একাত্তরের মার্চের অসহযোগ আন্দোলনে রাজশাহী (২৪শে মার্চ, ১৯৭১)

আপডেট: মার্চ ২৪, ২০২১, ১২:১৬ পূর্বাহ্ণ

ড. মো. মাহবুবর রহমান
প্রফেসর (অব.), ইতিহাস বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
২৪ শে মার্চ (১৯৭১) : সারাদিন বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডিস্থ বাসভবনে ঢাকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মিছিলের পর মিছিল আসতে থাকে। বঙ্গবন্ধুও সমাগত মিছিলকারীদের উদ্দেশ্যে বিরতি দিয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন। বঙ্গবন্ধুর বক্তব্যের সারসংক্ষেপে ছিল : ‘২৫শে মার্চের মধ্যে সমস্যার কোনো সমাধান না হলে বাঙালিরা নিজেদের পথ নিজেরা বেছে নেবে।’ বঙ্গবন্ধু জনসাধারণকে যেকোনো পরিণতির জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আমি চূড়ান্ত সংগ্রামের নির্দেশ দেওয়ার জন্য বেঁচে থাকব কি-না জানিনা, আপনারা স্বাধীনতা আদায়ের জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাবেন…’।
ওইদিন সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট ভবনে আওয়ামী লীগ শীর্ষ নেতৃবৃন্দ (সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ ও ড. কামাল হোসেন) এবং প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টাদের মধ্যে দু’ঘণ্টা স্থায়ী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে তাজউদ্দীন আহমেদ সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেন যে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বক্তব্য শেষ হয়েছে, এখন প্রেসিডেন্টের উচিত তাঁর ঘোষণা দেওয়া। রাতে এক বিবৃতিতে আওয়ামী লীগের পক্ষে বলা হয় আলোচনা অনির্দিষ্টকাল চলতে পারে না। আওয়ামী লীগ আর দীর্ঘায়িত করতে প্রস্তুত নয়। (দিনপঞ্জি একাত্তর, পৃ. ৯৭-৯৯)। অপরদিকে ভূট্টো ও ইয়াহিয়া খান সংকটের সামরিক সমাধান দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। তারা শেখ মুজিবের সঙ্গে আলোচনায় কালক্ষেপণ করে অলক্ষ্যে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানে সেনা-সদস্য ও সামরিক সরঞ্জামাদি আনয়ন করেছিল। মওদুদ আহমেদ মন্তব্য করেছেন: ‘ইয়াহিয়া এবং মুজিবের মধ্যে যে সমঝোতাই হউক না কেন, বাস্তব অবস্থা ছিল এই যে, ইতিমধ্যে সেনাবাহিনী তাদের সবরকম যুদ্ধোপকরণ সজ্জিত করে যুদ্ধের পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ করে নেয়। অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে এম.ভি. সোয়াত নামের জাহাজ ৩রা মার্চ থেকেই চট্টগ্রামে নোঙ্গরের অপেক্ষায় বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছিল। পি.আই.এ. বিমানযোগে আরো ঘন ঘন ফ্লাইট -এ পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বেসামরিক পোশাকে সৈন্য আমদানি করা হচ্ছিল। সৈন্য এবং যুদ্ধোপকরণ বহনকারী সি-১৩০৬ বিমানগুলো অবতরণ করছিল ঢাকা বিমাননন্দরে। স্ট্রাটেজিক পয়েন্টগুলোতে বসানো হয়েছিল ভারী কামান ও মেশিনগান। পাকিস্তানের সুকৌশলী এস.এম.জি. কমান্ডো গ্রুপের ঢাকা আগমনের তথ্যও ঢাকা সাংবাদিকদের কাছে এসে পৌঁছাচ্ছিল। মুজিব এবং ইয়াহিয়া যেখানে দেনদরবার চালাচ্ছিলেন সেই গণভবনের ভেতরে ও বাইরে মোতায়েন করা হচ্ছিল ট্যাংক বহর। অন্যদিকে যত্রতত্র জনতার উপর সেনাবাহিনীর গুলিবর্ষণ এবং বাঙালি-অবাঙালিদের মধ্যে সম্প্রদায়িক দাঙ্গা পরিস্থিতিকে নিয়ে যাচ্ছিল আরো অবনতির দিকে।’ (ড. মো. মাহবুবর রহমান, বাংলাদেশের ইতিহাস ১৯৪৭-৭১, পৃ. ২৩৫)।
ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিহারি ও পাকিস্তানি সৈন্যদের সাথে জনতার সংঘর্ষ হয়। সৈয়দপুরে অবাঙালি ও পাকিস্তানি সৈন্যরা সেনানিবাসের পার্শ্ববর্তী বোতলাগাড়ি, গোলাহাট ও কুন্দুল গ্রাম ঘেরাও করে গণহত্যা চালায় ও প্রায় ১০০ জন বাঙালিকে হত্যা করে। আহত হয় ১০০০-এর বেশি সাধারণ মানুষ। রংপুর সেনানিবাস এলাকায় সেনাবাহিনীর সাথে সংঘর্ষে কমপক্ষে ৫০ জন নিরীহ বাঙালি নিহত হয়। ঢাকার মিরপুরে বিহারিরা বাঙালিদের বাড়ীঘর লুটপাট করে। চট্টগ্রামে পরিস্থিতির বিবরণ পাওয়া যায় দিনপঞ্জি একাত্তর গ্রন্থে (পৃ.৯৮) : ‘চট্টগ্রামে পাকসেনারা নৌ-বন্দরের ১৭ নং জেটিতে নোঙর করা এম.ভি. সোয়াত জাহাজ থেকে সমরাস্ত্র খালাস করতে গেলে বীর চট্টলার ৫০ হাজার মানুষ তাদের ঘিরে ফেলে। বিকেলে সেনাবাহিনীর অস্ত্র নামানোর জন্য বন্দর শ্রমিকদের নিয়োগ করতে চাইলে শ্রমিকরা তা অস্বীকার করে। পরে শরের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার ছাত্র-শ্রমিক-জনতা বন্দরে গিয়ে হাজির হয়। জনতা জেটি থেকে কদমতলী পর্যন্ত ৪ মাইল পথের বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেড রচনা করেন। সেনাবাহিনীর সদস্যরা জাহাজ থেকে কিছু অস্ত্র নিজেরাই খালাস করে। সেসব অস্ত্রশস্ত্র ১২টি ট্রাকে তুলে নতুন পাড়া সেনানিবাসে আনার চেষ্টা করে। ১৭ নং জেটির পাশের ডবল মুরিং রোডের একটি ব্যারিকেডে দাঁড়িয়ে জনতা তাদের পথরোধ করে। রাত সাড়ে ১০ টা পর্যন্ত পাকসেনা ও হাজার হাজার লোক ব্যারিকেডের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকার পর সেনাবাহিনী গুলিবর্ষণ শুরু করে। বেপরোয়া গুলির মুখেও নিরস্ত্র জনতা দুর্ভেদ্য ব্যারিকেড রচনা করে থাকে। এ রাতে সংঘর্ষে কমপক্ষে ২০০ শ্রমিক-জনতা শহীদ হন।’
২৪শে মার্চ পশ্চিম পাকিস্তানি নেতৃবর্গ পি.আই.এ- এর ফ্লাইটে ঢাকা ত্যাগ করেন। জুলফিকার আলী ভূট্টো দুপুরে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সাথে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি পাকিস্তানের অখ-তা রক্ষার জন্য জীবন দান করতে প্রস্তুত’।
অসহযোগ আন্দোলনে রাজশাহী (২৪শে মার্চ, ১৯৭১)
নগরবাসী যখন অসহযোগ আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিলেন সেসময় মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে রাজশাহীস্থ ইপিআর সেক্টরে কর্মরত বাঙালি সৈন্যদেরকে নিরস্ত্র করা হয়। তবে কিছু বাঙালি ইপিআর সৈন্য বেসামরিক পোশাকে জনতার সঙ্গে মিশে যায়। সেসময় পুলিশ লাইনের অস্ত্রাগারের চাবি হস্তগত করেন হাবিলদার আতিয়ার রহমান। তিনিই রাজশাহী পুলিশ লাইনে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। পুলিশ লাইনের অবাঙালি সুবেদার, হাবিলদার ও সিপাহীরা মনস্তত্ত্বিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। এভাবে পুলিশ লাইনের বাঙালি সিপাহীগণ প্রতিরোধ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হন।
২৪শে মার্চ রাজশাহীবাসীর মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করে। সারাদেশে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন নরকীয় ঘটনাবলীর কথা তারা বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা ও আকাশবাণীর মাধ্যমে জেনে যায়।
বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য-বিবৃতি থেকে আভাস পাওয়া যায় যে আলোচনা ফসপ্রসু হবে না। পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষ ও ভূট্টো অস্ত্রের শক্তিতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। এমনি পরিস্থিতিতে সারাদেশের ন্যায় রাজশাহীবাসীও যেকোন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত হন। [আগামীকাল প্রকাশিত হবে ২৫শে মার্চের ঘটনা]