একাত্তরের মার্চের অসহযোগ আন্দোলনে রাজশাহী

আপডেট: মার্চ ৩, ২০২১, ১২:৪৫ পূর্বাহ্ণ

ড. মো. মাহবুবর রহমান
প্রফেসর (অব.), ইতিহাস বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
বঙ্গবন্ধুর ডাকে ১৯৭১ সালের ৩রা মার্চ সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে সর্বাত্মক ধর্মঘট পালিত হয়। এইদিন ‘পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ’ কর্তৃক ঢাকায় পল্টন ময়দানে আয়োজিত এক জনসভায় স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।
…এই সভা পাকিস্তানি উপনিবেশিবাদের কবল হইতে মুক্ত হইয়া স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা, শোষণহীন সমাজব্যবস্থা কায়েমের জন্য সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি ও নির্ভেজাল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করিয়া স্বাধীন বাংলাদেশে কৃষক-শ্রমিক কায়েমের শপথ গ্রহণ করিতেছে। এই সভা স্বাধীন বাংলার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে পূর্ণ আস্থা রাখিয়া তাহার সকল সংগ্রাম চালাইয়া যাওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতেছে। এই সভা দলমত নির্বিশেষে বাংলার প্রতিটি নর-নারীকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রাম চালাইয়া যাওয়ার আহ্বান জানাইতেছে।
সভায় ‘স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের ঘোষণা ও কর্মসূচি’ শীর্ষক একটি ইশতেহার প্রচার করা হয় (ইশতেহার নং-এক)Ñ এতে বলা হয় যে, তিনটি লক্ষ্য অর্জন করার জন্য স্বাধীন-সার্বভৌম ‘বাংলাদেশ’ গঠন করা হবে। লক্ষ্যগুলো হলো :
১. ‘স্বাধীন ও সার্বভৌম ‘বাংলাদেশ’ গঠন করে পৃথিবীর বুকে বলিষ্ঠ বাঙালি জাতি সৃষ্টি ও বাঙালির ভাষা, সাহিত্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির পূর্ণ বিকাশের ব্যবস্থা করতে হবে।
২. স্বাধীন ও সার্বভৌম ‘বাংলাদেশ’ গঠন করে অঞ্চলে অঞ্চলে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে বৈষম্য নিরসনকল্পে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি চালু করে কৃষক-শ্রমিক রাজ্য কায়েম করতে হবে।
৩. স্বাধীন ও সার্বভৌম ‘বাংলাদেশ’ গঠন করে ব্যক্তি, বাক ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতাসহ নির্ভেজাল গণতন্ত্র কায়েম করতে হবে।’
প্রস্তাবে বাংলাদেশের কথিত স্বাধীনতা আন্দোলন পরিচালনার জন্য নি¤œলিখিত কর্মপন্থা গ্রহণ করার কথা বলা হয় :
ক. ‘বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রাম, মহল্লা, থানা, মহকুমা, শহর ও জেলায় ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম কমিটি’ গঠন করতে হবে।
খ. সকল শ্রেণীর জনসাধারণের সহযোগিতা কামনা ও তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে।
গ. শ্রমিক এলাকায় শ্রমিক ও গ্রামাঞ্চলে কৃষকদের সুসংগঠিত করে গ্রামে গ্রামে, এলাকায় এলাকায় মুক্তিবাহিনী গঠন করতে হবে।
ঘ. হিন্দু-মুসলমান ও বাঙালি-অবাঙালি সাম্প্রদায়িক মনোভাব পরিহার করতে হবে এবং সম্প্রীতি বজায় রাখতে হবে।
ঙ. স্বাধীনতা সংগ্রামকে সুশৃঙ্খলার সাথে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য পারস্পরিক যোগাযোগ রক্ষা করতে হবে এবং লুটতরাজসহ সকল প্রকার সমাজবিরোধী ও হিংসাত্মক কার্যকলাপ বন্ধ করতে হবে।’
উক্ত ইশতেহারে উল্লেখ করা হয় যে, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের সর্বাধিনায়ক।’ ইশতেহারে নি¤œলিখিত স্লোগান উচ্চারণের আহ্বান জানানো হয় :
‘স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশÑ দীর্ঘজীবী হউক; স্বাধীন কর স্বাধীন করÑ বাংলাদেশ স্বাধীন কর; স্বাধীন বাংলার মহান নেতাÑ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব; গ্রামে গ্রামে দূর্গ করÑ মুক্তিবাহিনী গঠন কর; বীর বাঙালি অস্ত্র ধরÑ বাংলাদেশ স্বাধীন কর; মুক্তি যদি পেতে চাওÑ বাঙালিরা এক হও।’ [বাংলাদেশের ইতিহাস ১৯৪৭-৭১, পৃ.২২৮-২২৯]
উক্ত জনসভায় বঙ্গবন্ধু ভাষণ দেন। ভাষণে তিনি তার নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বান জানান। ক্ষমতা হস্তান্তরিত না হওয়া পর্যন্ত সকল ধরনের ট্যাক্স প্রদান বন্ধ রাখার জন্য তিনি জনগণকে নির্দেশ দেন।
৩রা মার্চ ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ মিছিল ও প্রতিবাদ সভায় অংশগ্রহণ করেন।
রাজশাহীতে ৩রা মার্চের আন্দোলন
এইদিন রাজশাহীতে পূর্ণদিবস সর্বাত্মক ধর্মঘট পালিত হয়। সকল যানবাহন ও দোকানপাট বন্ধ থাকে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীগণ মিছিলে অংশগ্রহণ করেন ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় থেকে রাজশাহী কোর্ট চত্বর পর্যন্ত দীর্ঘ ৮ কিলোমিটার জুড়ে খ- খ- মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। মিছিল থেকে শ্লোগান দেয়া হয় : ‘জাগো জাগো বাঙালি জাগো’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর’, ‘তুমি কে, আমি কে, বাঙালি বাঙালি’, ‘তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘ঢাকা, না পিন্ডি, ঢাকা ঢাকা’, ইত্যাদি। মিছিলে অসংখ্য ছাত্র, যুবক, সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দেয়। বেলা এগারটার দিকে একটা মিছিল মালোপাড়াস্থ টেলিফোন এক্সচেঞ্জের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় টেলিফোন ভবনের ছাদে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বিনা উস্কানিতে মিছিলের উপর আচমকা গুলিবর্ষণ করেন। সেখানে বাচ্চু নামক দশম শ্রেণির এক ছাত্র নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হয়। গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ জনতা টেলিফোন লাইনের তার কেটে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ও বিদ্যুতের মিটার ভেঙ্গে ফেলে। সেসময় একদল বিক্ষোভকারী গণকপাড়া মোড়ে ইউনাইটেড ব্যাংকের উর্দুতে লেখা সাইনবোর্ড ভেঙ্গে ফেলে। ওইদিন বিকেলে ভুবন মোহন পার্কের জনসভা শেষে লোকজন বাসায় ফেরার পথে সাহেব বাজারস্থ শাহী হোটেলের সামনে পৌঁছুলে সামরিক বাহিনীর ট্রাক থেকে সৈন্যরা জনতার উপর গুলিবর্ষণ করে। সেখানে জাফর রেজা খান নামক এক কাপড় ব্যবসায়ী ও বিশু নামক এক রিকশাচালক ঘটনাস্থলেই নিহত হন। কমপক্ষে একশ ব্যক্তি আহত হন। দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকায় ১৮ই মার্চ (১৯৭১) হতাহত নামের তালিকা প্রকাশ করে, যেমন:
শহীদ : ১। জাফর আলী (বস্ত্র ব্যবসায়ী), ২। বিশু (রিক্সা শ্রমিক)
আহত : ১। নিজামূল হুদা (৩৮) বেতার শিল্পী (তার পা কাটা হয়েছে), ২। রফিকুল ইসলাম (১৩) ছাত্র, ৩। সিদ্দিকুর রহমান (১৯) ছাত্র, ৪। আনোয়ার হোসেন (১৮) এস.এস.সি পরীক্ষার্থী (পা কাটা হয়েছে), ৫। ফজলুর রহিম সরকার (৩০) এলএলবি ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র, ৬। বজলুর রহমান (১৬) ছাত্র, ৭। কায়েম উদ্দিন শেখ (৩০) শ্রমিক, ৮। মো. উমর আলী (৪০) ব্যবসায়ী, ৯। সগীর আলী (৪৫) শ্রমিক, ১০। মফিজ (৩০) রিক্সা চালক, ১১। মাসুদুর রহমান (২২) ছাত্র, ১২। দিলীপ কুমার দাস (১৯), ১৩। হালিমুদ্দিন (৫০) শ্রমিক, ১৪। স্বপন কুমার সরকার (৯), ১৫। সর্বতী (৪৫) শ্রমিক, ১৬। সাহানারা বেগম (২২) এমএ ক্লাসের ছাত্রী। [পূর্বদেশ, ১৮ মার্চ, ১৯৭১]
৩রা মার্চ স্থানীয় সামরিক কর্তৃপক্ষ রাজশাহী শহরে সন্ধ্যে ৭টা থেকে পরে দিন সকাল ৬টা পর্যন্ত সান্ধ্যে আইন জারি করে এবং বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রদের হল ত্যাগের নির্দেশ দেয়। এতে বিশ^বিদ্যালয় চত্বরে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। বিশ^বিদ্যালয় শহিদ মিনার চত্বরের (শহীদুল্লাহ কলা ভবনের সামনে অবস্থিত) সভায় পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে ফেলা হয়। বিশ^বিদ্যালয়ের চলমান সকল পরীক্ষা পূর্বেই স্থগিত করা হয়েছিল।
৩রা মার্চে ঢাকায় অনুষ্ঠিত জনসভার খবর রাতে বিদেশি সংবাদ মাধ্যমে প্রচারিত হয়। সেসব খবর শুনে রাজশাহীবাসী আন্দোলনমুখর হয়ে ওঠে।
৩রা মার্চ থেকে বিশ^বিদ্যালয় ও শহরে ধরপাকড় শুরু হয়। আগামী কাল তাঁদের নামের তালিকা এবং রাজশাহীতে অসহযোগ আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারীদের সম্পর্কে আলোচনা করা হবে। [আগামীকাল প্রকাশিত হবে ৪ঠা মার্চের রাজশাহী]