একুশ অন্য অনেক শপথের দিন

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ৩, ২০২১, ১২:৩০ পূর্বাহ্ণ

সুকুমার সরকার :


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
সেদিন বাংলাদেশ এবং বাংলাভাষার পক্ষে এতগুলো রাষ্ট্রের সমর্থন এবং ইউনেস্কো কর্তৃক বাংলাভাষাকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি দেওয়া শুধুমাত্র একুশে ফেব্রুয়ারির দিনে ঘটে যাওয়া ঘটনার প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি দেওয়া নয় ! বাংলা ভাষাকে স্বীকৃতি দেবারও একটি বিষয় ছিল। সেই সব বিষয়ের বহুবিধ কারণে বিশ্ববাসী বাঙালি জাতি এবং বাংলা ভাষার প্রতি অনুরক্ত ছিল বহু দশক ধরে। তবে প্রধান কারণ অবশ্যই ছিল উনিশশো বাহান্ন খ্রিস্টাব্দের একুশে ফেব্রুয়ারির ঘটনা ।
উনিশশো বাহান্ন খ্রিস্টাব্দের একুশে ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্থানের উর্দু সাম্রাজ্যবাদী শাসকের গুলিতে নিহত হয়েছিলেন রফিক, সালাম, জব্বার, বরকত সহ বাংলা ভাষার কয়েকজন তাজা তরুণ প্রাণ ! সেদিন ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল বাঙালির রক্তে ! সেই রক্তের দাবিই ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়ে বিশ্ববাসীর কাছে ফুটে উঠল ‘অ আ ক খ’-র বর্ণমালায় !
অবশ্য তার আগে থেকেও বিশ্ববাসী বাঙালি জাতি ও বাঙালি জাতির বাংলা ভাষাকে জানতেন। প্রাচীন পৃথিবীর মানুষও বাংলা ও বাঙালিকে জানতেন। প্রাচীন পৃথিবীর মানুষ বাংলা ও বাঙালিকে জানতেন বাঙালির শৌর্য বীর্য এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধতার কারণে। আধুনিক পৃথিবীর মানুষ বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতিকে জানেন বাঙালির রামমোহন, রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগর, বিবেকানন্দ, শহিদুল্লাহ’র কারণে। এঁরা বিভিন্নভাবে বাঙালি জাতি ও বাংলা ভাষাকে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেছেন। রামমোহন তুলে ধরেছেন ক্ষয়িষ্ণু সমাজের গলদ সংশোধন করে বাংলা তথা সমগ্র ভারতবর্ষের বৃহত্তর সমাজ ভাবনাকে নবরূপে প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে। বিবেকানন্দ তুলে ধরেছেন বাঙলা তথা সমগ্র ভারতবর্ষের উন্নত আধ্যাত্মিকতার অভিসম্পদকে বিশ্ববাসীর হৃদয়ে প্রতিস্থাপন করার মধ্যে দিয়ে। বিবেকানন্দের শিকাগো ভাষণের মধ্য দিয়ে বিশ্ববাসী বুঝতে পেরেছেন ভারতবর্ষ আধ্যাত্মিকতার আকর ভূমি। সেদিন বিশ্ববাসী স্বীকার করেছেন, প্রকৃত আধ্যাত্মিকতা অনুধাবন করতে হলে বাংলা তথা ভারতবর্ষকেই প্রকৃত ঠিকানা মানতে হবে। একইভাবে বিশ্ব দরবারে বাংলা ভাষার বিজয় কেতন উড়িয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এবারও বিশ্ববাসী অনুধাবন করলেন বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতির অমিত ত্যেজ এবং অমিত সম্ভাবনাকে। সেদিনের ঔপনিবেশিক শাসক শোষকেরা বুঝতে পারলেন, ঔপনিবেশিক শাসন শোষণের ইংরেজি ভাষার বিপরীতে যদি কোনো ভাষা দাঁড়াবার ক্ষমতা রাখে তা বাংলা ভাষা । অবশ্য বাঙালি জাতির অমিত ত্যেজের ইতিহাস তাঁরা পূর্বেই টের পেয়ে গিয়েছিলেন। আর সেদিন থেকেই তাঁরা বাংলা ও বাঙালির ডানা ছাটার কাজ শুরু করে দিয়েছিলেন। এবার তাঁরা পুরোদমে লেগে গেলেন বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতিকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করতে। উনিশশো বাহান্নর শাসক শোষকেরাও ছিলেন সেই ঔপনিবেশিক শাসন শোষকদেরই উত্তরসুরি। খন্ডতি ভারত পাকিস্তানের উভয় শাসকই ভারত পাকিস্তানের কোনো প্রাকৃত ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা না করে দুটো কৃত্রিম ভাষাকে ভারত পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করতে মরিয়া হলেন। নব গঠিত ভারতের জন্য কৃত্রিম হিন্দি ভাষা। আর নবগঠিত পাকিস্তানের জন্য কৃত্রিম উর্দু ভাষা। ভারত-পাকিস্তানের যে কোনো ভাষাতত্ত্ববিদই জানেন, হিন্দি এবং উর্দু ভারত-পাকিস্তানের কোনো জাতিরই মাতৃভাষা নয়। মাতৃভাষার অবদমনের মাধ্যমে ভাষা-সংস্কৃতির শিকড়-বৃক্ষ কেটে দিয়ে শাসন শোষণের পথ চিরস্থায়ী করতেই এমন ষড়যন্ত্র ! ঔপনিবেশিক শাসন শোষণের সময় এই ষড়যন্ত্রের ইংরাজি ভাষা যেমন বিশ্বের অনেক জাতির মাতৃভাষা কেড়ে নিয়েছে, নব গঠিত ভারত-পাকিস্তানের শাসক শোষকের ষড়যন্ত্র তেমনি ভারত-পাকিস্তানের বহু প্রাকৃতজনের মুখের ভাষা কেড়ে নিতে লাগল । আজ ভারতের অবধি, মগহি, ভোজপুরি, আঙ্গিকা, ডোগরি, সিন্ধি, বালুচি ভাষা সহ কত কত ভাষার মানুষ ভুলেই গেছেন এগুলি কোনো একদিন তাঁদের মাতৃভাষা ছিল। এঁদের জিগ্যেস করলে অবলীলায় বলে দেন , তাঁদের মাতৃভাষা হিন্দি।
(চলবে)