একুশের চেতনা শাণিত হবে একদিন নিজেদের চিত্তে ও চৈতন্যে, কর্মে ও ব্যবহারে

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২১, ১২:১৭ পূর্বাহ্ণ

মতিয়ার রহমান:


‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী আমি কি ভুলিতে পারি’- এই গানটি আমাদের শিহরিত করে আর জাগরিত করে। আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের এক মহাসন্ধিক্ষণে আজ একুশে ফেব্রুয়ারি। একদা আমাদের সকল রাজনৈতিক এবং সামাজিক অঙ্গীকারেরও মহাদিন। আজ থেকে ৬৯ বছর আগে যে দিনটি শুধু মাত্র মাতৃভাষাকে প্রতিষ্ঠার দিন হিসাবে রক্তাপ্লুত লাল-সবুজের পতাকার মতো তৈরি হয়েছিল আমাদের চৈতন্যে, ক্রমে সেই দিনের আশা থেকে জন্ম নিয়েছিল এমন একটি অগ্নিবিন্দু যার মধ্যে নিহিত ছিলো আমাদের স্বাধীনতার শিখা। বায়ান্ন থেকে একাত্তর পর্যন্ত অবিচ্ছিন্ন এক মহাকাল আর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তা রূপান্তরিত হয়েছিল এক বিশাল অগ্নিগোলকের স্পন্দন। যার আঘাতে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল স্বাধীনতা বিরোধী সকল শক্তি, সকল বুহ্য আর তাই আমরা পেয়েছিলাম নতুন স্বাধীনতাকেও, একটি নতুন দেশ যার নাম বাংলাদেশ। নতুন অর্থে নতুন স্বপ্নে এবং কর্মচাঞ্চেল্যে আবিষ্কার করার দিন একুশে ফেব্রুয়ারি।
আমাদের জীবনের সকল সত্য কল্যাণ ও প্রগতিকে নতুন করে উজ্জীবিত আর উজ্জ্বলতর করার দিনও একুশে ফেব্রুয়ারি। অসত্য অকল্যাণ এবং অমঙ্গলকে আমাদের জীবনের সকল চিন্তা ও চৈতন্য থেকে নির্বাসনের দিন। একুশ আমাদের সকল বৈষম্য অবসানের দিন। একুশ আমাদের রাষ্ট্রীয় সকল সন্ত্রাস স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের অবসানের দিন। কুসংস্কার, কুপমন্ডকতা, সাম্প্রদায়িকতার অবসানের দিন। মানুষের অমর্যাদার অবসানের পর মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠার দিন।
উর্দু-বাংলার আনুষ্ঠানিক বিরোধ দেখা দেয় ১৯২৮ সালে। তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রবেশিকা স্তরে মুসলমান ছাত্রদের জন্য উর্দু বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করে, কিন্ত এ নিয়ে এমন আপত্তি উঠছে যে তারা সে প্রস্তাব নিয়ে আর অগ্রসর হয়নি। বরঞ্চ বাংলাকে মাদ্রাসা শিক্ষার বাহন করার জন্যও রীতিমত একটি আন্দোলন দেখা দেয়। মাতৃভাষাকে শিক্ষার সকল পর্যায়ের মাধ্যমরূপে প্রয়োগ করার জন্য আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ, ড. মুহাম্মদ শহিদুল্লা, মোহাম্মদ আকরম খা প্রমুখ লেখক এবং সওগাত ও শিখা পত্রিকা দাবী জানিয়েছিলেন।
১৯৫২ সালে ভাষার জন্য যে আন্দোলন গড়ে উঠে ছিল তা একদিনে সফল হয়নি। ১৯৪৮ সালে ১৯ মার্চ জিন্নাহ ঢাকায় আসেন। ২১ তারিখ রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দেন, ১৯৪৮ সালে ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সমাবর্তন অনুষ্ঠানে কায়েদা আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর এক রাষ্ট্র এক রাষ্ট্রভাষা করার প্রত্যয়ে যে ভাষণ দিয়েছিলে -Udru and Udru shall be state language of Pakistain (উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা) এ ঘোষণার সাথে সাথে পূর্ব পাকিস্তানের সমগ্র ছাত্র সমাজ চুপ করে বসে থাকেনি। নিরলস ব্যক্তি স্বার্থহীনভাবে নিজেদের মধ্যে সুসংগতভাবে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। এ আন্দোলনে রফিক, শফিক, সালাম, বরকতের মতো মেধাবীদেরকে জাতি হারিয়েছেন। রাজশাসন যে দেশে স্বৈরাচারী সমাজশাসন বৈষম্যমূলক গণতন্ত্র, অপসৃয়মান আর অধিকাংশ সাধারণ মানুষ অসহায়ত্ব, সেইসময় সেই দেশে সাহসী প্রতিবাদী জীবনমুখি আন্দোলনে শাসকদের রোষে পড়তে হয়েছিল। ভাষা আন্দোলনে যারা নেতৃত্বে ছিলেন, শেখ মুজিবুর রহমান, ভাষা সৈনিক অ্যাডভোকেট গাজীউল হক, মোহাম্মদ তোয়াহা, আব্দুল মতিন, ভাষা সৈনিক অলি আহাদ, তাজউদ্দিন আহমেদ, হাসান হাফিজুর রহমান, আলতাফ মাহমুদ, নারী নেতৃত্ব ছিলেন রওশন আরা বাচ্চুসহ অনেকে জীবন বাজি রেখে নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন। শতসহস্র আত্মত্যাগ বাধা উপেক্ষা করে সেদিনের ভাষা আন্দোলন সফল হয়েছিল সকল স্তরের মানুষের অংশগ্রহণে। ১৯৫৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রীয়ভাবে যার স্বীকৃতি লাভ করে।ৃৃৃ একই সাথে উর্দু ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি লাভ করে। পরে অবশ্য জিন্ন্হা তার ভুল স্বীকার করেছেন। এ অঞ্চলের (পূর্ব বাংলার) জাতীয় সাংস্কৃতিক চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হয়েছিল। এরমধ্যেই নিহিত ছিল পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলনের বীজ। যা ৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬৬ এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅদ্ভ্যুদয় আর ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের মত এত বড় যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা। এরমধ্যে শিখিয়েছে নিঃস্বার্থ দেশপ্রেম ‘সকলে আমরা পরের তরে’।
আজ যখন সভ্যতা একটি নতুন সহস্র বছরে উপনীত, তখন মানবজাতির একটি অংশ হিসাবে আমরা যেন বিষণ্নতার স্বৈরাচারী রাষ্ট্রের দিকে নিজেদের টেনে না নিয়ে যাই। শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধতার মধ্যে না রেখে কর্মে এবং জীবনে প্রয়োগ করি, সত্য এবং কল্যাণ- সুন্দর এবং মঙ্গল যেন আমরা শুধু নিজেদের জন্যই নয় এবং সারা পৃথিবীর জন্যই গ্রহণ করতে পারি। একুশের চেতনা শাণিত হবে একদিন নিজেদের চিত্তে ও চৈতন্যে কর্মে ও ব্যবহারে। রাষ্ট্র, তার সংস্কৃতি, জনগণের আকাক্সক্ষা শোষণমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র তার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ধারণ করে এগিয়ে যাবে এ প্রত্যাশা সকলের। আজকের একুশ হোক তাই জীবনের সকল সত্য কল্যাণ ও প্রগতিকে উজ্জ্বলতর করার দিন। দেশ প্রেমিক গণতান্ত্রিক শাসনের প্রত্যাশা সকলের।
লেখক : উন্নয়নকর্মী ও লেখক।
matiarahmanr@gmail.com