসেস জাহানারা কামারুজ্জামান। সভাশেষে মহিলা সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে একটি মিছিল বের করা হয়। ওইদিন বিভিন্ন মহল্লায় মহিলা আওয়ামী লীগের সংগ্রাম কমিটির শাখা গঠন করা হয়। এভাবে মহিলা সংগ্রাম কমিটি গঠনের ফলে শহরের নারীগণ উজ্জীবিত হন। ফলে অসহযোগ আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেতে থাকে।
ওইদিন ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া গ্রুপ)Ñ এর উদ্যোগে গঠিত গণবাহিনী ও কয়েকটি সাংস্কৃতিক সংগঠন মিছিল বের করে। স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে বুলনপুর ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ২০শে মার্চ থেকে রাজশাহীতে সড়ক পরিবহন চালু করা হয়। শহরের ভবনে ভবনে কালো পতাকা উত্তোলিত হয়। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে। ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ করে রাজশাহীতে ২৩শে মার্চ ‘প্রতিবাদ দিবস’ পালনের প্রস্তুতি শুরু করা হয়। [আগামীকাল প্রকাশিত হবে ২১শে মার্চের ঘটনা]