একাত্তরের মার্চের অসহযোগ আন্দোলনে রাজশাহী

আপডেট: মার্চ ২২, ২০২১, ১২:১৩ পূর্বাহ্ণ

ড. মো. মাহবুবর রহমান
প্রফেসর (অব.), ইতিহাস বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
২২শে মার্চ (১৯৭১) সকালে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ২৫ শে মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। সকালে রমনার প্রেসিডেন্ট ভবনে যখন ইয়াহিয়া-মুজিব-ভূট্টো আলোচনা বৈঠক চলছিল তখনই (বৈঠক চলাকালে) প্রেসিডেন্ট ভবনের মুখপত্র পরিষদ অধিবেশন স্থগিতের সিদ্ধান্ত সাংবাদিকদের জানান। ওইদিন প্রেসিডেন্ট ভবনের নিরাপত্তা পূর্বের চেয়ে বেশি জোরদার করা হয়। তা সত্ত্বেও জনতা প্রেসিডেন্ট ভবনের ফটকের অদূরে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ও ভূট্টোর বিপক্ষে শ্লোগান দিতে থাকে। ওইদিন বৈঠক সোয়া এক ঘণ্টা স্থায়ী হয়। বৈঠক শুরুর এক ঘণ্টা পূর্বে ভূট্টো প্রেসিডেন্ট ভবনে আসেন এবং প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টাদের সাথে আলোচনায় বসেন। বৈঠক শেষে বঙ্গবন্ধু প্রেসিডেন্ট ভবন ত্যাগের পরেও ভূট্টো এক ঘণ্টা সেখানে অবস্থান করেন। ওইদিন সন্ধ্যায় ভূট্টো নিজ উপদেষ্টাদের নিয়ে পুনরায় ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে বৈঠকে বসেন।
প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে নিজ বাসায় ফিরে বঙ্গবন্ধু জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করা প্রসঙ্গে দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘আমি তো আগেই ঘোষণা করেছি আমার দাবি (৪ দফা পূর্বশর্ত) পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আমরা জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে পারি না। আর সে অনুসারেই প্রেসিডেন্ট পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেছেন’। বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা আন্দোলনে আছি এবং লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।’
অপরদিকে ভূট্টো রাতে হোটেল লাউঞ্জে এক অনির্ধারিত সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ও আওয়ামী লীগ প্রধান বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনের জন্য একটি সাধারণ ঐকমত্যে পৌঁছেছেন। তবে এই ঐকমত্য অবশ্যই পিপলস পার্টির কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। পিপলস পার্টির অনুমোদন ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত পশ্চিম পাকিস্তানিরা মেনে নিতে পারে না।’ পিপলস পার্টি প্রধান জুলফিকার আলী ভূট্টো সাংবাদিক সম্মেলনে আরও বলেন, ‘আমরা চাই সর্বজনগ্রাহ্য একটি সমঝোতা। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসার আগে আওয়ামী লীগ, পিপলস পার্টি ও সেনাবাহিনীর মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তির প্রয়োজন রয়েছে। কেননা, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীও একটি পক্ষ। কারণ তারা ক্ষমতায় এবং তারাই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন।’ (মাহমুদ হাসান, দিনপঞ্জি একাত্তর, পৃ. ৮৮-৮৯)।
ওইদিনও ঢাকা শহর মিছিলে মিছিলে ও ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানে মুখরিত হয়। সকাল থেকেই বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের সামনে জনতার ঢল নামে। বঙ্গবন্ধু মাঝে মধ্যেই জনতার উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন। তিনি দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘সাত কোটি মানুষের মুক্তি অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চলবে। এই সংগ্রামে আমরা অবশ্যই জয়ী হব।’
“সংগ্রামী জনতার গণনবিদারী ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ ধ্বনি ও করতালির মধ্যে জনগণের নেতা ঘোষণা করেন, বন্দুক, কামান, মেশিনগান কিছুই জনগণের স্বাধীনতা রোধ করতে পারে না।
তিনি জনগণকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে যে কোনো ত্যাগ স্বীকারের জন্য তৈরি থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘সাত কোটি মানুষ যখন ঐক্যবদ্ধ তখন আমি দাবি আদায় করে ছাড়বই। আমরা তেইশ বছর ধরে মার খেয়েছি, আর মার খেতে রাজি নই। প্রয়োজন হলে আরও রক্ত দেব, তবু শহিদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না। এবার সুদে-আসলে বাংলার দাবি আদায় করে আনবই। মনে রাখবেন, সত্যের জন্য আমরা সংগ্রাম করছি। জয় আমাদের হবেই ইনশা আল্লাহ।” (দিনপঞ্জি একাত্তর, পৃ. ৯০)।
ওইদিন রাতে মুসলিম লীগ, ওয়ালী ন্যাপ, জমিয়তে ওলামায়ে প্রভৃতি দলের নেতৃবৃন্দ প্রেসিডেন্ট ভবনে ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে এক অনির্ধারিত বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠক দু’ঘণ্টাব্যাপি স্থায়ী হয়।
ওইদিন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান আলোচনার জন্য কাইউম পন্থী মুসলিম লীগের সভাপতি খান আব্দুল কাইউম খান ও জমিয়তে ওলামায়ে প্রধান মওলানা শাহ আহমদ নূরানীকে ঢাকায় আসার আহ্বান জানান। (দিনপঞ্জি একাত্তর, পৃ. ৯১)।
২২শে মার্চ পল্টনে সশস্ত্র বাহিনীর প্রাক্তন বাঙালি সৈনিকদের সমাবেশ ও কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে সৈনিক বক্তারা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জ্ঞাপন করেন। অবসর প্রাপ্ত মেজর জেনারেল এম. আই. মজিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশ কর্ণেল এম.এ.জি. ওসমানীও বক্তৃতা করেন। সভাশেষে সৈনিকদল কুচকাওয়াজ করে প্রথমে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পমাল্য অর্পণ করেন ও পরে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে যেয়ে বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করেন।
রাজশাহীতে অসহযোগ আন্দোলন (২২শে মার্চ, ১৯৭১)
২৫শে মার্চ অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করার ঘোষণা শুনে রাজশাহীতে ‘এক অজানা আশঙ্কা, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও উত্তেজনা বিরাজ করে’। রাজশাহী কলেজ মাঠে প্রকাশ্য সামরিক প্রশিক্ষণ শুরু হয়। ২৩শে মার্চের প্রতিরোধ দিবসের প্রস্তুতি হিসেবে ‘রাজশাহীর ছাত্রনেতাদের পরিকল্পনা ও তত্ত্বাবধানে ২২শে মার্চ কুচকাওয়াজের মহড়া’ অনুষ্ঠিত হয়। রাতে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে ‘মো. শরীফ উদ্দিনের মালিকানাধীন কাপড়ের দোকান থেকে কাপড় নিয়ে ঐ দোকানের কর্মচারী সমশের ও শীতলকে স্বাধীন বাংলার পতাকা তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়। তারা সারারাত জেগে পতাকা তৈরি করে’। (হোসনে আরা খানম, পৃ. ১৬৭)।
২২শে মার্চ রাজশাহীতে শিল্পী সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। ‘এই পরিষদের আহ্বায়ক ও যুগ্ম আহ্বায়ক নিযুক্ত হন যথাক্রমে মোস্তাফিজুর রহমান গামা ও আব্দুর রশিদ’। সংগ্রাম পরিষদের সদস্য ছিলেন, ‘আতাউর রহমান, আবদুল আজিজ বাচ্চু, আনোয়ারুল ইসলাম, অনিল বন্ধু রায় এবং সকল সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের প্রধানগণ’। (ঐ)।
এই কমিটির বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠান সুরবাণী সঙ্গীত বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়। হোসনে আরা খানম লিখেছেন, ‘প্রতিদিন সকালে-বিকেলে শিল্পী সংগ্রাম পরিষদের সদস্যগণ গলায় হারমোনিয়াম ঝুঁলিয়ে পথে পথে দেশাত্মবোধক ও চেতনা-উন্মেষকারী গণসঙ্গীত পরিবেশন করেন। তাছাড়া এই সংগ্রাম পরিষদের সদস্যরা মুক্তমঞ্চ নাটক ও উন্মুক্ত ট্রাকে নাটক পরিবেশন করেন। (ঐ)। সংগ্রাম পরিষদভুক্ত সাংস্কৃতিক সংগঠন ছিল সুরবাণী সঙ্গীত বিদ্যালয়, সঙ্গীত শিক্ষা ভবন, সূর্যশিক্ষা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, কাকলী প্রভৃতি। (ঐ)।
২২শে মার্চ রাতে কলেজিয়েট স্কুলের বিজ্ঞানাগার থেকে কেমিক্যালস লুট হয়। রাতে বিশ^বিদ্যালয় এলাকায় শক্তিশালী বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়।
ওইদিন মোজাফ্ফর ন্যাপের সহ-সভাপতি আতাউর রহমান রাজশাহীতে প্রদত্ত এক বিবৃতির মাধ্যমে সকল রাজবন্দীদের মুক্তি দাবি করেন এবং শেখ মুজিবকে এ ব্যাপারে সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান। [আগামীকাল প্রকাশিত হবে ২৩শে মার্চের ঘটনা]