একুশের পথ ধরে আগুনের গহীনে

আপডেট: জুলাই ১৯, ২০১৭, ১২:৪৩ পূর্বাহ্ণ

পারভেজ আহমেদ পাপেল


‘জন্মিলে মরিতে হবে রে, জানে তো সবাই
তবু মরণে মরণে অনেক
ফারাক আছে ভাইরে, সব মরণ নয় সমান’।।
প্রতুল মুখোপাধ্যায় তার গানের মধ্য দিয়েই বলেছেন যার জন্ম আছে তার মৃত্যুও আছে কিন্তু সকল মত্যুই সমান নয় এর মাঝেও পার্থক্য রয়েছে। পৃথিবীতে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ জন্মগ্রহণ করছেন আবার মারাও যাচ্ছেন। মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে হয়তবা তার দেহ/শরীর পৃথিবী থেকে বিদায় নিচ্ছে কিন্তু অনেক মানুষই তার কর্মের মধ্য দিয়ে সারাজীবনের জন্য মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিচ্ছেন। আগামী দিনের পথ প্রদর্শক হিসেবে ভূমিকা রেখে যান। গণমানুষের সামনে রেখে যান সুন্দর আগামীর স্বপ্ন। এমনি একজন মানুষ ছিলেন ভাষা সৈনিক অ্যাডভোকেট আব্দুর রাজ্জাক (আমার বাবা)।
ভাষা সংগ্রামী-মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক-রাকসু’র সাবেক ভিপি, ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাকালীন নেতা আব্দুর রাজ্জাক  ১৯ জুলাই, ২০১৫ আমাদের মাঝ থেকে চির বিদায় নেন। তার আদর্শ, দৃষ্টিভঙ্গি, জীবনবোধ, নীতি-নৈতিকতা, আপোষহীনতা আজও অনেকের কাছেই অনুসরণীয় হয়ে রয়েছে। পাক শাসনের বিরুদ্ধে ভাষা সৈনিক রাজ্জাকের আন্দোলন সংগ্রামের কথা দেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। মানবমুক্তি এবং শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থার রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে তোলার জন্য তিনি আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। ১৯৩৮ সালের ১০ অক্টোবর রাজশাহী শহরের মালোপাড়ায় তার জন্ম। তার বাবা ছিলেন পেশায় একজন হোমিওপ্যাথ চিকিৎসক। তার মেজো ভাই ভাষা সৈনিক ডা. আব্দুল লতিফ ছিলেন রাজশাহী শহরের একজন বিশিষ্ট হোমিও চিকিৎসক। পারিবারিক ভাবেই রাজনৈতিক বলয়ে বেড়ে ওঠেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই স্বদেশ ও মানুষের প্রতি তার এক অকৃত্রিম ভালবাসার প্রকাশ দেখা যায়। বৃটিশবিরোধী আন্দোলন ও দেশ বিভাগের সময় তিনি খুব ছোট কিন্তু সে সময়ই তার ছোট্ট মনে অনেক প্রশ্নের উদ্রেগ হয়। শৈশব ও কৈশোর জীবন থেকেই দেশের অসহায় নিপীড়িত মানুষের কষ্ট সব সময় তাকে পীড়া দিত। চাইতেন এই সকল নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে, তাদের জন্য কিছু করতে। স্বপ্ন দেখতেন শোষণ মুক্তির আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে শোষণমুক্ত অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের। খুব সহজে মানুষকে আপন করে নিতেও পারতেন তিনি।
পারিবারিকভাবেই তার রাজনীতির হাতে খড়ি বলা যায়। তাঁর মেজো ভাই ডা. আব্দুল লতিফ তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টির একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ফলে তার ডাক্তারখানায় অনেক রাজনৈতিক মিটিং অনুষ্ঠিত হত। যেগুলো হয়তবা সেই সময়ই তার শিশু মনে দাগ কেটেছে। তার মুখে শোনা একটি গল্পে তিনি বলেন “একবার কমিউনিস্ট পার্টির একটি গোপন মিটিঙের সংবাদ একটি কাগজে লিখে তার হাফ প্যান্টের পকেটে পুরে পকেটটি সেলাই করে দেন তার মেজো ভাই। এবং নির্দেশমত যথা স্থানে তিনি চিঠিটি পৌঁছে দেন”। দেশ ভাগের পরপরই যখন তাদের বাসার সামনে দিয়ে মিছিল যেতÑ যে মিছিলের সেøাগান ছিল ‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়, লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়’ এগুলো তার শিশু মনকে উদ্বেলিত করে এবং তখনই তাঁর মনে রোপিত হয় স্বদেশ প্রেম ও সংগ্রামী চেতনার বীজ।
ভাষা সৈনিক আব্দুর রাজ্জাক ভাষা আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত হন কিশোর বয়সে। তখন তিনি হাই স্কুলের ছাত্র । অগ্রজ সতীর্থ গোলাম আরিফ টিপু, আতাউর রহমানের সহচর্যে এসে তিনি জড়িয়ে পড়েন ভাষা আন্দালনের সাথে। সেই সময়ের অসীম সাহসী কিশোর অ্যাডভোকেট রাজ্জাকের ভাষা আন্দোলনের সংগ্রামের কথা জীবিত ভাষা সৈনিকদের নষ্টালজিয়ায় ভেসে উঠে এখনো। ভাষা আন্দোলনের অগ্নিঝরা দিনগুলিতে বিপ্লবী রাজ্জাকের ভূমিকা এখনও জীবিত ভাষা সৈনিকরা স্মৃতি রোমন্থন করেন। বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির ঐতিহ্যবাহী বিপ্লবী এবং সংগ্রামী, অসাম্প্রদায়িক ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন। এই ছাত্র সংগঠনটির মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণের ভূমিকা প্রশংসনীয়। অসাম্প্রদায়িক বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষে আন্দোলন সংগ্রাম করা ছাত্র সংগঠনটির জন্ম ১৯৫২ সালে। আব্দুর রাজ্জাক সেই সময়ে কিশোর বয়সে ছাত্র ইউনিনের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত  হন। তিনি ছাত্র ইউনিয়ন রাজশাহীর প্রতিষ্ঠাকালীন কমিটির পাঠাগার সম্পাদক ছিলেন।
১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ তখন তিনি রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র। ওইদিন সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা ভাষার দাবিতে মিছিলের ডাক দেয়া হয়েছিল। রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল ও রাজশাহী কলেজ ছিল পাশাপাশি। আর রাজশাহী কলেজ তখন ছিল সকল রাজনৈতিক আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল। ওইদিন  রাজশাহী কলেজ থেকে বের হওয়া সেই মিছিলের সম্ম¥ুখ ভাগে সর্বকনিষ্ঠ স্কুল ছাত্র হিসেবে অংশগ্রহণ করেন অ্যাডভোকেট রাজ্জাক। ১৯৫২ সালে যখন বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষায় পরিণত করার দাবিতে আন্দোলন তুঙ্গে সে সময় তিনি ৭ম শ্রেণির ছাত্র হিসেবে সেই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। সেই সময় স্কুলগুলোতে ধর্মঘট সফল করার লক্ষ্যে সবার অলক্ষ্যে কলেজিয়েট স্কুলের ঘণ্টা বাজিয়ে স্কুল ছুটি দেয়ার মত কাজগুলো সফলতার সঙ্গে পালন করে গেছেন।
এরপর ৬২’র শিক্ষা আন্দোলনে রাজশাহীতে তাঁরা দুই সহোদর তার ছোট ভাই মোহাম্মদ এহিয়া একসাথে আন্দোলনের নেতৃত্ব প্রদান করে গেছেন। এই সময় আন্দোলনকে সঠিকভাবে পরিচালনা করার জন্য গঠিত রাজশাহী-খুলনা বিভাগীয় সংগ্রাম পরিষদের কার্যকরি কমিটিরও সদস্য ছিলেন তিনি। ছাত্র রাজনীতির সাথে সরাসরি যুক্ত থাকার কারণে তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। পরবর্তীতে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনে ভর্তি হন। রাজশাহীতে স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের আগমনের প্রতিবাদে প্যান্ডেলে আগুন দেয়ার ঘটনায় তাকে কারাবরণ করতে হয়। এরপর ১৯৬৪-৬৫ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন থেকে রাকসু’র ভিপি নির্বাচিত হন। এরপর ধারাবাহিক ভাবে ৬৬’র ৬ দফা ও ১১ দফার আন্দোলন, ৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থান এর সাথেও তিনি সর্বতভাবে জড়িত ছিলেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের গেরিলা বাহিনীর একজন সংগঠক হিসেবে সক্রিয়ভাবে কাজ করে গেছেন এবং ১৯৯০ এর স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনেও তার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল।
রাজনৈতিক জীবনে তিনি বিভিন্ন মেয়াদে চারবার কারাবরণ করেন। অসম্ভব ভাল বক্তা ছিলেন তিনি। বক্তব্য দিয়ে খুব সহজেই মানুষের মনকে নাড়া দিতে পারতেন। তিনি দেখতে খুব ছোট-খাটো ছিলেন। পাকিস্তান সরকারের এক ম্যাজিস্ট্রেট তার বক্তব্য শুনে বলেছিলেন ‘এতো টুকু যন্ত্রের এত বড় আওয়াজ’।

ভাষা সৈনিক আব্দুর রাজ্জাক আমার বাবা। বাংলাদেশের ইতিহাস যতটুকু না বই পড়ে জেনেছি তার চেয়ে অনেক বেশি জেনেছি তার মুখে গল্প শুনে। ১৯৫২ এর ২১ ফ্রেবুয়ারি ঢাকাতে মিছিলে গুলি হওয়ার ঘটনা রাজশাহীতে পৌঁছা মাত্র বিক্ষোভে ফেটে পড়ে রাজশাহীর জনগণ। সে সময় রাজশাহী কলেজ মুসলিম হোস্টেলে রাজশাহীতে ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারীদের উদ্যোগে একটি মিনার তৈরি করা হয়। বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত সাক্ষাৎকার ও তার মুখে গল্প শুনে যেটুকু জানতে পেরেছি সে সময় শহিদ মিনারের ধারণা তাদের ছিল না। ঢাকার ঘটনার পর রাজশাহী কলেজের মুসলিম হোস্টেলের এফ ব্লকের একটি রুমে সভা হয় সেখান থেকে শহিদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরির সিদ্ধান্ত হয়। এরপর উপস্থিত সকলে মিলে ইট, বালু, কাদা দিয়ে একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করেন। মাথায় করে ইট ও মাটি বয়ে এনে এই স্মৃতিস্তম্ভ তৈরির কাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন অ্যাডভোকেট আব্দুর রাজ্জাক। পরবর্তীতে রাতের আধারে এই স্মৃতিস্তম্ভটি ভেঙ্গে দেয় পাকিস্তান সরকারের প্রশাসন। এটিই ছিল বাংলাদেশের প্রথম শহিদ মিনার। যে শহিদ মিনারের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবিতে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সক্রিয় ছিলেন।
এক এগারোর জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর যখন দেশে সকল প্রকার রাজনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। সে সময় রাজশাহীতে সিপিবি, বাসদ, গণসংহতি আন্দোলন, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রফ্রন্ট, ছাত্র ফেডারেশন, উদীচী, সাংস্কৃতিক ইউনিয়ন ও সমগীতের কর্মীদের সমন্বয়ে ‘চেতনায় একুশ’ নামের একটি সংগঠন তৈরি করা হয়। যার আহবায়ক ছিলেন ভাষাসৈনিক আব্দুর রাজ্জাক। এই সংগঠনটি ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী কলেজ মুসলিম হোস্টেলে নির্মিত শহিদ মিনারটি ছিল এদেশের প্রথম শহিদ মিনারের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবিটি সামনে নিয়ে আসে।
দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৪ সালে সোভিয়েত সরকারের আমন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় সফরে তিনি রাশিয়া যান। ১৯৯২ সালে তিনি রাজশাহী বার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদকও নির্বাচিত হয়েছিলেন। দীর্ঘদিনের আন্দোলন সংগ্রামে তার একসাথে কাজ করার সূযোগ হয়েছে কমরেড মণি সিংহ, কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ, মোজাফফ্র আহমেদ, কমরেড মঞ্জুরুল আসহান খান, কমরেড মুজাহিদুল ইাসলাম সেলিম, পংকজ ভট্টচার্য, নুরুল ইসলাম নাহিদ, সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক, মতিয়া চৌধুরী, সেলিনা হোসেনসহ অনেক প্রগতিশীল ও দেশবরেণ্য রাজনীতিবিদের সাথে।
বিপ্লবী এই মানুষটি জীবনের শেষদিন পর্যন্ত স্বপ্ন দেখতেন অসাম্প্রদায়িক, জঙ্গিবাদমুক্ত বাংলাদেশের। যে বাংলা হবে শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষের।  তিনি সব সময় একটি কথাই বলে এসেছেন আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যেন এদেশের সঠিক ইতিহাসটা সম্পর্কে জানতে পারে। আর এদেশের মানুষ যে স্বপ্ন নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে তাদের জীবন উৎসর্গ করেছেন তাদের সেই স্বপ্ন যেন ধূলিসাৎ না হয়ে যায়।
লেখক: ভাষাসৈনিক আব্দুর রাজ্জাকের পুত্র)