একাত্তরের মার্চের অসহযোগ আন্দোলনে রাজশাহী

আপডেট: মার্চ ২৩, ২০২১, ১২:২১ পূর্বাহ্ণ

ড. মো. মাহবুবর রহমান
প্রফেসর (অব.), ইতিহাস বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
জাতীয় পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২০শে মার্চ ঘোষণা করেছিলেন যে, ২৩শে মার্চ ‘পাকিস্তান প্রজাতন্ত্র দিবসের’ পরিবর্তে ‘ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব দিবস’ বা ‘প্রতিবাদ দিবস’ হিসেবে পালিত হবে এবং ওইদিন সারা বাংলাদেশে ছুটি থাকবে। স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ২১শে মার্চ প্রতিবাদ দিবসের বিস্তারিত কর্মসূচি ঘোষণা করে যা’ আমরা ২১শে মার্চ সংখ্যায় উল্লেখ করেছি। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী ২৩শে মার্চ সূর্যোদয়ের সময় বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিফ্যাক্টো আওয়ামী লীগ সরকারের সদর দফতর ধানমন্ডির ৩২ নং রোডস্থ নিজ বাসভবনে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। পতাকা উত্তোলনের সময় ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’ গানটি সমবেত কণ্ঠে পরিবেশিত হয়। আওয়ামী লীগ স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সদস্যরা সামরিক কায়দায় জাতীয় পতাকাকে অভিবাদন জানায়। বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে প্রতিদিনের ন্যায় কালো পতাকাও উত্তোলন করা হয়। সূর্যাস্তের সময় আওয়ামী লীগ স্বেচ্ছাসেবকগণ আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা নামান।
২৩শে মার্চ ‘প্রতিরোধ দিবস’ পালন উপলক্ষে স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা তোলার পর প্রভাতফেরি করে প্রথমে আজিমপুর কবরস্থানে স্বাধিকার আন্দোলনের শহিদদের কবরে শ্রদ্ধা জানানো হয় এবং সেখান থেকে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে পুষ্পমাল্য অর্পণ করা হয়। সেখান থেকে মিছিল যায় আউটার স্টেডিয়ামে ‘জয় বাংলা বাহিনীর’ কুচকাওয়াজ ও মহড়া অনুষ্ঠানে। ‘স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রসৈনিক ছাত্রছাত্রী ও প্রাক্তন বাঙালি সৈনিকদের সমন্বয়ে গঠিত হয় ‘জয় বাংলা বাহিনী’। হাজার হাজার জনতার উপস্থিতিতে জয় বাংলা বাহিনীর আনুষ্ঠানিক কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা তোলার পর জয় বাংলা বাহিনীর সদস্যরা সামরিক কায়দায় পতাকার প্রতি অভিবাদন জানান। পতাকা তোলার পর জয় বাংলা বাহিনীর গার্ড অব অনার নেন কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের চার নেতা নূরে আলম সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজ, আ.স.ম. আবদুর রব ও আব্দুল কুদ্দুস মাখন। এরপর জয় বাংলা বাহিনীর প্রায় পাঁচশত সদস্য প্যারেড করে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে যান। জয় বাংলা বাহিনী বঙ্গবন্ধুকে সামরিক কায়দায় অভিবাদন জানান। ‘সালাম গ্রহণের পর বঙ্গবন্ধু বাম হাতে বাংলাদেশের পতাকা উর্দ্ধে তুলে ডান হাত মুক্তি সৈনিকদের দিকে বাড়িয়ে সাড়ে সাত কোটি মানুষের আত্মার স্পন্দন ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি দিয়ে তাদের অভিনন্দিত করেন’। (দিনপঞ্জি একাত্তর, পৃ. ৯২-৯৩)।
২৩শে মার্চ সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ‘ঢাকার রাজপথ সংগ্রামী জনতার প্রত্যয়দীপ্ত মিছিলের পদভারে প্রকম্পিত হয়’। নগরীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মিছিলের পর মিছিল বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের দিতে আসতে থাকে। প্রতিটি মিছিলেই শ্লোগান উচ্চারিত হয় ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’, ‘মহান জাতির মহান নেতা, বঙ্গবন্ধু লও সালাম’ প্রভৃতি। মিছিলে অংশগ্রহণকারী সকলের হাতে ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। মিছিলকারীদের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘যতদিন সাড়ে সাত কোটি বাঙালির সার্বিক মুক্তি অর্জিত না হবে, যতদিন একজন বাঙালি বেঁচে থাকবে ততদিন আমাদের সংগ্রাম চলবে’। জনতার উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আপনাদের প্রতি আমার নির্দেশ-শৃঙ্খলা বজায় রাখুন। সংগ্রাম চালিয়ে যান। আন্দোলনের কর্মপন্থা নির্ধারণের ভার আমার ওপর ছেড়ে দিন… বাংলাদেশের দাবির প্রশ্নে কোন আপস নেই। অনেক রক্ত দিয়েছি। প্রয়োজন হলে আরও রক্ত দিব। মুক্তির লক্ষ্যে আমরা পৌঁছাবই’। (দিনপঞ্জি একাত্তর, পৃ. ৯৩-৯৫)।
২৩শে মার্চ দৈনিক পত্রিকায় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকার ছবি ছাপানো হয়। পত্রিকার শিরোনাম হয় : A New Flag is born : ২৩শে মার্চ প্রেসিডেন্ট ভবন ও ক্যান্টনমেন্ট ছাড়া আর কোথাও পাকিস্তানি পতাকা ওড়েনি। চিন, ইরান, ইন্দোনেশিয়া ও নেপালের দূতাবাসে পাকিস্তানি পতাকা তোলা হলেও ছাত্র-জনতা তা নামিয়ে বাংলাদেশের পতাকা তোলে। ঢাকাস্থ ব্রিটিশ হাই কমিশন ও সোভিয়েট কনসুলেটে বাংলা দেশের পতাকা উত্তোলিত করা হয়। মার্কিন দূতাবাস কোনো পতাকাই উত্তোলন করেনি।
২৩শে মার্চ প্রেসিডেন্ট ভবনে ইয়াহিয়া খানের উপদেষ্টা বিচারপতি এ.আর কর্নেলিয়াস, লে. জেনারেল পীরজাদা, কর্নেল হাসান ও এম.এ আহমেদ এর সঙ্গে আওয়ামী লীগের সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ ও ড. কামাল হোসেনের দুপুরে এক ঘণ্টা ও সন্ধ্যায় দু’ঘণ্টা স্থায়ী বৈঠক হয়। আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ গাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা লাগিয়ে প্রেসিডেন্ট ভবনে যান।
২৩শে মার্চ ঢাকায় কনভেনশন মুসলিম লীগ সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম খান প্রথমে ভূট্টোর সাথে ও পরে ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে বৈঠক করেন। সন্ধ্যায় মিয়া দৌলতানা, ওয়ালী খান, মুফতি মাহমুদ, গাউস বক্স বেজেঞ্জা, শাহ আহমদ নূরানী ও সর্দার শওকত প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সাথে বৈঠক করেন। ওইদিন বিকেলে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর বাস ভবনে পশ্চিম পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ, যেমন কাউন্সিল মুসলিম লীগ প্রধান মিয়া মমতাজ মোহাম্মদ খান দৌলতানা, ন্যাপ প্রধান ওয়ালী খান, জমিয়তে ওলামায়ের প্রধান শাহ আহমদ নূরানী, জমিয়তের মহাসচিব মওলানা মুফতি মাহমুদ, পাঞ্জাব কাউন্সিল প্রধান সর্দার হায়াত খান ও বেলুচিস্তান ন্যাপের সভাপতি গাউস বক্স বেজেঞ্জা এক বৈঠকে মিলিত হন। এসময় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ, খোন্দকার মোশতাক আহমদ ও ড. কামাল হোসেন উপস্থিত ছিলেন।
২৩শে মার্চ বিকেলে সৈয়দপুরে সেনাবাহিনীর সঙ্গে গ্রামবাসীর মধ্যে সংঘর্ষে বেশ হতাহত হয়। সৈয়দপুর কারফিউ জারি করা হয়। সৈয়দপুরের বিহারিরা বাঙালিদের বাড়িঘরে হামলা ও লুঠতরাজ শুরু করে।
রাজশাহীতে অসহযোগ আন্দোলন (২৩ শে মার্চ, ১৯৭১)
রাজশাহীতে প্রভাতফেরির মাধ্যমে প্রতিবাদ দিবস পালনের সূচনা করা হয়। ওইদিন রাজশাহী শহরের সকল সরকারি ও বেসরকারি অফিস ভবনে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। যেসকল সরকারি অফিস ভবনে পাকিস্তানি পতাকা তোলা হয়েছিল সেগুলো নামিয়ে বাংলাদেশের পতাকা তোলা হয়। ন্যাপ নেতা এম. আতাউর রহমান, অ্যাডভোকেট মোহসীন, অ্যাডভোকেট আবদুল হাদি, ডা. আবদুল গাফ্ফার, ছাত্রনেতা আব্দুল কুদ্দুস, মতিউর রহমান, সাইদুর রহমান, শফিকুর রহমান রাজা প্রমুখ বিভিন্ন ভবন থেকে পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের কাজ তদারক করেন।
২৩শে মার্চ ছাত্র-যুবকদের নিয়ে গঠিত ‘জয় বাংলা বাহিনী’র বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা শহর প্রদক্ষিণ করে। সকলের হাতে ছিল বাংলাদেশের পতাকা ও কালো পতাকা। কারো কারো হাতে ছিল ডামি রাইফেল। ওইদিন রাজশাহী কলেজ মাঠে রাজশাহী মহকুমা আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর উদ্যোগে সামরিক কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়। ‘মহকুমা আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী প্রধান মতিউর রহমানের (পরবর্তীকালে অ্যাডভোকেট) নেতৃত্বে আয়োজিত কুচকাওয়াজ পরিচালনা করেন হারুনার রশিদ খান। কুচকাওয়াজে আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট আব্দুল হাদি অভিবাদন গ্রহণ করেন। এ কুচকাওয়াজ আয়োজনের সঙ্গে জাহাঙ্গীর হোসেন, আব্দুল মান্নান, মাহফুজার রহমান খান, আব্দুল মতিন প্রমুখ সংশ্লিষ্ট ছিলেন’। (মো. এনামুল হক, রাজশাহীতে মুক্তিযুদ্ধ, পৃ. ৬৫)। প্রতিবাদ দিবস উপলক্ষে রাজশাহী বেতারে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচারিত হয়। ওইদিন রাজশাহী শহরে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের এক মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। এভাবে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগোষ্ঠীও অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়। [আগামীকাল প্রকাশিত হবে ২৪শে মার্চের ঘটনা]