একাত্তরের মার্চের অসহযোগ আন্দোলনে রাজশাহী

আপডেট: মার্চ ২৫, ২০২১, ১২:১৪ পূর্বাহ্ণ

ড. মো. মাহবুবর রহমান
প্রফেসর (অব.), ইতিহাস বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
২৫ শে মার্চ (১৯৭১): বঙ্গবন্ধু বা আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের সাথে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া কিংবা তাঁর উপদেষ্টাদের কোনো আলোচনা হয় নি। কিন্তু ভূট্টোর ইয়াহিয়া খানের মধ্যে বৈঠক হয়েছে। ওইদিন দুপুর পর্যন্ত প্রায় সারাক্ষণ বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ যেমন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ, এ.এইচ.এম. কামারুজ্জামান, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও ড. কামাল হোসেনকে নিয়ে তাঁর বাসভবনের লাইব্রেরি রুমে বসে থাকেন। মাঝে মধ্যে বঙ্গবন্ধু তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত করতে আসা ছাত্র নেতৃবৃন্দ, আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য অঙ্গদলের নেতা-কর্মীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে এক এক করে বিদায় করে দেন। বিকেলে লন্ডনস্থ আওয়ামী লীগ নেতা জাকারিয়া চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করেন। বিকেল তিনটায় শেখ ফজলুল হক মণি বঙ্গবন্ধুর সাথে তাঁর শয়নকক্ষে আলোচনা করেন। সন্ধ্যায় ছাত্রনেতৃবৃন্দ এবং রাত ৮ টায় এইচএমকামারুজ্জামান, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, তাজউদ্দীন আহমেদ ও সৈয়দ নজরুল ইসলাম পুনরায় বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করেন। রাত ১১ টায় সিরাজুল আলম খান, আ.স.ম. আবদুর রব ও শাজাহান সিরাজ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলেন। রাত সাড়ে এগারটায় জাকারিয়া চৌধুরীর ছোট ভাই ‘ঝন্টু’ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাত করে তাঁকে বাসা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার অনুরোধ করেন। বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের এরপরের সংক্ষিপ্ত বিবরণী পাওয়া যায় বঙ্গবন্ধুর জামাতা এম.এ. ওয়াজেদ মিয়ার বিবরণীতে (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ, পৃ. ৭৬-৭৯)। তিনি লিখেছেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞেস করলাম তিনি কোথায় যাবেন এবং কামাল, জামালকে আমাদের (নতুন ভাড়া বাড়িতে) সঙ্গে নিয়ে যাবো কিনা। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘আমার এখন অন্যত্র চলে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। তাই তারা আমাকে মারতে চাইলে এ বাসাতেই মারতে হবে। কামাল অন্যত্র চলে গেছে। জামাল ওর মাকে ছেড়ে থাকতে পারে না, সে আমাদের সঙ্গে থাকবে’। ওয়াজেদ মিয়া লিখেছেন, ‘(প্রথমে) আমি আমার নতুন ভাড়া বাড়ীতে পৌঁছাই রাত বারটার দিকে… এর মিনিট বিশেক পর হাসিনা, রেহানা, জেলী ও বাসার কাজের ছেলে ওয়াহিদুর রহমান বঙ্গবন্ধুর গাড়ীতে সেখানে পৌঁছায়’। ‘কিছুক্ষণের মধ্যে চারদিক, বিশেষ করে ইপিআরÑ এর পিলখানাস্থ হেড কোয়ার্টারের দিকে গোলাগুলি ও কামানের আওয়াজ শুনতে পাই…’। (ঐ. পৃ. ৭৭)।
২৫শে মার্চ সারাদিন জনমনে উত্তেজনা-উৎকণ্ঠা বিরাজ করে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে গোটা বাংলাদেশে যথারীতি অসহযোগ আন্দোলন পালিত হয়। মিছিল-মিটিং অব্যাহত থাকে। রাত নয়টায় গোটা ঢাকা শহরে খবর ছড়িয়ে পড়ে যে ইয়াহিয়া খান গোপনে রাত ৮ টায় ঢাকা ত্যাগ করেছেন। খবর আসে ক্যান্টনমেন্টে সৈন্যরা যুদ্ধ সাজে সজ্জিত হচ্ছে। সেনা অভিযান প্রতিহত করার জন্য ছাত্র-জনতা সারা ঢাকায় ব্যারিকেড রচনা শুরু করে।
অবশেষে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী রাত সাড়ে ১১ টায় ‘অপারেশন সার্চলাইট’ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে ছাউনি থেকে বেরিয়ে আসে ও ঢাকার নিরস্ত্র জনগণের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা ইতিহাসের বর্বরতম নরহত্যা সংগঠিত করে।… ‘ফার্মগেটের মুখে হানাদার বাহিনী প্রথম প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়।… সেনাবাহিনীকে বাধা দিলে তারা মেশিনগান ব্যবহার করে পাখির মতো স্বাধীনতা সংগ্রামীদের গুলি করে হত্যা করে। ডিনামাইট দিয়ে ব্যারিকেড উড়িয়ে দিয়ে শহরে প্রবেশ করে। রাস্তায় রাস্তায় শুরু হয় খ- যুদ্ধ। সেনাবাহিনী প্রতিরোধকারী বাঙালি যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে ট্যাংক-মর্টার-রকেট ব্যবহার করে। শুরু হয় চারদিকে গুলি আর গোলার বিস্ফোরণ। মানুষের আর্তচিৎকার।… মধ্যরাতেই সেনাবাহিনী পিলখানা রাজারবাগ, নীলক্ষেত আক্রমণ করে। সেনারা পিলখানা ও নীলক্ষেতে প্রচ- প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়। রাত দুটোর সময় ট্যাংক, ও মর্টারের মাধ্যমে নীলক্ষেত ও বিশ^বিদ্যালয় এলাকা দখল করে। প্রচ- লড়াইয়ের পর পিলখানা ইপিআর ব্যারাকের পতন হয়। রাজারবাগ পুলিশ লাইন হামলাকারীদের কবজায় আসে রাত দুটায়। সেনাবাহিনীর মেশিনগানের গুলিতে, ট্যাংক মর্টারের গোলায়, আগুনের লেলিহান শিখায় নগরীর রাত হয়ে ওঠে বিভীষিকাময়।’… (মাহমুদ হাসান, দিনপঞ্জি একাত্তর, পৃ.১০৩-১০৪)।
‘কিন্তু এর ফল হয় উল্টো। ঢাকার নিরস্ত্র জনগণের বিরুদ্ধে পাক- সেনাবাহিনীর এই অঘোষিত যুদ্ধের প্রতিবাদে বাঙলাদেশে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়। পাকিস্তানিবাহিনী ২৫শে মার্চ রাত ১টা ১০ মিনিটে (২৬ মার্চের প্রথম প্রহর) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বন্দি করে এবং পরে গোপনে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়। সেখানে সিয়ানওয়ালী কারাগারে তাঁকে বন্দি করে রাখা হয়। বিদেশী পত্রপত্রিকায় তাঁর বন্দি হওয়ার খবর প্রকাশিত হয় ১ এপ্রিল।
বঙ্গবন্ধু বন্দি হওয়ার পূর্বেই চট্টগ্রামস্থ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব এম.এ. হান্নানের নিকট স্বাধীনতার ঘোষণা বাণী প্রেরণ করেন। বাণীটি স্বাধীনতার দলিলপত্র তৃতীয় খন্ডে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। বাণীটি নিম্নরূপ:

“This may be my last message, from today Bangladesh is independent. I call upon the people of Bangladesh wherever you might be and with whatever you have, to resist the army of occupation to the last. Your fight must go on until the last soldier of the Pakistan occupation army is expelled from the soil of Bangladesh and final victory is achieved.”

বাংলা অনুবাদ: “আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। এই আমার শেষ কথা। যে যেখানেই থাকুন না কেন সকলের প্রতি আমার আবেদন রইল, যার কাছে যা আছে তাই নিয়ে দখলদার বাহিনীর মোকাবিলা করুন এবং বাংলার মাটি থেকে পাক দখলদার বাহিনীকে সমূলে উৎখাত করে চূড়ান্ত বিজয় না-হওয়া পর্যন্ত লড়ে যান।”
‘২৭শে মার্চ কালুরঘাটে স্থাপিত স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র (পরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র) থেকে মেজর জিয়াউর রহমান শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। এই ঘোষণাটিও স্বাধীনতার দলিলপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে’ (ড. মো. মাহবুবর রহমান, বাংলাদেশের ইতিহাস : ১৯৪৭-৭১, পৃ. ২৩৫-২৩৬)।
অসহযোগ আন্দোলনে রাজশাহী (২৫শে মার্চ, ১৯৭১)
২৫শে মার্চ সারাদিন রাজশাহী শহরে বিক্ষোভ মিছিল ও পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। এদিন জনমনে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করে। বিকেলে ভুবন মোহন পার্কে আয়োজন করা হয় গণসঙ্গীত অনুষ্ঠান। প্রতিবাদী ওই গণসঙ্গীতের গ্রন্থনা করেন রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল হাফিজ। গ্রন্থনাটির সঞ্চালক ছিলেন ফরহাদ খান ও মনোয়ারা খানম। ‘গ্রন্থনাটির মধ্যে রবীন্দ্রনাথের ‘বাঁধা দিলে বাঁধবে লড়াই, মরতে হবে/পথ জুড়ে কী বড়াই, সরতে হবে’ গানটি সকলকে আলোড়িত করেছিল’ (বরেন্দ্রের বাতিঘর, পৃ.১৬৫)। গণসঙ্গীত আসরে হাজার হাজার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। ভুবন মোহন পার্কে গণসঙ্গীতানুষ্ঠানের পর মঞ্চস্থ হয় ‘রক্ত কথা বলে’ নামক নাটক। নাটকটি সম্পর্কে মো. আব্দুর রশিদ লিখেছেন : ‘বিপুল দর্শকের সামনে অনুষ্ঠিত এ নাটকে যারা নির্ভিকভাবে অংশ নিয়েছিলেন যতদূর মনে পড়ে তারা হলেন, সর্ব জনাব আতাউর রহমান, জাফর ইমাম, জাহাঙ্গীর, ছানা, ননী, বদিউল আলম ভুলু, মতি, মুস্তাকিম, মুস্তাফিজুর, মরহুম আফছার মৃধা, আমজাদ, মরহুম রশিদ, কায়েস, আইয়ুব, মানিক, পলি, লালুমিয়া, লালুভাই, আকবর, গীতা, গৌরী ও আমি। মনে পড়ছে আমি ছিলাম পাকিস্তানী মেজর হুক্কা খানের ব্যঙ্গ চরিত্রে। ভাবতে অবাক লাগে তখনও আমরা জানি না দেশের ভবিষ্যত কোন পথে? অথচ নাট্যকার কাহিনী করলেন, সমগ্র দেশে আন্দোলন চলছে, আন্দোলন রূপ নিল সশস্ত্র সংগ্রামে, তরুণরা গড়লো মুক্তিবাহিনী, মরণপণ লড়াই করে ওরা আনলো স্বাধীনতা। নাটকের রূপসজ্জায় ছিলেন দুখু মাষ্টার ও লালুভাই। আলোক সম্পাতে টি.টি. কলেজের ইলেকট্রিশিয়ান জনাব রশিদ এবং আবহসঙ্গীতে ছিলেন জনাব আবদুল আজিজ বাচ্চু। এ নাটক মঞ্চায়নের উল্লেখযোগ্য ভূমিকায় ছিলেন একজন মানুষ নাট্যমোদী না হয়েও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে কিভাবে নিঃস্বার্থভাবে সব রকম সহায়তা দিয়ে নাটক মঞ্চায়ন সম্ভব হতে পারে তার দৃষ্টান্ত সর্বজন শ্রদ্ধেয় শহিদ খোকা ভাই। তিনি নাটক মঞ্চায়ন শেষ করে গভীর রাতে বাড়ি ফেরার পর মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তাঁকে পাক-বাহিনী বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে হত্যা করে’ (‘পঁচিশে মার্চে একাত্তরে ভুবন মোহন পার্কে নাটক’, মুক্তিযুদ্ধে রাজশাহী, পৃ. ২৫-২৬)।
নাটকটি চলে গভীর রাত পর্যন্ত। নাটক চলা অবস্থায় রাজশাহী ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের হয়ে এসে পাকিস্তানি সৈন্যরা রাজশাহী শহরে গণহত্যা শুরু করে। এখবর ভুবন মোহন পার্কে পৌঁছামাত্র নাটকের কলাকুশলী ও দর্শক শ্রোতারা ভয়ে-আতঙ্কে উক্ত স্থান ত্যাগ করেন। এভাবেই শেষ হয় অসহযোগ আন্দোলন পর্ব। পরদিন ২৬শে মার্চ শুরু হয় প্রতিরোধ যুদ্ধ।
২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনারা রাজশাহী শহরে ১২ জনকে হত্যা করে।
রাজশাহী পরিস্থিতি ২৬শে মার্চ, ১৯৭১
২৬শে মার্চ ভোর ৫টায় পাকিস্তানি বাহিনী রানীবাজারের দেওয়ান সিদ্দিক হোসেনের বাড়ি থেকে তাঁকে ও তাঁর শ্যালক খন্দকার আলী আফজালকে ধরে নিয়ে যায়। তাঁরা আর ফিরে আসেননি। দেওয়ান সিদ্দিক হোসেন রেভিনিউ অফিসার ছিলেন।
২৬শে মার্চ রাজশাহী বিভাগের পুলিশের ডিআইজি মামুন মাহমুদকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নির্দেশ দিয়েছিল রাজশাহী পুলিশ লাইনের বাঙালি সদস্যদের আত্মসমর্পণ করতে এবং পুলিশ লাইনের সকল অস্ত্রশস্ত্র সেনাবাহিনীর কাছে জমা দেওয়ার জন্য। তিনি সে আদেশ অগ্রাহ্য করায় তাঁকে ২৬শে মার্চ সন্ধ্যা ৬ টার দিকে ব্রিগেডিয়ার আব্দুল্লাহ্র ওয়ারলেসের ডাকে বাসা থেকে সেনানিবাসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যান। এরপর তাঁর এবং তাঁর ড্রাইভারের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
এরপর রাজশাহীতে ২৭ শে মার্চ থেকে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয়।