একাত্তরের মার্চের অসহযোগ আন্দোলনে রাজশাহী

আপডেট: মার্চ ৯, ২০২১, ১২:১৭ পূর্বাহ্ণ

ড. মো. মাহবুবর রহমান
প্রফেসর (অব.), ইতিহাস বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়


পূর্ব প্রকাশিতের পর:
৯ই মার্চ কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ জেলা শহর থেকে প্রাথমিক শাখা পর্যন্ত প্রতিটি শাখায় ১১ সদস্য বিশিষ্ট ‘স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠনের কাজ দ্রুত শেষ করার তাগাদা দেয়। পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি ওইদিন এক প্রচারপত্রে স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম অব্যাহত রাখার আহ্বান জানায়। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, ‘… নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর, সামরিক শাসন প্রত্যাহার প্রভৃতি যে দাবিগুলি আওয়ামী লীগ প্রধান উত্থাপন করিয়াছেন, সেগুলি আদায় করিতে পারিলে ‘স্বাধীন বাংলা’ কায়েমের সংগ্রামের অগ্রগতির সুবিধা হইবে ইহা উপলব্ধি করিয়া ঐ দাবিগুলির পিছনে কোটি কোটি জনগণকে সমবেত করা এবং ঐ দাবিগুলি পুরণে ইয়াহিয়া সরকারকে বাধ্য করা ইহা হইল এই মুহূর্তে জরুরি কর্তব্য’ (ড. মো. মাহবুবর রহমান, বাংলাদেশের ইতিহাস, ১৯৪৭-৭১, পৃ. ২৩২-২৩৩)। ওইদিন মাওলানা ভাসানীও এক প্রচারপত্র প্রকাশ করেন। ‘পূর্ব পাকিস্তানের আজাদী রক্ষা ও মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপাইয়া পড়–ন’ শীর্ষক প্রচারপত্রে তিনি বলেন , ‘প্রিয় দেশবাসী, আজ আমি সাতকোটি পূর্ববাংলার সাধারণ মানুষের কাছে এই জরুরি আহ্বান জানাইতে বাধ্য হচ্ছি যে, আপনারা দল, মত, ধর্ম ও শ্রেণী নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ একত্রে এবং একযোগে একটি সাধারণ কর্মসূচি গ্রহণ করুন, যার মূল লক্ষ্য হবে ২৩ বৎসরের অমানুষিক এবং শোষণকারী শাসকগোষ্ঠীর করাল কবল থেকে পূর্ববাংলাকে সম্পূর্ণ ও চূড়ান্তভাবে স্বাধীন ও সার্বভৌম করা’ (ড. মো. মাহবুবর রহমান, ঐ, পৃ. ২৩৩)। ৯ই মার্চ পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) এক প্রচারপত্রের মাধ্যমে পূর্ববাংলার মুক্তির জন্য শান্তিপূর্ণ অসহযোগ আন্দোলন নয়, হরতাল ধর্মঘট নয়, অস্ত্র হাতে লড়াই করতে, শত শত মানুষের হত্যার বদলা নিতে এবং গ্রাম কৃষকদের গেরিলা লড়াই-এ সংগঠিত করার আহ্বান জানায় (ড. মো. মাহবুবর রহমান, ঐ, পৃ. ২৩৩)। ৯ই মার্চ ন্যাপের সভাপতি অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ, জাতীয় লীগ প্রধান আতাউর রহমান খান, মজদুর ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান সিরাজুল হক, আদমজী শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ পৃথক পৃথক বিবৃতিতে বঙ্গবন্ধুর পরিচালিত অসহযোগ আন্দোলনের প্রতি দৃঢ় সমর্থন ব্যক্ত করেন।
রাজশাহীতে ৯ই মার্চ (১৯৭১)
ওইদিন সামারিক কর্তৃপক্ষ রাজশাহীতে পুনরায় রাত ৯টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত আট ঘণ্টাব্যাপি সান্ধ্য আইন জারি করে। শহরে পাকিস্তানি সেনাদের তৎপরতা বৃদ্ধি পায়। সামরিক কর্তৃপক্ষ কর্তৃক রাজশাহীতে সান্ধ্য আইন জারির প্রেক্ষিতে রাজশাহীর কৃতি সন্তান নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পদাক এ.এইচ.এম. কামারুজ্জামান বিবৃতির মাধ্যমে সান্ধ্য আইন জারির তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং তা অনতিবিলম্বে প্রত্যাহার করার জন্য সামরিক কর্তৃপক্ষের নিকট দাবি জানান। বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘সৈন্যদের ছাউনিতে ফিরিয়ে নেয়া হচ্ছে বলে প্রচার করার পরেও রাজশাহীতে কেন ও কিভাবে সান্ধ্য আইন অব্যাহত রাখা হচ্ছে তা বোঝা যাচ্ছে না’। তিনি আরও বলেন, …‘সামরিক বাহিনী বিক্ষুব্ধ জনতার বিরুদ্ধে নানা রকম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে এবং সান্ধ্য আইনের মাধ্যমে সমগ্র বাংলার নিরস্ত্র জনগণের উপর বেপরোয়া গুলিবর্ষণ করা হচ্ছে।’ সান্ধ্য আইন প্রত্যাহার করে শান্তি ও শৃঙ্খলার ভার সম্পূর্ণরূপে পুলিশের হাতে ছেড়ে দেয়ার জন্য তিনি দাবি জানান। প্রয়োজন হলে আওয়ামী লীগ স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী শান্তি রক্ষার জন্য পুলিশ বাহিনীদের সাহায্য দান করবেন বলে তিনি জানান (হোসনে আরা খানম, ১৯৭১ অসহযোগ আন্দোলনের কালপঞ্জি, পৃ. ১৬০)। কামারুজ্জামানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সামরিক কর্তৃপক্ষ ১১ই মার্চ থেকে সান্ধ্য আইন প্রত্যাহার করে। ওইদিন ন্যাপ নেতা আতাউর রহমানও এক বিবৃতিতে সান্ধ্য আইন জারির তীব্র প্রতিবাদ করেন। ৯ই মার্চ ছাত্র নেতৃবৃন্দ রাজশাহী কলেজের ইউ.ও.টি.সি থেকে ডামি রাইফেল ও সিভিল ডিফেন্স থেকে ১২ সেট জামা, প্যান্ট, মোজা, বুট হস্তগত করে। সাংস্কৃতিক কর্মীগণ সারা শহরে ট্রাকে করে সঙ্গীত পরিবেশন করেন।
৯ই মার্চ রাজশাহীতে বোমা তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়। বিষয়টি মো. এনামুল হক তাঁর গ্রন্থে (রাজশাহীতে মুক্তিযুদ্ধ, পৃ.৬০-৬১) বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন। আগ্রহী পাঠকদের জন্য এখানে তা’ উল্লেখ করা হলো, ‘এ সময় বোমা তৈরি করার জন্য মো. আশরাফুজ্জামান ও মতিউর রহমানসহ আরো কয়েকজন রাজশাহীর রেলগুদাম হতে আজিজ ম্যাচ ফ্যাক্টরির পটাশ ও ফসফরাস সংগ্রহ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু পটাশ ও ফসফরাসের বাক্স ঠিকমতো চিহ্নিত করতে না পারার কারণে তাঁদের প্রচেষ্টা সফল হয়নি। তবে মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র মো. আ. মান্নান, মতিউর রহমান ও আ. জলিল রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের ল্যাবরেটরি হতে রাসায়নিক ও এসিড সংগ্রহ করে আনতে সক্ষম হন। তাঁরা সায়েন্স ল্যাবরেটরি থেকেও বোমা তৈরির জন্য কিছু রাসায়নিক দ্রব্য ও এসিড সংগ্রহ করে আনেন। সেসব দিয়ে কতকগুলো বোমা তৈরি করা হয়েছিল। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান গবেষণাগার, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ও রাজশাহী কলেজ হতেও বোমা তৈরির উপকরণ সংগ্রহ করার চেষ্টা করা হয়। তার মধ্যে রাজশাহী কলেজের বিজ্ঞান গবেষণাগার হতে অভিনব কায়দায় প্রচুর পরিমাণে এসিড, পাউডার, সাইনোসাইটিস এসিড, নাইট্রিক এসিড সংগ্রহ করা হয়। এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে মো. জাহাঙ্গীর হোসেন (দরগাপাড়া), আ. মতিন, মাহফুজুর রহমান, মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র আ. করিম, শাহ নুরুন্নবী (পরবর্তীকালে শহিদ হন) ও বাচ্চু, শরিফ উদ্দিন সরকার, আ. খালেক, মো. মজনু, ভুলু, আকবর, মিজান, খাজা, দুলাল, শফি, আবুল হোসেন, জনাব আলী প্রমুখ সম্পৃক্ত ছিলেন। তাঁরা রাজশাহী কলেজের পূর্বদিকের দরগাপাড়ার একটি দোতলা বাড়িতে বসে রাজশাহী কলেজের বিজ্ঞান গবেষণাগার হতে বোমা তৈরির উপকরণাদি সংগ্রহ করার কৌশল নির্ধারণ করেন। সে মোতাবেক তাঁরা রাজশাহী কলেজের ইউওটিসি-র (বর্তমানে বিএনসিসি) পোশাক-পরিচ্ছদ চুরি করেন। অতঃপর সে পোশাক পরিধান করে পাকিস্তানি সৈন্যের ছদ্মবেশ ধারণ করে কলেজে কর্তব্যরত দারোয়ানদের বিভ্রান্ত করে কলেজ গবেষণাগার হতে প্রচুর পরিমাণ এসিড, পাউডার, সাইনোসাইটিক এসিড ও নাইট্রিক এসিডসহ কেমিক্যাল্স সংগ্রহ করেন’।
৯ই মার্চ রাজশাহীতে খবর আসে যে পরদিন এ.এইচ.এম. কামারুজ্জামান রাজশাহীতে আসবেন এবং ১১ই মার্চ ভুবন মোহন পার্কে আয়োজিত জনসভায় ভাষণ দেবেন। তাঁর আগমনের সংবাদে রাজশাহীর আপামর জনসাধারণ ও সকল শ্রেণি পেশার মানুষ আরও বেশি করে আন্দোলনমুখি হয়ে ওঠে। [আগামীকাল প্রকাশিত হবে ১০ই মার্চের ঘটনা]