একুশে ফেব্রুয়ারি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২২, ৬:২১ অপরাহ্ণ

ড. মো. জসিম উদ্দীন মৃধা


ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনের প্রথম মাইল ফলক। পূর্ববাংলায় পশ্চিম পাকিস্তানের একচ্ছত্র প্রভূত্ব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং বাঙালির রাজনৈতিক অধিকার হননের লক্ষে বাংলা ভাষা সংস্কৃতি এবং বাঙালির চেতনার যা কিছু মহোত্তম প্রকাশ, ১৯৪৮ সাল থেকে বার বার তা ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়েছে। শুরু থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসকদের হাতে বাংলা ভাষা প্রধান টার্গেট হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পাকিস্তান সৃষ্টির মাত্র তিন মাসের মধ্যে বাঙালিরা ঔপনিবেশিক আচরণের আলামত পেয়েছিলেন। ১৯৪৭ সালের ২৭ নভেম্বর করাচির শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্টভাষা করার সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। এই সিদ্ধান্ত তৎক্ষণাত পূর্ববাংলার ছাত্র-শিক্ষক এবং বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে তীব্র বিক্ষোভের জন্ম দেয়। অবশ্য রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে বিতর্ক পাকিস্তান কায়েমের পূর্বেই শুরু হয়েছিল। সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে ভারত বিভক্তি যখন অবশ্যম্ভাবী তখন থেকেই মুসলিম লীগ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার অপচেষ্টা শুরু করে। ১৯৪৭ সালের ১৭ মে মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতা চৌধুরী খালেকুজ্জামান হায়দ্রাবাদের ‘উর্দু সম্মেলনে’ সভাপতির অভিভাষণে ঘোষণা করেন, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। ওই সময় এর বিরুদ্ধে অবশ্য কোনো প্রতিবাদ গড়ে উঠেনি। ১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দীন আহমদ হিন্দিকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা করার প্রেক্ষিতে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করা উচিত বলে অভিমত ব্যক্ত করেন। ড. জিয়াউদ্দীনের এই অভিমত প্রকাশের বিরুদ্ধে বাঙালি বুদ্ধিজীবী সমাজ তড়িৎ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। বিশেষ করে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে জোর যুক্তি প্রদর্শন করে বলেন, ‘বাংলাদেশের কোর্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষার পরিবর্তে উর্দু বা হিন্দি ভাষা গ্রহণ করা হলে, তা হবে রাজনৈতিক পরাধীনতারই নামান্তর।’
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট উপমহাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গণে ঘটে যায় দীর্ঘদিনের কাক্সিক্ষত ঘটনা। ব্রিটিশ শাসিত ভারত বর্ষ ভেঙ্গে সম্পূর্ণ নতুন দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র পাকিস্তান ও ভারতের অভ্যুদয় ঘটে। রাষ্ট্র দুটির কাছে শাসন ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে বৃটিশরা চলে যায় ভারতবর্ষ হতে। ভারতবর্ষের যে অঞ্চলে মুসলমান বেশি সেই অঞ্চল নিয়ে সৃষ্টি হয় পাকিস্তান এবং হিন্দু সংখ্যাধিক্য অঞ্চল নিয়ে গঠিত হয় ভারত। ভারতের দুই প্রান্তের দু’টি মুসলমান সংখ্যাধিক্য অঞ্চল নিয়ে পাকিস্তান। তার একটি পশ্চিম পাকিস্তান এবং অপরটি পূর্ব পাকিস্তান যা আজ স্বাধীন স্বার্বভৌম বাংলাদেশ নামে পৃথিবীর মানচিত্রে পরিচিত।
যদিও পাকিস্তানের মাত্র ৩.২৭% ভাগ লোকের মাতৃভাষা ছিল; উর্দু তথাপি উর্দুকেই স্বাধীনতার অব্যবহিত পর থেকেই পাকিস্তানের সরকারি ভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেয়ার এক অপচেষ্টা চলছিল। পাকিস্তানের মুদ্রা, ডাকটিকেট, মানি অর্ডার ফরম, রেলের টিকেট প্রভৃতিতে কেবল ইংরেজি ও উর্দুভাষা ব্যবহার করা হয়। পাকিস্তান পাবলিক সার্ভিস কমিশনের বিষয় তালিকা থেকে এবং নৌ ও অন্যান্য বিভাগের নিয়োগ পরীক্ষায় বাংলাকে বাদ দেওয়া হয়। এমন কি পাকিস্তান গণপরিষদের সরকারি ভাষা হিসেবে ইংরেজি ও উর্দুকে নির্বাচন করা হয়। ১৯৪৮ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি, গণপরিষদের অধিবেশন শুরু হলে কংগ্রেস দলীয় সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত একটি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করে ইংরেজি ও উর্দুর সঙ্গে বাংলাকেও গণপরিষদের সরকারি ভাষা করার প্রস্তাব দেন। ২৫শে ফেব্রুয়ারি তাঁর এই প্রস্তাবের ওপর আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। তিনি যুক্তি প্রদর্শন করে বলেন যে, প্রাদেশিকতার মনোভাব নিয়ে তিনি এ প্রস্তাব করেননি। যেহেতু পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকের মাতৃভাষা বাংলা। সুতরাং সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষাই পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হওয়া উচিত।
বাংলা ভাষার সংগ্রামকে সক্রিয় করার উদ্দেশে একটি সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে ২রা মার্চ, ১৯৪৮ ঢাকার ফজলুল হক হলে ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করা হয়। শামসুল হক আলম সহ-সভাপতি, ফজলুল হক হল ছাত্র সংসদ সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক নির্বাচিত হন। গণআজাদীলীগ, তমদ্দুন মজলিস, পূর্বপাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ, গণতান্ত্রিক যুবলীগ, সলিমূল্লাহ হল ছাত্র সংসদ ফজলুল হক হল ছাত্র সংসদ, মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদ ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ছাত্র সংসদের পক্ষ থেকে দু’জন করে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ১১ই মার্চ, ১৯৪৮ পূর্ব পাকিস্তানের সর্বত্র সাধারণ ধর্মঘট আহবান করে।
১১ই মার্চের কর্মসূচী সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য ১০ই মার্চ রাত্রে ফজলুল হক হলে রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। ধর্মঘটকে সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়। ৪ মার্চ ১৯৪৮ ঢাকা শহরের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয়। ১১ মার্চের হরতাল কর্মসূচিকে প্রতিহত করার জন্য নাজিমুদ্দীন সরকার ঢাকা শহরের সকল গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বড় বড় লাঠিধারী পুলিশ মোতায়েন করেছিল। ফলে হরতালকারীদের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষ হয় এবং বহুসংখ্যক নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়। পরের দিন ১২ মার্চ, ১৯৪৮ গ্রেফতারকৃত নেতা কর্মীদের মুক্তির দাবিতে ঢাকা শহরে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। তৎকালিন রাজনৈতিক অবস্থার পটভূমিকায় নাজিমুদ্দীন সরকার ভাষা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে তিক্ততা বাড়াতে চাইলেন না। সরকার রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে একটা সমঝোতায় আসে।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দীন রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির সঙ্গে ১৫ই মার্চ আলোচনায় বসতে বাধ্য হন। উক্ত সমঝোতা সভায় ৮ দফা চুক্তিনামা স্বাক্ষরিত হয়।
ইতোমধ্যে পূর্ববাংলা প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন বসে। উক্ত অধিবেশনে ভাষার বিষয়টি উপেক্ষা করা হয়। ফলে ছাত্ররা নতুন করে আন্দোলন শুরু করে। চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য ছাত্ররা ১৭ মার্চ ১৯৪৮ প্রাদেশিক পরিষদের সভা কক্ষের দিকে মিছিল সহকারে অগ্রসর হলে পুলিশ লাঠিচার্জ ও বন্দুকের ফাঁকা গুলি করে মিছিল ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
ছাত্রদের এই আন্দোলনে নাজিমউদ্দীন ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। তিনি গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে যথাশিগগিরই সম্ভব পূর্ববাংলা সফরে আসার আহবান জানান। ১৯ শে মার্চ ১৯৪৮ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পূর্ববঙ্গে সফরে আসেন। ২১শে মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে) এক বিশাল জনসভায় তিনি উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন। এই ঘোষণার তিনদিন পরে ২৪শে মার্চ ১৯৪৮ কার্জন হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে তিনি বক্তৃতাকালে আবার বলেন যে, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে উপস্থিত ছাত্ররা ‘নো নো’ বলে তাঁর বক্তৃতাকে প্রত্যাখ্যান করে। সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে শামসুল হক, কামরুদ্দীন আহমদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, আব্দুর রহমান চৌধুরী, অলি আহাদ, তাজঊদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রমুখ জিন্নাহর সাথে সাক্ষাৎ করেন। তাঁরা বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার জন্য জিন্নাহকে অনুরোধ করেন।
১৯৪৯ সালের মার্চ মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম্ন বেতনভুক্ত কর্মচারিদের ধর্মঘট এদেশের ইতিহাসে আর একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। পূর্বপাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের নেতা ও কর্মীরা এই আন্দোলনকে সমর্থন ও নেতৃত্ব দেন। এই আন্দোলনে কাজী গোলাম মাহবুব, অলি আহাদ গ্রেফতার ও কারারুদ্ধ হয়। শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কৃত ও কারারুদ্ধ হন। আরো বহু ছাত্রকে জেল, জরিমানা ইত্যাদি নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছে। পরবর্তীতে আওয়ামী মুসলিম লীগের যখন জন্ম তখন তিনি কারাগারেই ছিলেন। মাওলানা ভাসানীর সুপারিশে তাঁর অনুপস্থিতিতেই তাঁকে সংগঠনের যুগ্মসম্পাদক করা হয়।
লিয়াকত আলী খানের মৃত্যুর পর খাজা নাজিমুদ্দিন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন। নূরুল আমীন ছিলেন ওই সময় পূর্ববঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। ১৯৫২ সালের ২৫ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দিন পূর্ববঙ্গ সফরে আসেন। ২৭ জানুয়ারি ১৯৫২ পল্টন ময়দানে এক জনসভায় উর্দু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে বলে তিনি ঘোষণা করেন। তাঁর এই হীন চক্রান্তকে প্রতিহত করার জন্য ছাত্র, রাজনৈতিক ও সাং¯ৃ‹তিক সংগঠনের সমন্বয়ে ৩০শে জানুয়ারি ১৯৫২ সন্ধ্যে ছ’টায় ঢাকা বার লাইব্রেরি হলে একটি সর্বদলীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলীম লীগের সহসভাপতি আতাউর রহমান খান। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলীম লীগ, পূর্বপাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ, যুবলীগ, রিক্শা শ্রমিক ইউনিয়ন, সিভিল লিবার্টিস কমিটি, তমদ্দিন মজলিস, ইসলামিক ব্রাদার্স হুড, বিভিন্ন হল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের প্রতিনিধিবৃন্দ এই সভায় উপস্থিত ছিলেন।
এখানে উল্লেখ্য যে, ‘তমদ্দিন মজলিসের উদ্যোগেই প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়।’ ১৯৪৮-৫১ সময়কাল রাষ্ট্র ভাষার প্রশ্নটি ছাত্র বুদ্ধিজীবী এবং ক্ষুদ্র রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও ১৯৫২ সালে বিরোধী দল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম আওয়ামী লীগ, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ গণতান্ত্রিক যুবলীগ, তমদ্দিন মজলিশ, ইসলামী ভ্রাতৃসংঘ, যুব সংঘ প্রভৃতি সংগঠনের সমবায়ে একটি ‘সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্র সংগ্রাম পরিষদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩০ জানুয়ারি ১৯৫২ ছাত্র ধর্মঘট ও সভা আহবান করে। এই সভায় ৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২ ঢাকা শহরে ছাত্র ধর্মঘট বিক্ষোভ মিছিল ও ছাত্রসভা অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ভাষা আন্দোলনকে ব্যাপক করার উদ্দেশ্যে ৩১ জানুয়ারি বিকেলে ঢাকার লাইব্রেরিতে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর সভাপতিত্বে এক সর্বদলীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় ৪ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচী সমর্থন করে। ৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২ ঢাকার সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয় এবং ১১ ফেব্রুয়ারি প্রদেশব্যাপী জনসভাও শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়।
সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা পরিষদ ২১ ফেব্রুয়ারি প্রদেশব্যাপী সর্বাত্মক হরতালের ডাক দেয়। অন্যদিকে তৎকালিন পূর্ববাংলার শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করেন। ছাত্ররা ১৪৪ ধারা অমান্য করে ঢাকায় শোভাযাত্রা বের করে। ফলে পুলিশের সঙ্গে ছাত্রদের প্রত্যক্ষ সংঘর্ষ ঘটে এবং রফিক, শফিক, জব্বার, বরকত, সালাম প্রমুখ ছাত্র পুলিশের গুলিতে শহিদ হয়। ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকার বিরোধী বিক্ষোভে জনসাধারণ ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করে এবং রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন এক গণবিস্ফোরণের রূপ লাভ করে। এই বিস্ফোরণ এতই প্রচণ্ড ছিল যে, তদানীন্তন পূর্ব বাংলার আইনসভা বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে প্রস্তাব গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। ১৯৫৩ সালের মূলনীতি কমিটির রিপোর্টেও বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম সরকারি ভাষা হিসেবে মর্যাদা দানের সুপারিশ করা হয়। অবশেষে ১৯৬৫ সালের সংবিধানে উর্দুর সঙ্গে বাংলাও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি লাভ করে।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, ১৯৪৮ সালে জিন্নাহ যখন ঘোষণা করেছিলেন যে উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ছাত্র সমাজই সর্ব প্রথম প্রবল প্রতিবাদে ফেটে পড়েছিল, আবার ১৯৫২ এর বিস্ফোরণেও এই ছাত্র সমাজই নিয়েছিল অগ্রণী ভুমিকা বা পূর্ব বাংলার মুক্তি সংগ্রামে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৫২ সালের সেই ভাষা আন্দোলনের মধ্যে প্রচ্ছন্ন ছিল এদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম। ভাষা আন্দোলনের শহিদদের রক্তের মধ্য দিয়ে বাংলার মানুষের মনে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হয়। এ আন্দোলনের সূত্র ধরেই পরবর্তী আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যত্থান, ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন এবং সর্বশেষ ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
২১শে ফেব্রুয়ারি এখন কেবলমাত্র আমাদের মাতৃভাষা দিবস নয়। প্রতি বছর ‘২১শে ফেব্রুয়ারি’ সারা বিশ্বে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করা হচ্ছে। ১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংষ্কৃতি সংস্থা (ইউনেস্কো) তার সাধারণ পরিষদের ৩০তম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে বাংলাদেশসহ ২৮টি দেশের সমর্থন দিয়ে সর্বসম্মতভাবে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। ইউনেস্কো প্রস্তাবে ১৯৫২ সালে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রতি বছর ২১শে ফেব্রুয়ারি ইউনেস্কোর ১৮৮টি সদস্য দেশ এবং ইউনেস্কোর সদর দপ্তরে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে উদযাপিত হবে। ইউনেস্কোর এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে বিশ্ব দরবারে বাংলা ভাষা সম্মানিত হয়েছে এবং একবিংশ শতাব্দীর তথা ২০০০ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি প্রথম পালিত হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। অদ্যবধি তা চলমান। এই অর্জন বাঙালি জাতির জন্য অতীব গর্বের।
লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক ও উপাধ্যক্ষ, তালন্দ ললিত মোহন ডিগ্রি কলেজ, তানোর, রাজশাহী।